মনে পড়ে সেই দিনগুলো

কাকলী আহমেদ

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

কিশোরী বয়সে সব কিছুই ভালো লাগে।গাছ, মাটি, আকাশ, পুকুর, নদী সবই।ভালো লাগে পাশের বাড়ির ছেলেকে এমন কি রাস্তায় দেখা কোন কোন ছেলেকেও।মনের মধ্যে এক ধরণের ভাল লাগার আবেশ ঘুরপাক খায়।
বারান্দায় বসলে দেয়ালের বাইরে নির্মানাধীন দালানের একতালার জানালা থেকে এক জোড়া চোখ তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।। আমি লাজ ভরা চোখে তাকালে জানালার পাশ থেকে সরে যায়। আমিও আড় চোখে তাকিয়ে থাকি একদিন দুইদিন তিনদিন। কে জানে ওই বয়সের দূর থেকে দেখায় কি আনন্দ সুখ ছিলো।দেখে দেখে আমি বিস্মিত হই।

বাড়ির পেছনের বিঘা খানেক জমিতে শীতকালে ব্যাডমিন্টন কোর্ট কাটা হলো। ছোটদের পাশাপাশি আব্বু আর আম্মাও একদিন খেলা শুরু করলো । আব্বু আম্মার সে কি ছেলে মানুষের মত লাফালাফি করে খেলা! আমরা তিনবোন দর্শক।আম্মার সহকারী আকলিমাও কাজ ফেলে হাততালি দিয়ে লাফাতো। দিনগুলো জ্বলজ্বল করে এখনও চোখে ভাসে। মায়ের হেরে যাওয়া আমাদের কি কষ্ট দিতো।তাই আব্বুর জিতে যাওয়া আমাদের দিতো আনন্দের মাঝে হাহাকার।

ছেলেবেলায়  মায়ের কড়া নিষেধ ছিল বাইরের কোন কিছু খাওয়া যাবে না। অথচ চটপটি,ফুচকা, হট প্যাটিস, খাওয়ার জন্যে প্রাণ আইঢাই করতো। ” ঝাল কিলা কিলি” বলে সন্ধ্যার দিকে যে মুড়িওয়ালা-র ডাক শুনে জিভে পানি এনে দিতো। আম্মার কঠোর নিষেধ অমান্য করা আমাদের তিন বোনের পক্ষে ছিল অসম্ভব।তবুও লুকিয়ে চুপিয়ে খেয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম।

কাকরাইলের বাসার সামনে মুদি দোকান থেকে এক পয়সা দু’পয়সা দিয়ে হজমি এনে খেতাম। ছোট্ট পলিথিনের ইঞ্চিখানেক লম্বা প্যাকেট একটার পর একটা হজমি ঝুলোনো থাকতো। জুলজুলে চোখে তাকিয়ে থাকতাম। প্যাকেটের ভিতরে কয়লা গুঁড়ার মত গুড়ি গুড়ি দানার হজমি।
জিভে দেয়া মাত্র, জিভটা ফস করে জ্বলে কি এক স্বাদ এনে দিতো। কিন্তু সে আনন্দের রেশ রয়ে গেছে এখনও।হজমি খেলে জিভে কালো দাগ পরে যেতো। আমরা তিন বোন মিলে কার জিভ কত কালো হয়েছে তাই দেখার এক প্রতিযোগিতা করতাম। পরক্ষণেই ধুয়ে ফেলতাম পাছে আম্মা দেখে বকা দেয়। এবং হতোও তাই । এসব বড়,  ছোট, মাঝারি বকা। এখন মনে পড়লে দারুণ লাগে। অথচ সে সময়ে কতই না লজ্জা লাগতো। মন খারাপের পাল্লা ভারি হতো।
এখন আমি মা। আমার ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলার এসব গল্প বলি। জানি না আজোও কোথাও হজমি পাওয়া যায় কি না। তখন অল্প দামে বোতলে গোল গোল করে রাখা তেঁতুলের আচার পাওয়া যেতো এক পয়সায় চারটি । আমাদের মুখ দেখে মুদি দোকানদার অনেক সময় পাঁচ ছয়টাও দিয়ে দিতো। চেহারায় হয়ত শিক্ষা দীক্ষার অত ছাপ নেই, ধোপ দূরস্ত কাপড় চোপড় পরিধানে নেই। কিন্তু, কি যে মমত্ববোধ।

