কবি সম্বর্ধনা বরফি ও প্রজ্ঞাদেবী

‘কবি সম্বর্ধন বরফি’র কথা এখন আর কে মনে রেখেছে? বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে ‘রামমোহন দোল্মা পোলাও’ অথবা ‘দ্বারকানাথ ফির্নিপোলাও’-এর নাম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশতম জন্মদিনে এই বিশেষ ‘কবি সম্বর্ধনা বরফি’ নিজের হাতে তৈরী করে পরিবেশন করেছিলেন হেমেন্দ্রনাথের মেজো মেয়ে প্রজ্ঞাদেবী। সেই বরফি খাওয়ানো হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর জন্মদিনে আসা অতিথি-অভ্যাগতদের।দোল্মা অথবা ফির্নি পোলাও তৈরী করা এবং বিশিষ্ট মানুষদের নাম তার সঙ্গে জুড়ে দেয়ার বুদ্ধিটাও তারই ছিলো।
কোন কোন উপাদানে তৈরী হয়েছিলো সেই বরফি? শুনলে চমকে উঠতে হবে।সেই বরফির মূল উপাদান ছিলো ফুলকপি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিলো খোয়া ক্ষীর, বাদাম, কিশমিশ, জাফরানপাতা আর সোনা, রুপার তবক। শোনা যায় সেই বরফি খেয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে অন্য অতিথিরা ধন্য ধন্য করেছিলেন। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কেউ নাকি বুঝতে পারেননি, বরফি তৈরি হয়েছে ফুলকপি দিয়ে।
এমনই সব মজার মজার পদ খুব অনায়াসে তৈরী করে সবাইকে অবাক করে দিতে পারতেন প্রজ্ঞাদেবী। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে রান্নার জন্য ছিলো তাঁর ভীষণ সুনাম। শুধু নতুন নতুন খাবার তৈরিই নয়, সেসব পদের অবাক করা নামও দিয়ে দিতেন তিনি।
তবে শুধু রান্নাঘরেই পটুত্ব দেখিয়ে ক্ষান্ত হননি কবির ভাইয়ের এই কন্যা। রান্না বিষয়ে রীতিমতো বই লিখে ফেলেছিলেন। সেই আমলে রন্ধন ও ভোজনপটু বাঙালির ঘরে তাঁর লেখা তিন খণ্ডে ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ সবসময় মজুদ থাকতো। তবে শুধু রন্ধনশিল্প নয়, তার সঙ্গে গার্হস্থ্যবিজ্ঞান, এমনকি লোকসংস্কৃতি চর্চাতেও প্রজ্ঞার ভূমিকা ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
সে আমলে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের একটা বিশেষ দৃষ্টি ও মানসিক গড়নের সূত্রপাত হয়েছিলো ওই বাড়ির আবহ থেকেই। প্রজ্ঞার বাবা হেমেন্দ্রকুমার নিজেও রান্না নিয়ে চর্চা করতে ভালোবাসতেন। বাকিটা ছিলো প্রজ্ঞার নিজস্ব প্রেম ও গবেষণা। তাই, ‘বিনা পেঁয়াজে পেঁয়াজের গন্ধ করা’ থেকে শুরু করে বাসি-তাজা মাছ চেনার উপায়ের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় নানাকিছুর সূত্র তিনি সহজে বুঝিয়ে দিয়েছেন বিইতে। “গঙ্গা হইতে সদ্য ধরা ইলিশ মাছটি দেখিবে নৌকোর মতো বাঁকা, যত বেলা বাড়িবে ক্রমশ সোজা হইতে থাকিবে”। সামান্য, কিন্তু খুব নিবিড় এই পর্যবেক্ষণ। কবিরাজির শিক্ষাও কম-বেশি ছিল প্রজ্ঞার। নানা পথ্য তৈরীর নির্দেশনা থেকেও সে বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা যায়।
