প্রাণের শহর প্রেমের শহর ঢাকা

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আমার দাদাবাড়ী এবং বাবার জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ এর কাজীপুর। কিন্তু জন্মগ্রহণ করেছি ঢাকায়। বাবা চাকরি সুত্রে ঢাকায় থিতু হয়েছেন। চাকরি করতে করতেই বাকী পড়াশোনা শেষ করেছেন ঢাকাতেই।তখন তাদের ভাড়া করা বাসা ছিল আরামবাগ। তদানীন্তন নতুন ঢাকা আর কি।বাড়িওয়ালা আরমানিটোলা থেকে আরামবাগ নতুন বাড়ি করেছেন, সেখানে বাগান সহ ভেতর বাড়ি বাহিরবাড়ী সহ বিশাল আবাসের এক‌টি অংশে বাবা-মা দাদীবুজি ও ফুপুমা থাকতেন। তার গল্প অনেক শুনেছি। পাড়ার মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।মা খুব আচার ওয়ালা ঝালমুড়ি ওয়ালা আইসক্রিম ওয়ালার সঙ্গে খাতির পাতাতেন। সে যাইহোক আমি জন্মগ্রহণ করে হলিফ্যমিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল।সেখান থেকে শান্তিবাগের বাসার বাসিন্দা হলাম।ছোট একটা মাঠ লাগোয়া একই ডিজাইনের চারটা বাসার এক‌টিতে আমরা থাকতাম।চাকরি বা কাজের ফাঁকে বাবা-মায়ের খুব সুন্দর সামাজিক জীবন ছিলো।লুডু ক্যারম ইত্যাদি নিয়মিত খেলতেন। নুন পিয়াজ কাঁচামরিচ ধারকর্জ করতেন। সন্ধ্যায় বাসা বদলে বদলে চা খেতেন। পাড়ার মুদীর দোকানেই তেজারতি সওদা হতো।আমি যখন হাঁটাহাঁটি শিখলাম তখন বুঝে গেলাম দোকানে টাকা পয়সা দিতে হয়।কিছু যে কিনতে হয় এই বিনিময় প্রথা বুঝিনি বলেই প্রায় রোজ চারআনা পয়সা বাড়ির পূর্বদিকের মুদী দোকানের চাচাকে দিয়ে আসতাম।পয়সা দিয়েই চলে আসতাম । দোকানী কাক্কা  সেগুলো জমিয়ে সময়মতো বাসার কাউকে দিয়ে দিতেন। এরপর যখন স্কুলে পড়া শুরু করলাম তখন থেকেই শুরু হল পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো। মায়ের এ নিয়ে তেমন কোন চিন্তাভাবনা ছিলনা। কারণ রত্না আপা আমার পাড়া বেড়ানোর অনর্থক রাগী মাতব্বর অভিভাবক ছিলেন। এজন্যই আম্মা চিন্তামুক্ত থাকতেন। আর তখন পাড়ার সবাই সবাইকে আপনজনের মতই চিনতো।শান্তিবাগ বাসা কিন্তু ঘুরে বেড়াতাম গুলবাগ, শহীদবাগ, মালিবাগ এলাকাজুড়ে। সব অলিগলিই চেনা ছিল।দুপুর বেলা আইসক্রিম ওয়ালা কটকটে দুপুর কে আইসল্যান্ড বানিয়ে বাক্স নিয়ে চোখের সামনে ঘুরঘুর করতো। মায়ের চোখ এড়িয়ে রত্নাপার সঙ্গে সন্ধি করে কখনো সখনো তা খেতাম।সন্ধ্যা হলেই বাক্সে বাতি জ্বালিয়ে মিহি সুরে “হটপ্যটিস” ডেকে যেতো। কখনোই মা তা কিনে দিতেন না।তবে বাবা মালিবাগ মোড়ের কনফেকশনারি  থেকে অপূর্ব স্বাদের ক্রীমরোল আনতেন। তখনকার মধ্যবিত্তের ভরসার দোকান ছিল রেশনশপ।বাবার সঙ্গে সেখানেও যেতাম।স্কুলে যথারীতি আচার বাদাম নানাবিধ টক ফল পাওয়া যেতো। সাধ্যমত কিনে খেতাম।বেইলী রোডের মহিলা সমিতিতে বাবা মা নাটক দেখতেন। সিনেমা দেখতেন জোনাকি ও মধুমিতা হলে।রিকশাই নিয়মিত বাহন ছিলো মাঝেমধ্যে ভটভট বেবীট্যক্সী।