কাহাকেও ভেবোনা ছোট…

পলা রহমান

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমি যে ওইদিন লিখলাম, কামলা না দিলে আমাকেও ভাবীদের সঙ্গে বসে বসে বিশ পদের ইলিশ মাছের তরকারি রান্নার রেসিপি আলাপ করতে হতো। কথা গুলো লিখার পর থেকে গিলটি ফিলিং হচ্ছে। ইলিশ মাছের বিশ পদের কারি রান্নার কৌশল আবিষ্কার করা মুখের কথা না।যে এই রান্নাগুলো আবিষ্কার করেছে কিংবা শিখেছে,তাদের ক্রিয়েটিভিটির লেভেল অন্যরকম। কি পরিমান মেধা থাকলে উনি একটা মাছ দিয়েই বিশ রকম রেসিপি বানিয়ে ফেললেন! এটা ছাড়াও উনি শুধুমাত্র লাউ দিয়েই ঝাল,মিস্টি,টক এমন নানা পদের ডিশের কথাও বললেন।
আমার দাদির কাছে শেখা রান্না গুলো আম্মা এখনো প্র্যাকটিস করে,আমার দাদি শিখেছিলো তার শ্বাশুড়ির কাছ থেকে। এক একটা রেসিপির বয়স এমনকি এক’শ বছরেরও বেশি। আমি এক সময় মাস্টারসেফ অস্ট্রেলিয়া দেখতাম রাত জেগে। এখন জেগে থাকতে পারিনা বলে দেখিনা। এই আমিই যদি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের হাই-ফাই সব রান্নার প্রতিযোগিতা দেখে, শিহরিত হতে পারি,তাহলে বাংলাদেশে একটা স্কুলের গ্যারেজে বসে ভাবীদের রান্নার কলাকৌশল নিয়ে আলাপ করা দেখ বিরক্ত হলাম কেন? এখানে ফ্যাশনেবল কোন প্রেজেন্টেশন নেই বলে? স্যাভরি ডিশ অথবা কন্টিনেন্টাল মেন্যু এর মত স্মার্ট লেঙ্গুয়েজ ইউজ করছে না বলে? হাউ লেম আই এম!! ওই আপাটাকে ফ্যামিলির দায়িত্ব থেকে রেহাই দিয়ে সঠিক টাইমে কোন কর্পোরেট অফিসে বসিয়ে দিলে উনিও একজন সোনিয়া বসির কবির হয়ে যাইতেন,আমি শিওর। আমি হয়তো উনার আন্ডারে কাজ করতাম। কারন আমার এমন মেমোরাইজিং ক্ষমতা নাই।কিংবা কে জানে উনার হয়তো ফ্যামিলি মেইনটেইন করে বেশি সাচ্ছন্দ্য লাগে। আমি আমার নিজের এমন ডুয়েল ক্যারেক্টার আবিস্কার করে পুরাই হতবাক হয়ে গেলাম।
আমি হোমসেফ নিয়ে কাজ করেছি। শ’খানেক সেফকে ডিল করেছি টানা ছয়মাস। এরা কেউ রেস্টুরেন্ট শেফ না। কিন্তু অসম্ভব ভালো রান্না জানেন। আমি সেসময় অস্থির হয়ে থাকতাম,কোন ভাবে কি এদের একটু ফুড ফটোগ্রাফি কিংবা ফুড প্রেজেন্টেশন এর উপর ট্রেইনিং দেয়া যায়।কেউ কেউ সেসব পারতো,নিজেরাই শিখেছে।ওদের খাবার বেশি সেল হতো । মানুষ ছবি দেখে খাবার অর্ডার করে। আমি প্র্যাকটিক্যালি দেখেছি শুধুমাত্র নার্সিং এর অভাবে অনেকে এই প্ল্যাটফর্মটা থেকে ছিটকে পরে যাচ্ছে। আমি ঘন্টা পর ঘন্টা কথা বলে উনাদের ইন্টারনেটের ব্যবহার শিখিয়েছি,সবচেয়ে ভালো ছবিটা ওয়েবে আপলোড করেন,জানালার পাশে টেবিল নিয়ে এরপর ডে-লাইটে ছবি তুলুন, মোবাইলে একটা ফটো এডিটিং অ্যাপ নামান ইত্যাদি। অনেকে পেরেছে,অনেকে পারেনি। অনেকে ভয়াবহ হতাশ গলায় ফোন দিত,আপু আমাকে দিয়ে মনে হয় হবে না। মনটা খারাপ হয়ে যেত। আবার নিলু আন্টির মত অনেকে ছিল,বলতো,উনার ছেলে ডিএসএলআর দিয়ে আচারের বোতলের ছবি তুলে দিয়েছে, লোগো ডিজাইন করে স্টিকার প্রিন্ট করে দিয়েছে। আরো কয়জন তো কোন বেচাবেচির ধান্দার মধ্যেই নাই, বলা মাত্রই এক গাঁদা রেসিপি আপলোড করে ফেলতো।
আমি চাকরি করি আমার মায়ের জন্য। আমি আমার সব জ্ঞান কাজে লাগিয়েছি (মোটামুটি ভাবে) শুধুমাত্র আম্মাকে দেখানোর জন্য,দেখো তোমার মেয়ে তোমার থেকেই পাওয়া সব কোয়ালিটি গুলোকে কিভাবে কাজে লাগাচ্ছে। আম্মা আলসি করে লেখাপড়া শেষ করেনি,কিন্তু তার ক্রাফটিংয়ের আইডিয়া মারাত্নক। বিবাহিত জীবনে সে প্রচুর আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু সঠিক পরিচর্যার অভাবে ক্রাফটিংকে সে পেশা হিসেবে নিতে পারেনি। কেউ তাকে বলে দেয়নি,হাতের কাজ করেই সে চাইলে লাখ লাখ টাকা কামাতে পারে। ক্রাফটিং বাদ দেন,আম্মা যদি শুধুমাত্র একটা চায়ের দোকান দিত,তাতেই ব্যবসা করে লালে লাল হয়ে যেত। আমি সারাজীবনে বহুবার দেখেছি,নানু বাসায় মেহমান এসে নাস্তা করে,চা খেতে আমাদের বাসায় চলে আসতো (যেহেতু বাসা পাশাপাশি ছিল)। আমার আম্মার হাতের চা বানানো হত অসাধারন।
আমার শ্বাশুড়ি যেভাবে সকল প্রকার হাইজিন মেইনটেইন করে বাচ্চাদের যত্ন নিতে পারে,সেটা খেয়াল করে আমি উনাকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম,চলেন একটা ডে-কেয়ার সেন্টার খুলে দেই আপনাকে। দুটা শক্ত পোক্ত মেয়ে এসিস্ট্যান্ট রেখে দিব আপনাকে হেল্প করার জন্য। মা রাজি হয়নি। উনি উনার নিজের নাতি পুতি পেলেই খুশি। এখন এদের কি আমি ব্যর্থ বলতে পারি। কে কি করবে,কোন পেশায় থাকবে,কিংবা থাকবে না এটা সম্পূর্নই একটা মানুষের নিজস্ব চয়েস।

মানুষ হিসেবে আমাদের একটা খুব খারাপ গুন হল, আমরা ধরেই নেই,আমিই সবচেয়ে ভালো আছি,বাকিরা আছে আরকি কোনমতে। আমরা ভাবিই শুধু যে আমি আসলে অন্যদের থেকে আলাদা। আসলে তো তা না! মুল সমস্যা আমাদের ইনডেপথ চিন্তা ভাবনার অভাব।