অযোগ্য অমনোযোগী আমি কোনোটাই ঠিকঠাক শেখা হয়ে ওঠেনি…

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

(কলকাতা থেকে): আমার মাতুলকুল ছিলো মাস্টারমশাইদের বংশ।দাদু ছিলেন শিল্পী মানুষ,এবং শিক্ষক।সেসময়ে হুগলী জেলার নামকরা ইশকুল ছিল কানাইলাল বিদ্যামন্দির, সেখানেই পড়াতেন।তিন মামার মধ্যেও বড় দুজনেই ছিলেন শিক্ষক।চন্দননগরের বড়বাজার অঞ্চলে অবস্থিত আমার মামাবাড়িটি পরিচিতই ছিল ‘মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি’ নামে।আর সেসময়ে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কটা কেবল ইশকুলের চৌহদ্দির মধ্যে আটকে

আমি

থাকতো না বোধহয়,অন্তত আমার মামাবাড়িতে তো নয়ই।বাড়িতে দুই প্রজন্মের শিক্ষক, স্বাভাবিকভাবেই দুই প্রজন্মের ছাত্রদের আনাগোনা ছিলো ও বাড়িতে।মামাদের কাছে যারা পড়তো,তাদের

ছোট আমি

বাবারা এসে প্রথমেই ‘কেমন আছেন মাস্টারমশাই?’বলে প্রণাম ঠুকতেন দাদুকে।বেশ একটা বৈদিক গুরুকুলের মতো পরিবেশ ছিল।বড্ড অসময়ে চলে যান মেজোমামা,আঠেরো বছর আগে,  সেদিনটা ছিল পাঁচই সেপ্টেম্বর।মাস্টারমশাই-এর একমাত্র নাতনী, মাস্টারমশাইদের একমাত্র ভাগ্নী হিসেবে বেশ কিছুকাল খানিক-খানিক প্রতিফলিত গরিমা আমিও উপভোগ করেছি বটে মামাবাড়ি গিয়ে!

অন্যতর পেশায় যুক্ত থাকলেও আমার বাবা ছিল স্বভাব-শিক্ষক।অঙ্ক বোঝানোর এক অদ্ভুত সাবলীল ভঙ্গী ছিলো বাবার, ছিলো কেন,এখনো দাদুর কাছে অঙ্ক না করলে তৃপ্তি হয় না আমার পুত্রটিরও ।বহু ছাত্র-ছাত্রীকে অঙ্ক ভালোবাসতে শিখিয়েছে বাবা।আমি ছাড়া।বাবার কাছে আমি প্রথম অঙ্ক করতে বসি মাধ্যমিকের অঙ্ক পরীক্ষার আগের রাতে।অঙ্কর সঙ্গে তাই আমার একটা নিরাসক্তির সম্পর্ক,তেমন ভালোবাসাবাসি নেই।এমনিতে কেউ কারোকে ঘাঁটাই না বটে তবে কোনো কারণে আমাকে জব্দ করতে এলে বিনা যুদ্ধে এতটুকু জমিও ছাড়ি না।ওটুকুই জিনের কেরামতি।

ইশকুল থেকে ইউনিভার্সিটির দীর্ঘ পরিক্রমায় অনেক আন্টি(ইশকুলে ওই নামেই ডাকতে শেখানো হয়েছিল শিক্ষিকাদের),স্যার,ম্যাডাম,দাদা-দিদিদের(যাদবপুরীয় রীতি মেনে) পেয়েছি। ইশকুলে আমার প্রথম শিক্ষিকা ছিলেন এম. ভাস্করণ। কোনো অজ্ঞাত কারণে ইদানীং আমার স্মৃতিশক্তি,খুব ধীরে হলেও ক্রমক্ষীয়মান,যে কারণে আরো বেশি করে লিখে রাখি ছেলেবেলার টুকরো টুকরো গপ্পোগাছা, কিন্তু কেন জানি না, ওই অতদিন আগেকার ভাস্করণ আন্টি অমলিন রয়ে গেছেন স্মৃতিতে। যেমন রয়ে গেছেন রঞ্জিতা আন্টি, রুচিরা আন্টি( ইনি কবি বিষ্ণু দে-র কন্যা)…দুজনেই ইংরেজীর দিদিমণি, এবং অসাধারণ এলিগ্যান্ট এবং স্টাইলিশ মহিলা।অঙ্ক-দিদিমণি পম্পাআন্টি  তারুণ্যের এক ঝলক টাটকা হাওয়া নিয়ে ঢুকতেন ক্লাসরুমে।নীরস সাল-তারিখ- ঘটনাপঞ্জীর বাইরেও ইতিহাসের যে একটা প্রাণবান অস্তিত্ব আছে তা প্রথম অনুভব করেছিলাম আর্য মিত্র, আমাদের রেক্টর স্যার-এর পড়ানোর ভেতর দিয়ে। আর একজনের কথা না বললে আমার ইশকুলজীবনের আন্টিকাহিনী অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। নাম করবো না তাঁর, এইট- নাইনে বাংলা পড়াতেন, ভারি ডাকসাইটে দিদিমণি ছিলেন।কঠিন শাসনের নিগড়ে বেঁধে রাখতে চাইতেন গোটা ক্লাসকে, ছাত্রছাত্রীদের বন্ধু হতে পারেননি, চানওনি, ফলে বেশিরভাগ ছেলেপিলের তীব্র অপছন্দ তৈরী হয়েছিল তাঁর প্রতি। কিন্তু কোনো অজানা কারণে আমার প্রতি ছিলো তাঁর অহেতুক, অযৌক্তিক প্রগাঢ় স্নেহ, এতখানিই যে ওনার অপছন্দের কোনো ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলেই, অর্থাৎ আমার ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা তৈরী হলেই, গার্জিয়ান কল করে সাবধান করে দিতেন।ছাত্রী হিসেবেও যে খুব সমৃদ্ধ হয়েছি ওনার সংস্পর্শে, তা নয়, বরং সেসময় মাঝেমাঝে মনে মনে বেশ রাগই হতো এহেন ব্যবহারে, কিন্তু আজকে দাঁড়িয়ে ওই স্নেহটাও খুব অমূল্য মনে হয়।

