সুরের টানে আমার লেখা: মাস মাসুম

শেখ রানা (লন্ডন থেকে)

যেখানে গীতিকবির উপাখ্যান শুরু…

গান শোনার আসক্তি ছিলো কৈশোর থেকেই। নির্দিষ্ট কিছু নয়- মেটাল, রক থেকে শুরু করে জারি,সারি,ভাটিয়ালি। এই যে সুরের ঘুলঘুলি আবেশ তৈরি করলো চারপাশে, সেই আবেশেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে নিজেকে সমর্পণ করলেন।  ইবরার টিপু(পরবর্তিতে সুপরিচিত মিউজিক কম্পোজার),পাপ্পু, চান ভাই, উত্তাল আর তপন-কে নিয়ে তৈরি হলো ব্যান্ড লোনসাম। সময়কাল ১৯৮৯। উত্তরবঙ্গের মফস্বলের সহজিয়া সন্ধ্যায় কিছু আলোড়নও উঠলো। কিন্তু সময়ের আবর্তে ব্যান্ডের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেল। সবাই নিজস্ব ব্যস্ততায় ছিটকে পড়লেন। একজন গীতিকবি মনে মনে আহত হলেও কলম আর খাতায় শব্দচয়ন শুরু করলেন নিঃসঙ্গ হয়েই।

মাস মাসুম

যাদুর শহরে আগমন…

মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ।  মাস মাসুম নামে পরিচিত হলেন সময়ের হাত ধরে। কিন্তু তারও আগে অনেক শব্দের হাউই ওড়ালেন মফস্বলে, অতঃপর যাদুর শহর ঢাকার আকাশে-বাতাসে-নিয়ন আলোর জন্ডিস রঙে। কখনো সারা বেলা মন ভেজানোর কথা বলে, কখনো ধূলো পরা চিঠির মুহূর্ত, কখনো ইচ্ছে হলেই লালন বেশে হারিয়ে যাওয়ার সুত্রধর হয়ে।

কিন্তু শুরুতে এ রকম মসৃনতা ছিলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন দিনগুলিতে আরামবাগে এক মেসে ইবরার টিপুর সঙ্গে রাত জেগে আড্ডা আর গান লেখা সুর করা গিটারে। মাসুম লেখেন, টিপু সুর তোলেন। এই স্টুডিও-ওই স্টুডিও ঘোরাঘুরি। সে রকম একদিনে ‘আমি আগের ঠিকানায় আছি’ খ্যাত মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পুরো অ্যালবাম এর গান লিখে দিতে হবে। মাস মাসুম মনে মনে দারুণ উত্তেজিত। ‘দ্বীপ জ্বলেছি শুধু’-গানের রেকর্ডিং শুরু হয় অডিও আর্টে। কিন্তু বিধি বাম! সেই গানগুলো কীভাবে যেন অন্ধকারেই আলো ছড়ায়। আলোর মুখ দেখে না আর।

রাতের ট্রেন এ কাঙ্ক্ষিত সব দিন…

কিন্তু আঁধার ফুঁড়ে অপেক্ষার পালা শেষ করতেই যেন আলোকবর্তিকা হাতে বন্ধু পাশে এসে দাঁড়ায়। মাস মাসুম এর লিরিক বাসুদেব ঘোষ হাতে পান। বাসায় আমন্ত্রণ জানান লিরিকসমেত। এক সুন্দর সকালে মাস মাসুম পৌঁছে যান কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। সেই আগমন মুহূর্তটাই স্মরণীয়। কারণ বাসুদেব এর সঙ্গে সেভাবে কাজ না হলেও পরিচয় আর নিবিড় বন্ধুত্ব হয়ে যায় শুভাশিষ মজুমদার বাপ্পা-র সঙ্গে।

বাপ্পা-বাসু তখন একসঙ্গে গান বাঁধেন। সেই পালাক্রমেই মাস মাসুম এর সঙ্গে ফের দেখা হয়ে যায় কলেজের বন্ধু বাংলা ক্ল্যাসিকাল আধুনিক গান এর সানী জুবায়ের এর সঙ্গে। ‘অস্থিরতার বাঁকে’ আর ‘এমন করে ডেকোনা আমায়’ শিরোনামে দুটো গান ‘সারা’ অ্যালবামে স্থান করে নেয়। শুরু হয় বাপ্পা আর মাসুমের যুগলবন্দী।

