চাঁননানা, পরী ও মোটরবাইক

শবনম ফেরদৌসী ,
চলচ্চিত্র নির্মাতা

চাঁন নানা, আম্মার সবচেয়ে বড় মামা।আমার শৈশবের সান্তাক্লজ।গড়নে-বলনে-দেখনে যেন সাক্ষাৎ এক সান্তা।বিশাল বপু, লালচে গায়ের রং , একমুখ চুলদাঁড়িতে মাখামাখি।আর তাতে চুইয়ে পড়ছে আনন্দ, জীবনের উল্লাস। সে সব ঠেলে দীপ্রমান এক ঝিকিমিকি চোখ।

তো নানা হঠাৎ কোন কোন সকালে পেট্রোলের গন্ধ ছড়িয়ে আমাদের মফস্বলের বাড়িতে হাজি্রা দিতেন তার লালরঙা হোন্ডা মোটরবাইক নিয়ে।আমরা হৈ হৈ করে উঠি, “নানা এসেছে! নানা এসেছে!” নানা বারান্দাতেই আমাকে আর তুলতুলকে ছোঁ মেরে কোলে কাখে করে ফেলতেন।যেমন দশাসই আমাদের চাঁননানা।তেমন দশাসই তার মন। তেমন দশাসই তাঁর জগৎ। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াতেন!জীবনে ১৭ বার চাকরী বদল করা হয়ে গেছে সে যুগে।ঘর সংসার ফেলে পোস্টিং নিতেন দূরদূর এলাকায়।এর উপকার করেছেন তো তার হয়ে খেটে দিয়েছেন।

নানার ছিলো ডায়বেটিস।পকেটে তার স্যাকারিনের ছোট্ট কৌটো সিগারেটের বক্স আর ইস্পাতের লাইটার। নানা  আসতেন ছুটির দিনগুলিতে বেলা ১০টা ১১টার দিকে।খেতেন এক কাপ র’টি, ডাবল ডিম পোচ, সেমাইয়ের জর্দা আর পুডিং। আয়ত পেয়ালার স্বচ্ছ চায়ে রোদ উঁকি দিতে পারতো।তাতে নানার দু’দানা স্যাকারিনের পড়ে যাওয়া । আমি আর তুলতুল মুগ্ধ হয়ে তরল চায়ে সেই স্যাকারিনের ক্ষুদে বড়ির নিমজ্জন দেখতাম। নানা চা শেষ করে সিগারেট ধরাতেন। কি মিষ্টি তামাকের গন্ধ। আমি আর তুলতুল সেই সিগারেটের ঘ্রান নিতাম বুক ভরে। আর উত্তাপ নিতাম লাইটারের। আগুন জ্বলার পর ইস্পাতের লাইটার এক অদ্ভুত সুগন্ধ ছড়ায়। আমরা নাকে লাগিয়ে দেখতাম। অচেনা এক ঘ্রান আমাদের ছয় আর চার বছরের নাকে গেঁথে যেত। নানা চা পুরোটা শেষ করতেন না। খানদানী মুসলমানের নিদর্শন হিসেবে খাবার সবটা খেয়ে নিতে নেই। তাই কোয়ার্টার পরিমান চা পরে থাকতো বিশাল এক বোন চায়না কাপে। একবার হলো কি ! নানা চলে যাওয়ার কালে আমরা তাঁকে এগিয়ে দিতে  যাই। আমি , ভাইয়া, আম্মা, আব্বা। ফিরে দেখি তুলতুল বিশাল কাপ দু’ হাতে ধরে তাতে চুমুক দিচ্ছে। কারন ঐ মন ভোলানো স্যাকারিন। যা সকলে খায়না , বাচ্চারা তো নয়ই । নিরূপায় হয়ে ও তাই নানার চুমুক দেয়া চায়ে চুমুক দিলো। আমি বহুকাল ভয়ে ভয়ে ছিলাম তুলতুলের আবার ডায়েবেটিস হয়ে গেলো নাতো! নানার কাপে খেল যে!