যাদবপুরে এসে কত না গুণী মানুষকে পেয়েছি শিক্ষক হিসেবে!কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত,ডঃ অমিয় দেব,নবনীতাদি,স্বপন মজুমদার,মানববাবু(মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)…যাদের ছাত্রী হওয়ার কানাকড়ি যোগ্যতা তখনো ছিল না, এখনো নেই।অরুন্ধতীদিকে প্রথমদিন দেখে মনে হয়েছিল,শিক্ষিকা এমনও হন?ডায়াসে নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারে নয়,এসে বসতেন আমাদের মধ্যিখানে কোনো একটা বেঞ্চে,বলতেন এটা কোনো ক্লাসরুম নয়,বড়জোর একটা ইন্টার‍্যাকটিভ সেশন বলা যেতে পারে যা উভয়পক্ষকেই সমানভাবে ঋদ্ধ করবে, কথায় কথায় বলে উঠতেন ‘আমাকে নয়, আমার আপোষ কিনছো তুমি’..এই লাইনটা আমাকে সাহস দেয়।তবু গরমের ছুটির শেষে প্রথমদিন ডিপার্টমেন্টে ঢুকেই খবর পেলাম সুমনের গানও শেষ পর্যন্ত অরুন্ধতীদিকে জীবনের সব আপোষ মেনে নেওয়ার পথ চেনাতে পারেনি, পারে না কোনো কোনো মানুষকে। আর যার নামটা না উল্লেখ করলে আমি আদৌ তুলনামূলক সাহিত্য পড়েছি কি না, এমনকি জীবনে এইট বি বাসস্ট্যান্ডের ধারেকাছেও পা দিয়েছি কিনা এমন প্রশ্নও উঠে যেতে পারে, তিনি, ঠিকই ধরেছেন, মহামহিম শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়।শিবাজীদা ঠিক টীচার নন,শিবাজীদা একটা ফেনোমেনন। পড়াতেন না, কিভাবে পড়তে হবে,আনবায়াসড, আনইনহিবিটেড পাঠ কেমন হওয়া উচিত,সেটা শেখাতেন।

ইশকুলের স্যর-আন্টিরা শেখালেন লক্ষ্মী মেয়ে হওয়ার ফর্মুলা,যাদবপুর শেখালো”দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে”।অযোগ্য অমনোযোগী ছাত্র আমি, কোনোটাই ঠিকঠাক শেখা হয়ে ওঠেনি। তবু সব মিলেমিশে হয়েছে এক রকম। খুব জরুরী কিছু শিক্ষা পেয়েছি আঘাতের মধ্য দিয়ে,আর হঠাৎ-আলোর- ঝলকানির মতো অপ্রত্যাশিত কিছু পাঠ ছোটোদের কাছ থেকে পেয়ে আনন্দে মন ভরে গেছে।সব মিলিয়ে ফিরে দেখলে ডেবিটে-ক্রেডিটে চলে যাচ্ছে মন্দ না….

“জীবন আমি তোমার কাছে হাত পেতেছি
ভরদুপুরে পাত পেতেছি , ফিরিয়ে দাও
ফিরিয়ে দাও এক জীবনে, অঙ্কে যত শূন্য পেলে….”

ছবি: লেখক