১৯৯৮-৯৯। বাপ্পা শুরু করেন তার তৃতীয় সলো রাতের ট্রেন এর কাজ। রাত পেরিয়ে ভোর নেমে আসে নীলা মেটার্নিটি গলির সেই বাসায়, বেইলী রোডে আর স্টুডিয়োর আড্ডায়। সেই আড্ডায় শুধু আছে গান আর গান। নতুন গান বাঁধার স্বপ্নে দুজনেই আন্দোলিত। ভেসেছি, রাতের ট্রেন, আউলা বাতাস, কবিতার শিরোনামে- সহ ছয়টি লিরিক সুর খুঁজে পায়। অ্যালবাম প্রকাশ পায় একদিন। আনন্দের পালে আউলা বাতাস ঠিকঠিক এসে লাগে।

অতঃপর সুরের টানে আমার নেশা…

তারপর একের পর এক গান হয় বাপ্পার সুর আর সঙ্গীত আর অবশ্যই বাপ্পার গায়কীতে। ধূলো পড়া চিঠিতে ‘কখনো ইচ্ছে হয়’, ‘শব্দহীন’ আর টাইটেল ট্র্যাক ‘ধূলো পড়া চিঠি’, ক’দিন পরেই ছুটিতে ‘তুমি আছো তাই’, ‘তুমি কেঁদোনা’, রাতপ্রহরী অ্যালবামে ‘চোখ জোড়া’, ‘কে যে আমার’, ‘চলে গেছ কবে’, ‘নীল আকাশ’, বেঁচে থাক সবুজ অ্যালবামে ‘চোখেরই জলে’, জানিনা কোন মন্তরে-তে ‘কোন তরী বাও’ এর দীর্ঘ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ২০১৬ তে বোকা ঘুড়ি অ্যালবামে ‘একটা ছায়া’। লিখেছেন মিক্সড অ্যালবাম এ বাপ্পার গাওয়া ‘ফিরে এসো’, হৃদয়ের ক্যানভাসে এ ‘অধরা’ আর  অপরিচিতা অ্যালবামে বাপ্পারই সুর-সঙ্গীতে জেমসের জন্য ‘সুরের টানে আমার নেশা’-র মত অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় লিরিক।

গীতিকবিতার ফুলেল কিন্তু বিমূর্ত যন্ত্রনাময় পথের বাঁকে লেখা হয়েছে এন্ড্রু কিশোর (পাথর কালো রাত), কানিজ সুবর্না(সুখ ছুঁয়ে যায়, তোমায় পেলে, দিন কাটে না) ফাহমিদা নবী(মন ভেসে যায়)সহ ব্যান্ড সোলস, আর্ক, অবসকিওর আর প্রমিথিউস এর জন্য লিরিক।

তারপর ভাবনায় ডুব দিয়ে নিজের জন্য ভাবনা…

অনেক বছর গান লিখে মাস মাসুম নিজের জন্য কিছু গান বাধাঁর কুড়েঘরে প্রবেশ করলেন, সন্তর্পনেই। নাগরিক ব্যস্ততার প্রাত্যহিক জীবনে একদিন রিকশায় বসে গুনগুন করে সুর করলেন ‘প্রতিদিন’ শিরোনামে একটি লিরিকে। স্টুডিও তালকাচারীতে মুহূর্ত দেরী না করে ছুটলেন। আমজাদ হোসেন এর সঙ্গীতে কন্ঠ ধারণ করা হলো।

কিছুদিন আগেই জিপি মিউজিক থেকে প্রকাশিত হয়েছে কামরুজ্জামান সুজন এর সঙ্গীতে ‘মন যদি না চায়’। ‘মন তো বাঁধা পড়েছে’, ‘তোমাকে চাই’- গান দুটো প্রিয় বন্ধু বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গীতে গান এর আদল পেতে শুরু করলো। সুজন এর সঙ্গীতে ‘একটি ঝড়ের রাতে’-ও তৈরি হয়ে গেল সবার অলক্ষ্যেই।

