মোর বঁধুয়ার রূপ তেমনি…


সুমন সুপান্থ

(ইংল্যান্ড থেকে): রাতের শেষ ট্রেন। সিলেটগামী। আন্তঃনগর না লোকাল, আজ আর মনে নেই। পথে পথে থামছিলো। লোকালই হবে বোধকরি। বাইরে দুধের সরের মতো পাতলা কুয়াশার আচ্ছাদন। আর ছোট ছোট স্টেশন। প্লাটফর্ম লাগোয়া খুপরি দোকান, চায়ের। কেতলির নল বেয়ে উঠে আসা অল্পটুকুন ধোঁয়া ঘিরে আড্ডামগ্ন শীতার্ত মানুষের জটলা সেখানে। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ভেতর থেকে,জুতা টুপি মাফলার ভেদ করে উড়ে যাওয়া মায়াবী রঙের আরও আরও ধোঁয়া। এ বঙ্গে শীত এলেই কেবল এমন ধোঁয়ার দেখা মিলে। আর এমন মধ্যরাতের স্ন্যাপশটে কেবল ধরা পড়ে তা। ভেতরে বগীঠাসা নানা বর্ণের মানুষ। দুঃখী মানুষ। ক্লান্ত মানুষ। দিনকে রাতে নামিয়ে আনা পরিশ্রমী মানুষ। প্রবল শীতেও ঘেমে নাইতে পারা মানুষ। কপালের ভাঁজে চিন্তা জমানো মানুষ। সোমত্ত মেয়ের অ-বিবাহে অসহায় হয়ে থাকা মানুষ। কেবল লিখেই একদিন জগৎ মাত করে ফেলবার স্বপ্নে উজ্জীবিত চোখের কৈশোরত্তীর্ণ গল্পকার। সদ্যই নতুন ছন্দটা আয়ত্তে নেয়া মফস্বলের কবি+লিটিলম্যাগকর্মী। ফেরিওয়ালা। খাঁচাভর্তি বিদেশী মোরগের ব্যবসায়ী। নিজেকে বিক্রি করে মাসান্তে বাড়ি ফেরা বিউটি নামের মেয়েটি। এবং ট্রেনের কামরায় আরও যা যা থাকে, যা যা দেখা যায়, উপন্যাসে, সিনেমায় সেসব। আর একজন বাঁশী বিক্রেতা। হুম,বাঁশীবাদক নয়; বাঁশী বিক্রেতা। যতোটুকু মুন্সিয়ানা কব্জা করতে পারলে বাঁশীর সুরে আবেশ বিভোর করে ফেলা যায় যাত্রীদের, ঝোলার বাঁশী বিক্রি হয় বেশি, ঠিক ততোটুকু পারঙ্গম এক বাঁশী বিক্রেতা। তরুণ হালকা গোঁফের বাঁশী বিক্রেতা। বগীর ভেতরের হল্লা, ফিসফিসানি, ঘামগন্ধ এড়িয়ে দুই কম্পার্টমেন্টের মাঝখানে যে পাটাতন, সেখানে দাঁড়িয়ে একাকী একা হচ্ছিলো। বাইরে নিশুতি রাতের শুনশান নৈ:শব্দ পান করছিলো হয়তো। হয়তো ক্লান্ত লাগছিলো তার। ভালো লাগছিলো না হয়তো কিছু। কিংবা তার বাড়ি হয়তো ছিলো অনেকদুরের কোনো ষ্টেশন ধরে। কে জানে তার হয়তো এমনি ঝিমুনি এসেছিলো কিনা। সে বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিলো। ফলত তাকে ব্যার্গম্যানের ছবি ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিস’র প্রফেসর আইজ্যাক বোর্গ’র মতো দেখাচ্ছিল তখন। একা। নিঃসঙ্গ। মৃত্যরোধী এক ইন্ডিভিজ্যুয়াল।সে হঠাৎই আলগোছে ঝোলা থেকে তার সেই মোহন বাঁশীটি বের করে এনেছিলো। সেই বাঁশীটি, যেটি বিক্রয়ের জন্য নয়। যেটি বাজিয়ে প্রতিদিন সে আবিষ্ট করে রাখে ট্রেনভর্তি যাত্রীদের। আর এমন আশ্চর্য ভঙ্গিতে ঠোঁট ছুঁইয়েছিলো, সুর তুলেছিলো, মনে আছে। একটার পর একটা গানের সুর। কোনওটা চেনা। কোনওটা অচেনা। কোনওটা “ধরে ফেলবো ধরে ফেলবো” এমন মুহুর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছিলো! “ম্যানে পোঁচা চান্দ সে হে দেখা হে নেহি” থেকে “… হইয়া আমি দেশান্তরি/ দেশ বিদেশে ভীড়াই তরী” আর “ও সে প্রেমেরও ঘাটে ঘাটে বাঁশি বাজায়/যদি দেখিস তারে দিস সে পদ্ম তার পায়…” বাজিয়ে বাজিয়ে তেমনই এক ছোট্ট স্টেশনে নেমে গিয়েছিলো। নেমে অন্ধকারে মিশে, বাড়ি ফিরে গিয়েছিলো নিশ্চিত। সমস্ত দিনের ক্লান্তি অবসাদ ক্লেদ গ্লানি ট্রেনের বগীতে ফেলে রেখে সে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলো। কে কে ছিলো, কে কে থাকতো সেই বাড়িতে, সেই গ্রামে তার? “মোর বধুয়ার রূপ তেমনি ঝিলমিল করে কৃষ্ণ-কালো” বউ? না কি পাশের বাড়িতে অভিমানি কিশোরী প্রেমিকা? কিংবা ছেলে সদাই নিয়ে বাড়ি ফিরলে তবেই রান্না বসানোর প্রতীক্ষারত তার বিধবা মা? আজ পাক্কা এক কুড়ি বছর পর সেসব মনে এলো। ছলাৎ ছল ঘাটে এসে লাগলো স্মৃতিবোঝাই ডিঙি। মধ্য জীবনের পুরুষ। শীতের রাত। “ডানা কাটা হিমের ভেতর”থেকে শুনতে পাওয়া যায় ডাকনাম ধরে ডাকছে তাকে। ‘খোকন বাড়ি আয় বাবা, বাড়ি আয় খোকন’। বাড়ি যাবে? কে আছে বাড়িতে? মা? ভাই? পুত্র? জায়া? বোন? তাদের একজন তো গত বছরের এমন সময়টাতেই চিরনিরুদ্দেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোথায় পাবে তারে তুমি আর? কোথায় সেই লক্ষীমন্ত সহোদরা তোমার? আজও চলে গেছে শেষরাতের ট্রেন। টেবিলে ছড়ানো রাজ্যের কাগজপত্তর। কাউন্সিল ট্যাক্সের বিল। মর্টগেজ। ওয়াটার বিল। ছেলের পেরেন্টস ইভিনিঙের চিঠি। ক্রেডিট কার্ডের ওভারড্রো। এই স্ট্যাটাসবাজী বন্ধ রেখে, আবেগ বিলির পসরা গুটিয়ে সেই বাঁশী বিক্রেতার পিছু পিছু বাড়ি ফিরবে না তুমি? বাড়ি ফিরবে না? দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে লাল কাপড় বেঁধে চলা হে লোনলি ম্যাটাডোর?

ছবি: টুটুল নেছার