তবে, বাঙালির ভোজসভায় প্রজ্ঞার সবচাইতে বড় অবদান বোধহয় বাংলায় ‘মেনুকার্ড’-এর জন্ম দেওয়া। তাঁর নিজের ভাষায় সেই কার্ডের নাম ছিলো ‘ক্রমণী’। বিলেতের ভোজসভায় মেনুকার্ডের চল তখন শুরু হয়ে গেছে। প্রজ্ঞা ঠিক করলেন সেই মেনুকার্ড তিনি বাংলা ভাষায় তৈরী করবেন। প্রাথমিক অবস্থায় সেই কার্ড হাতে লিখে দেয়ালে টানিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করলেন তিনি। ভাবনাকে কাজে পরিণত করতে বেশী সময় নেননি প্রজ্ঞাদেবী। তাঁর হাতে যে যে ক্রমণী জন্ম নিল, সেগুলি নিছক তৎকালীন ঠাকুরবাড়ির ভোজের ঐতিহাসিক নথিমাত্র নয়, ঘোরতর শিল্পের সামগ্রী। একটা নিরামিষ ক্রমণীর দিকে চোখ বোলালেই কারণটা স্পষ্ট হবে-
‘জাফরাণী ভুনি খিচুড়ি
ধুঁধুল পোড়া শিম বরবটি ভাতে
পাকা আম ভাতে
পটলের নোনা মালপোয়া
পাকা কাঁঠালের ভূতি ভাজা
কাঁকরোল ভাজা
ভাত
অড়হর ডালের খাজা
লাউয়ের ডালনা
বেগুন ও বড়ির সুরুয়া
ছোলার ডালের ধোঁকা
বেগুনের দোল্মা
আলুবখরা বা আমচুর দিয়ে মুগের ডাল
পাকা পটলের ঝুরঝুরে অম্বল
ঘোলের কাঁঢ়ি
রামমোহন দোল্মা পোলাও
নীচুর পায়স
নারিকেলের বরফি।’
পুরো ‘ক্রমণী’ আসলে একটি মুক্তক কবিতা। নিরামিষ মেনুও তার কৌশলী উপস্থাপনায় সরস হয়ে উঠেছিলো। এখন সেসব খাবার হয়তো আর চোখে দেখাও সম্ভব নয়। পটলের ঝুরঝুরে অম্বল, ঘোলের কাঁঢ়ি, নীচুর পায়েস, পটলের মালপোয়া, কাঁঠালের ভূতি ভাজা—তো এই জমানায় ইতিহাস হয়েই থাকলো।
এতোসব রান্নার পদ প্রজ্ঞা নিজেই আবিষ্কার করতেন। রোজা রামমোহন রায় অথবা প্রিন্স দ্বারোকানাথ ঠাকুরের নাম জুড়ে দিয়েও তিনি তৈরী করেছিলেন মজাদার খাবার। নিজের অকালমৃতা মেয়ের নামও প্রজ্ঞা জুড়ে দিয়েছিলেন নতুন পদের সঙ্গে—সুরভি পায়েস।
শুধু নানা পদ নয়, নানাধরনের পানসাজা ও মশলা তৈরিতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। প্রায় বারো রকমের পান সাজার কথা লিখেছেন নিজের বইতেই। এরমধ্যে মিঠা পান- পোলাও তাঁরই আবিষ্কার। তাছাড়া, নানাজাতের চুন-খয়ের, মশলা তৈরির গোপন রেসিপি তো রয়েছেই।
স্বামী ছিলেন আধুনিক অহমিয়া সাহিত্যের জনক লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া। যাঁকে নাকি বিয়ের দিন দেখেই ফিক করে হেসে ফেলেছিলেন প্রজ্ঞা। কারণ অদেখা এই মানুষটিকে নাকি স্বপ্নে দেখেছিলেন তিনি। লক্ষ্মীনাথও নাকি প্রজ্ঞাসুন্দরীর ছবি দেখেই এক কথায় রাজি হয়ে গেছিলেন বিয়েতে। তবে প্রজ্ঞাদেবী কখনোই ঠাকুরবাড়ির পাদপ্রদীপের আলোয় তেমন ভাবে ফুটে ওঠেননি। রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল উপস্থিতিই তো এমন বহু মানুষকে ঠেলে দিয়েছে ছায়ার ভেতরে, অন্তরালে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ বঙ্গদর্শন, কলকাতা