তেমন ধনাঢ্য পরিবার ছিল না আমাদের। তবুও বাড়িতে খবরের কাগজ রাখা হতো দুটো একটি ইংরেজি ও অন্যটি বাংলা। দিব্যি মনে আছে দি বাংলাদেশ অবজারভার ও দৈনিক ইত্তেফাক। সাপ্তাহিক বিচিত্রার জন্যে আমরা মুখিয়ে বসে থাকতাম। গল্প,কবিতা, ফিচার পাঠকের পাতা, কুরুক্ষেত্র, ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন। এক পত্রিকায় সব বয়সের মানুষের পড়বার রসদ। ঘরে পাঠক ছিলাম আকলিমা, আমি, আলো, আব্বু, আম্মা, মুনিয়া। পাশের বাসার বাড়িওয়ালা আখতার হোসেন চাচাও নিয়ে সিনেমা জগতের খবরা খবর পড়তেন এবং নিজের ছবি বেরুলে আব্বু আম্মা-কে দেখিয়ে নিয়ে যেতেন। কার আগে -কে পড়বো সে নিয়ে আলো আর আমার মধ্যে মন কষাকষি, কথা বন্ধ ঘন্টা খানেকের জন্যে। পারিবারিক বন্ধনেগুলো ছিলো তখন এমন। ছোটদের জন্যে বের হতো নবারুণ, ধান শালিকের দেশ , শিশু, ট্যাবলয়েড সাইজে কিশোরবাংলা এবং আরো কত কি। কি আগ্রহে লেখাগুলো পড়তাম।সাপ্তাহিক বিচিত্রা নিয়ে আমার বড় বোনের সঙ্গে মোটামুটি একটা মল্লযুদ্ধ হতো। একবার ঈদসংখ্যা এসেছে। ঈদসংখ্যায় ইমদাদুল হক মিলন,হাসনাত আব্দুল হাই, রশীদ করীম, দিলারা হাশেম প্রমূখ প্রথিতযশা লেখক গল্প, উপন্যাস লিখছেন। মোটা ঈদ সংখ্যা। অনেক গল্প, উপন্যাস, কবিতা সব থাকতো। আমি কবিতা পড়তাম। খুব ভাল লাগতো। কিন্তু তেমন কিছুই বুঝতাম না। তবু বার বার পড়তাম। আর আওড়াতাম। কবিতা আমার প্রথম প্রেম। বুঝি আর না বুঝি, আমাকে নিয়ে যেতো এক অন্য জগতে।মনে আছে বিচিত্রায় ঈদ সংখ্যায় মূর্তজা বশীরের একটি উপন্যাস বের হয়েছলো। আমি আর আলো খুলে একসঙ্গে পড়েছি। আমি খুব তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলি আলো আস্তে আস্তে পড়ে। পাতা উল্টাতে বললে সে অভিমান করতো।

এক বিকেল। হঠাৎ এক দল ছেলে মেয়ে এসে হাজির হলো খেলার মাঠে। লম্বাপনা একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বললো তার নাম তাহমিদা। সামনের ছয় তলা বাড়িতে থাকে ওরা। তাহমিদা,সারোয়ার, সোহানী আর ইদি আমীন ওরা সবাই ভাইবোন।ক’দিনেই ওদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠলো। তাহমিদার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো, যদিও ও আমার চেয়ে প্রায় তিন ক্লাস নীচে পড়তো। ওর সঙ্গে বহু বছর পর মৌচাক মার্কেটের এক কসমেটিকস -এর দোকানে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল । সালটা বোধ করি ১৯৯৫ সাল। সোহানী যেন বোম্বের নায়িকা। তাহমিদাও অনেক বড় হয়ে গেছে। সঙ্গে সারোয়ার কেমন আছে জিজ্ঞেস করতেই তাহমিদার চোখে টলটলে পানি। সারোয়ার জন্ডিসে ভুগে এ জগত থেকে চলে গেছে আরেক জগতে।
জীবনপথে হেঁটে চলেছি সামনে পিছনে। ছুটোছুটি করে আবার থিতু হই। মনে পড়ে সেই দিনগুলো। (চলবে)

ছবি: মানজারে হাসিন মুরাদ