এ শহর চুমুর শহর

শামীমা জামান

ঢাকা আজ সেই তিলোত্তমা নেই। ভোরের কাক সম্মেলন,এক্টু ছিমছাম নিরিবিলি ছায়াঘেরা পথ ,এসব কেবলই মায়া হয়ে অতীতের রিকশাভ্রমনে টুং টাং সুর তোলে। বেইলি রোডে দুই যাত্রীতে, জন্ডিস রাঙ্গা রাত্রিতে। আচমকা রিকশা চুমুতে বোকা বনে যাওয়া মেয়ে ডিজিটোনের ডিজিটাল সুরমেলায় বারকয়েক মুখ মোছে।পাছে এরা কিছু বোঝে। কালো শার্ট পরা চিকন চাকন ছেলেটি ননস্টপ কথা বলে যায়। ওর নাম আসিফ।‘ও প্রিয়া ‘গান দিয়ে সে কেবল হই চই ফেলে দিয়েছে । মিস্টি করে হেসে হেসে লাজুক ভঙ্গিতে যে আমার কাছে তার অভিনেত্রী ঘরনীর গুণগান করছিল,আমি তার কপালের ব্যান্ডানা ভেদ করে সুদুর অতীতে সাতরাই ,ফুলার রোডে তামান্নাদের ঘাস উঠোনে।সদ্য পাওয়া রিকশা চুমুর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ।বেপরোয়া চুম্বনদাতা তখন আজম বাবুর সফেদ ঘরে শাওন মাহমুদের বরের সঙ্গে স্মৃতি হাতড়ায়। ‘’আয় টিপু আবার এক সঙ্গে চাইম করি’’।

        ফুলার রোডে তামান্নাদের ঘাস উঠোনে আমি আর সুইটি খালা গলা ধরে হাটি আর বলাবলি করি কে কার বর হবে তা যদি মানুষ আগে থেকে জানতে পেতো  ! তামান্না, মনোসরনীর মাহফুজ আমাদের পিছু নিয়ে দুষ্টু কথা শোনার জন্য কান খাড়া করে থাকতো আর যথা সময়ে বড়দের মাহফিলে সেই কুটনামী পেশ করতো । ওদের কর্মে বিরতি পড়ে নানাজান আ ন ম আব্দুল মান্নান খান  চেয়ারম্যান আরবী বিভাগের সদর্প আগমনে। ভাগ তামান্না।নানা আইতাছে। ভাগতে ভাগতে চাপা সাদা চন্দ্রমল্লিকা আর মেরুন ডালিয়ার গা ঘেষে দেয়াল চাপা দুষ্টুমিতে। যে দেয়ালটার আরেক পাশে জহুরুল হক হলে সেই চুম্বন দাতাকে বন্ধুরা মানববন্ধনে ঢেকে রেখে চুম্বন প্রার্থীদের বোকা বানাচ্ছে।  ব্যর্থ মনোরথে ফেরার পথের সিড়িতে এ ওর চুল ছেড়ে প্রতিযোগীরা। ছেলেগুলো মেয়েগুলোর বোকামী দেখে মুখ টিপে হাসে আর বন্ধুকে হিংসাবাণে মারে। শালা হিরো তোর মতো চেহারা আর গলা থাকলে জীবনে আর কি লাগে !

  মুহাম্মাদ আব্দুল মুনিম খান প্রথম আলো ,কবি নাঈমা খানম, স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টার আর আমি শুধু ঘুরি আর ঘুরি। দোয়েল চত্বর ,তিন নেতার মাজার, নজ্রুলের কব্বরে ছবি তুলি। চকোবার খাই।  এ শহরের চেয়ে সুন্দর গ্লামারাস আর কোন শহর আছে হে। কি দারুন হলুদ হলুদ বাতি জলে। গোলাপী জামা বাদামী দেখায়। রঙ্গিন স্বপ্নগুলো সাদাকালো এইসব দিনরাত্রি হয়ে যায় কেমন। ঢাকা শহরের টাইম স্কয়ারে আমাদের দিনগুলো লাচ্ছি খেয়ে কাটে। এমনই এক লাচ্ছি সন্ধ্যায়  সেই হিরোর সঙ্গে প্রথম দেখা। আমরা লাচ্ছি খেলাম সে আমাদের সঙ্গে একটা কোক নিলো।পাইপে চুষে খেলো। মুহাম্মাদ আব্দুল মুনিম খান প্রথম আলো তার হাত ঝাকিয়ে পরিচয় পর্ব সারলো কিন্তু তার হাত ছাড়লোনা। অনবরত ঝাকিয়েই গেলো। আমার সঙ্গের নারীমহল তার গুণগান গাইছিল অপার মুগ্ধতায়। আমাকে তখন দু পক্ষের কেউ ই তেমন পাত্তা দিলোনা।  আমিও সেলিব্রেটি দেখে আহ্লাদিত না হয়ে লাচ্ছিতে মনোনিবেশ করি।

      তারো পরে ঐ এক ই জায়গায়। কত পাতাঝরা দিন পার হয়ে।আমি আর সেই সেলিব্রেটি। দাঁড়িয়ে ছিলাম। টি এস সি র মঞ্চে তখন মাকসুদ ভাই হে হে করছেন। আমি করছি না না। ওর সঙ্গে তখন কথা বলিনা। আরো এক সপ্তাহ কথা বলব না সেই দৃঢ়তায় শক্ত চোয়াল। ঈশ্বর দেখে মুচকি হাসলেন। ঢাকার আকাশ ভেঙ্গে ঝড় নামালেন।  তার আগে ধুলো আর প্রচন্ড বাতাস।  মুহুর্তে মঞ্চ ভঙ্গ হয়ে যে যার জান নিয়ে দৌড়।  কোন কিছু না ধরলে পাগলা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাবার পায়তারায় ছিল। আচমকা জাপটে ধরলো কেউ।  ধুলোয় চোখ মেলা দায়। বন্ধ চোখে হাটছি দুজন।টি এস সি থেকে হাটতে হাটতে  গ্রীন রোডের কাছাকাছি এসে রিকশা মিললো। কিন্তু চুমুর তোড়ে টেকা দায়। অসভ্য লোকটারে বাসায় না ঢোকা অবধি ফেরানো গেলোনা কিছুতেই। সেদিনের সেই ঝড় বৃষ্টিতে ভিজিয়ে সে আমাকে অসুখ বাঁধিয়ে ছাড়লো। অসুখের রিপোর্ট আনতে যেয়ে দেখি সুখ এসেছে  কোলজুড়ে।

ছবি: গুগল