তবে আব্বা অফিস থেকে গাড়িও আনতেন বিশেষ কোথাও বেড়াতে যেতে, মা গোস্বা করতেন কারণ মায়ের এবং আমাদের গাড়িতে বমি পেতো! যাই হোক ৭৭ সালে বাবা-মা একখন্ড জমি কিনে শহুরে ঢাকা ছেড়ে মাদারটেক গ্রামে বাড়ি করলেন। শুরু হল অপূর্ব জীবনযাপন। ঢাকায় থেকেও বৃষ্টি কাদা বর্ষা বন্যা মাছ হাঁস গাছগাছালি ধানক্ষেত ডোবা পুকুর কচুরিপানা ইত্যাদির সঙ্গে বসবাস শুরু হলো।যাতায়াতের খুব অসুবিধা ছিলো কিন্তু ছিলো অনাবিল শান্তি। যাইহোক। ঢাকাকে আমি অনেকভাবেই দেখেছি। অনেকেই বলে এখনকার ঢাকা বসবাসের অযোগ্য, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, জলকাদাপানিতে নিমজ্জিত বিষময় ঢাকা। হতেই পারে, ভুক্তভোগীরা বলতেই পারে।তবে আমি এভাবে বলিনা।ঢাকা শহর ঘিঞ্জি হয়েছে মোটামুটি বহিরাগতদের জন্য।যারা অন্য জিলায় থেকে কাজ করতে উচ্চাভিলাষ পূর্ণ করতে বেড়াতে নিজের জীবন সাজাতে রাঙ্গাতে ঢাকা আসেন এবং বকতে বকতে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং বলেন “এই ঢাকায় বসবাস তো দূরের কথা নিঃশ্বাস নেয়াও পাপ “তাদের বলি ভাই আসেন কেন ঢাকায়! আপনাদের জন্যই ঢাকায় এতো গরম! যাইহোক এই ভাবনাগুলো একান্তই আমার।সত্যিকার অর্থে ঢাকাকে বসবাস যোগ্য করতে এখনই ঢেলে সাজাতে হবে।এখনই সে সময়।এক‌টি মেট্রোপলিটন শহরের যা যা নিয়মাবলী মানা উচিত তা আর কোথাও দেখিনা।আগে বিআরটিসির বাস গুলোতে মধ্যবিত্তরা নির্ভয়ে নির্ভরযোগ্য ভেবে চলাফেরা করতেন। এখন কত নামের যে বাস চলে! খেলার মাঠ পাড়ার বিনোদনের জায়গাও কমে গেছে কমে গেছে পুকুরের সংখ্যা।খাল গুলো ভরাট করে দোকানপাট হয়ে জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসেছে। যার কাঠা দশেক জায়গা আছে সেই সুপার শপ সহ বিশাল দালান বানিয়ে ফেলছেন। এতো দোকান মার্কেট কি আদৌ প্রয়োজন? ঢাকার বস্তিগুলির বেসিক উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন। নইলে সবসময় এভাবে আগুন লাগবে আর মর্মান্তিক ব্যাপার ঘটবে।তবে কথা হলো এই আমি কি কেউ যে এগুলো নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখি! আমি চাই আমার প্রাণের শহর আগের মত না হলেও অন্তত সুন্দর শহরের খাতায় নাম লেখাতে পারে।কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা হলেই এখনো ঢাকাকে ঢেলে সাজানো যায়।একদিকে পরিত্যক্ত হবে আরেক দিকে নতুন ঢাকা বাড়বে আর গাজীপুর ময়মনসিংহ ঢাকা নাম ধারণ করবে এটা কোন কাজের কথা নয়।তবে আমার কাছে এটাই সত্যি ঢাকা আছে এবং দিনশেষে সেখানে নিজ ডেরায় ফিরি বলেই আমেরিকা লন্ডন আমার কাছে সুন্দর। ঢাকায় বসবাস কেনাকাটা পড়াশোনা খাওয়া ঘুম আছে বলেই পৃথিবীর যে কোন জায়গায় বেড়িয়ে আনন্দ পাই।তাই ঢাকা আমার ভালবাসার শহর, আমার প্রেমের শহর, আমার প্রাণের শহর। আমি ঢাকাকে মায়ের মতই ভালোবাসি।

ছবি:গুগল