নানার সবতাতেই চমক।  যাবার আগে কখনো রেইনকোট কখনো ভারী জ্যাকেট চাপাতেন গায়ে, মাথায় হেলমেট। কেমন এ্যাস্ট্রোনাটের মত দেখাতো নানাকে! পায়ে ভারী বুট। সে জুতো দিয়ে কেমন ভঙ্গিমায় চাপ দেন এক্সিলেটরে । আর ম্যাজিকটা ঘটতো সেই চাপে স্টার্ট দেবার কালে। নীলাভ আগুন মসৃন হয়ে দেখা দিতো। যেন ঠিক রকেটের লেজ। আর সেই রকেটের নীলচে আলোতো মাদকতা মেশানো গন্ধ ।নানা চলে যাবার পরও আমরা দাঁড়িয়ে  দাঁড়িয়ে সেই গন্ধে নাক ভরিয়ে নিতাম। বৃষ্টির দিন বা কুয়াশা ঘেরা সকাল হলে সেই ঘ্রান দীর্ঘস্থায়ী হতো।

নানা মাঝে মাঝেই আমাদের দু’বোনকে বাইকে ঘোরাতো। সামনে বসানো হতো নীলপরী (তুলতুল) আর পিছনের ক্যারিয়ারে লাল পরী (আমি)। নীল পরীকে খুব ইর্ষা হতো সে সময়। কারন, সে সামনে বসার সুবাদে সবটা দেখে নিচ্ছে। আর লাল পরী তার ছোট্ট দু’হাতে নানার বিশাল বপু আঁকড়ে ধরতো কসরৎ করে। তার ক্ষুদে হাত পুরো পেটের বের পায়না। অমনি ছুট দেয় মোটর বাইক। বাতাসের বেগে নীল পরী, লাল পরীর রেশম চুল উড়ে উড়ে যায়।

লাল পরী নানার কোমর পেঁচিয়ে ধরায় চোখে আছড়ে পড়া চুল সরাতে পারেনা। তার আর চোখ মেলে কিছু দেখা হয়না। সে শুধু শুনে শব্দ আর তিরিতিরে এক রত্তি গায়ে জোটে অফুরন্ত হাওয়ার দমক। শুধু বোঝে, সে যে রোজ রোজ “ভীনদেশী রাজকুমার রাজকুমার” খেলা খেলে, সেই মিছেমিছি রাজকুমারের পঙ্খীরাজে উঠলেও এমনি বোধ হবে। হাওয়া হাওয়ায় উড়ে যাবে চুল সকল।নানার কোমরের বদলে দু’হাতে জোড়সে ধরে রাখতে হবে সেই পঙ্খীরাজ ঘোড়ার লাগাম। দু’পাশে পা ঝুলিয়ে খেতে হবে বাতাসের  চাবুক। পতপত করে উড়বে তার ফ্রকের ফ্রিল।

আমার কোনকালেই লালপরী হতে ইচ্ছে করতোনা। আমি চাইতাম নীলপরী হতে, নীলপরীও চায় লালপরী হয় সে। একদিন দু’বোন মিলে বায়না ধরলাম। “নানা,নানা এখন থেকে আমি নীলপরী আর তুলতুল লালপরী হোক।” নানা দরাজ গলায় হেসে উঠেন, আপুমনিরা তা তো হয়না।  লালপরী-নীলপরী তো হয়ে গেছে। আমি ভেবে বলি, “তাহলে আমাকে সবুজ পরী করে দিন। আর ওকে হলুদ।”

আমরা বলি, “কেন হয়না নানা, কেন? আমাদের এই রং পছন্দ না।” নানা বলেন , পরীর জগতে এটাই নিয়ম। বড়জন লাল আর ছোটজন নীল।”

নানা হো হো করে গান ধরেন,

“আমাদের দেশটা স্বপ্নপূরী। সাথী মোদের ফুলপরী। ফুলপরী,লালপরী,নীলপরী। সবার সাথে ভাব করি।”

আমরা দুজনে লাফাই, “নানা আমরা তাহলে ফুলপরী! ফুলপুরী!” নানা বলেন, “ফুলপরীর চে আমার লাল-পরী নীল-পরী অনেক সুন্দর।” অগত্যা আমরা হাল ছেড়ে মুখ ব্যাজার করে বসে থাকি । দেখি নানার পকেট থেকে স্যাকারিন বের করার সেই মাহেন্দ্রক্ষন, স্যাকারিনের টুপ করে ডুবে যাওয়া,কোদালাকৃতি টি স্পুনে চায়ের  ঘূর্নি, খানিক ছলকে ওঠা চা এবং ইস্পাতের লাইটার জ্বলার ঘ্রানে আমাদের লালপরী-নীলপরী স্বত্তায়  থিতু হয়ে বসে থাকা।