আরণ্যক…

সায়ন্তন ঠাকুর (লেখক)

বাইরে কী ভীষণ ব্যস্ত রাস্তাঘাট, হাটবাজার, চলমান মানুষ এবং গাড়ির স্রোত। সকাল দশটা মানুষের কর্মব্যস্ততার সময়। রোজগারের ধান্দায় তাকে বেরিয়ে পড়তে হয় সারাদিনের জন্য। সেই কোন সন্ধে নেমে আসলে আবার ঘরে ফেরা। ময়দা, চাল, আলু, তেল, নুন, শিশুর দুধের প্যাকেট নিয়ে ফিরে আসা। খিদের অন্ন প্রস্তুত হবে তার সারাদিনের বিনিময়ে।ভালোবাসা আসবে। আনন্দের রঙ ঝলমল করে উঠবে গেরস্ত পর্দা আর বেডশিটে।
তারই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এই সকাল বেলায়। কলকাতা শহরের গলার কাছে আটকে থাকা এক মফস্বল, ব্যারাকপুর।কিছুক্ষণ আগেই আকাশ কালো করে নেমে এসেছিল বৃষ্টির ফোঁটা, এলোমেলো বাতাসে উন্মনা হয়ে উঠেছিল গাছের পাতা। পুরনো গঙ্গার পাশে শুয়ে থাকা গান্ধিঘাট থেকে শ্রীরামপুরের দিকে বৃষ্টি মেখে রওনা দিয়েছিল প্রতিদিনের খেয়া। আবার সব ভুলে গিয়ে এখন জেগে উঠেছে রোদ্দুর। ভাদ্র মাসের আকাশে সাদা জামা পরে ভেসে বেড়াচ্ছে হালকা মেঘের দল। দূরে কোথাও কাশ ফুলের দল তুলোর শরীরে মাথা দোলাচ্ছে নিশ্চয়। সেই ‘সোনাডাঙার মাঠ’ পার হয়ে ‘কদমতলার সাহেবের ঘাট’ , ‘শাঁখারিপুকুর’ পার হয়ে , সেই যে দুপুরবেলা শিরীষ সোঁদালি বনে পাখিটা ডেকে যায়, জামরুল গাছের তলায় ঘন হয়ে আসা রোদ্দুরের ছায়া, গন্ধরাজ গাছে একটা বৌ-কথা-কও পাখি, ভাঙা দালানে লাল মেঝের ওপর শান্ত শেতলপাটি….আরও দূরে ধলচিতের খেয়াঘাট, মাঝেরপাড়া স্টেশনের ডিসট্যান্ট সিগন্যাল…সেখানে রেল লাইনের ধারে নিশ্চয় ফুটে উঠেছে কাশফুল…আমাদের দৃষ্টি সংকীর্ণ, দেখতে পাই না কিছুই…
কিন্তু ব্যারাকপুরের স্টেশন ছাড়িয়ে বড় রাস্তা থেকে ডানদিকে গলির ভিতর সেই বাড়িটা দেখতে পায় সবকিছু। ঠান্ডা মেঝে, পুরনো দিনের লোহার শিক দেওয়া জানলা, কত বন্ধ তালা দেওয়া কাঠের আলমারি, একটা আমগাছ ছায়া মেলে ধরেছে বাড়িটার মাথায়, কোন জন্মের যেন আত্মজন, দুহাত বাড়িয়ে ডেকে চলে, এসো, এসো, তোমরা আসবে বলেই তো আমি বসে আছি এখনও। থরে থরে সাজিয়ে রাখে সব প্রত্নচিহ্ন। ছেলে বাবলুর জন্য জমিয়ে রাখা রেলের টিকিট রাখা থাকে বন্ধ শোকেসে। এক বাবার আনা উপহার, তার শিশুপুত্রের জন্য! ওই বাড়িই তো হরিহর রায়ের ভাঙা ভিটে, ভন্ডুল মামার শেষ-না-হওয়া বাড়ি, কত বর্ষা শেষের মেঘভাঙা বিকেলের আলোয় ওই ঘরের চৌকাঠ পার হয়ে বেরিয়ে আসে শ্রী অপূর্ব কুমার রায় আর লীলা! দোতলার ঘরে শুয়ে থাকে রোগজর্জর সেই পাড়াগাঁয়ের কিশোরী মেয়েটা, যে একদিন বলেছিল, —অপু, সেরে উঠলে আমায় একদিন রেলগাড়ি দেখাবি ?
একতলার ঘরের মেঝেয় চুপ করে একা বসে থাকি। চারপাশে তাঁর চিহ্ন। শরীর ভারী হয়ে আসে। শুধু মাথা নামিয়ে মনে মনে বলি,
—যে ভাষায় আপনি সৃষ্টি করেছিলেন রাজসম্পদ, আমি সে ভাষার অতি দীন একজন শব্দলেখক। আমাকে ক্ষমা করবেন, আশীর্বাদ করুন, যেন লিখিত শব্দের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারি আজীবন।
কেউ উত্তর দেয় না। শুধু এক অচেনা বাতাস শরীর ছুঁয়ে ভেসে যায়। উঠে আসি। গেট বন্ধ করে রাস্তায়। একটা পাতা খসে পড়ে ওপর থেকে। বাইরে আকাশ আবার কালো হয়ে এসেছে। বৃষ্টি আসছে।

ছবিঃ গুগল