একদম সাম্প্রতিক কাজের কথা জানতেই মাসুমের ভাষ্য,’ নিজের কথা সুরে একটা ফোক অ্যালবামের পরিকল্পনা করেছি। প্রাথমিক ভাবে ফাহমিদা আপার সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি সানন্দ্যে সম্মিত জানিয়েছেন এই অ্যালবামের সঙ্গে যুক্ত হতে। আমার স্বপ্নের প্রজেক্ট হবে এই অ্যালবাম।

প্রিয় তিন গান আর গানের গল্প…

‘কখনো ইচ্ছে হয় ’- এই লিরিকটা লেখা হয়েছে সুরের উপর। স্টুডিওতে বসে বাপ্পা মজুমদার কী বোর্ডে একটা প্রোগ্রেশন বাজাতেই মাসুমের মাথায় গানের মুখটা এসে যায়। মাথায়, মাথা থেকে হাতে-কাগজে-কলমে। মূলত অন্য একজন কন্ঠশিল্পীর জন্য গানটি তৈরি করা হচ্ছিলো তখন। কিন্তু ফিরতি পথে বাপ্পা-মাসুম দুজনেই একই ভাবনায় আনন্দডুব দিলেন। গানটি তো বেশী ভালো হয়ে গেল। বাপ্পার জন্য রেখে দিবেন। কিন্তু তা কী ঠিক হবে? এই দোদুল্যমান অবস্থায় একদিন ডিজিটোন স্টুডিওতে রেকোর্ডিং শুরু হলো। তখনও এক অন্তরা লেখা বাকী। ভোকাল মুখ গাওয়া শুরু করেছেন। মাসুম অন্তরা লিখতে ছাদে চলে গেলেন। এদিকে উৎকণ্ঠাও কাজ করছে। নির্দিষ্ট সময়ে লেখা শেষ করে স্টুডিওতে ঢুকে যেতে হবে।

অবশেষে লেখা হলো। আনন্দ সঙ্কট উত্তরণে এগিয়ে এলেন সেই কন্ঠশিল্পী স্বয়ং। ‘এই গানটা বাপ্পা ভাই গাইলেই ভালো হবে।’ আর কী! ধুলো পরা চিঠিতে চলে এল কখনো ইচ্ছে হয়। শ্রোতারা পেয়ে গেল অসাধারণ এক সৃষ্টি।

রাতের ট্রেন

১৯৯৮ এর দিকে। একদিন হাবিব এর আমন্ত্রণে বাপ্পা আর মাসুম হাবিব ওয়াহিদ এর স্টুডিওতে গেলেন । হাবিব কিছু ট্র্যাক শোনাবেন বাপ্পাকে। একটা ট্র্যাক খুব মনে ধরলো বাপ্পার। যথারীতি মাসুমের হাতে দায়িত্ব এলো লেখার। কিন্তু লেখা তো আসে না। এ রকম এক দিনে উত্তরবঙ্গে যাত্রা। রাতের ট্রেনে। রাতের ইন্দ্রজাল, আলো-আঁধার, নীরবতা ভেঙ্গে ট্রেনের হুইশেল-সব যেন মাসুমের হৃদয়ে টংকার দিলো। লেখা হয়ে গেল চারিদিকে আজ নেমেছে আঁধার/অপলক এই দৃষ্টি আমার/ যেতে হবে আজ অনেক দূরে/ চলছে রাতের ট্রেন, নীরবতা ভেঙ্গে দিয়ে। বাপ্পার রাতের ট্রেন অ্যালবামে টাইটেল ট্র্যাক হয়ে গেল হাবিব এর সুর-সঙ্গীতে।

সুরের টানে আমার নেশা

মাস মাসুম

‘চুপচাপ রাত। বারান্দায় দাঁড়িয়ে  সিগারেট জ্বলছিল ঠোঁটে। কিছু কী ভাবছিলাম? মনে পড়ে না। হঠাৎ মাথার ভিতর কিছু কথা ঘুরপাক খেতে লাগলো, অনবরত। তাড়াহুড়ো করেই ঘরে ফিরে দেখি আলো নেই। কিন্তু কথাগুলোকে লিখে না ফেললে যদি ভুলে যাই? কোনোরকমে অন্ধকারে এক টুকরো সাদা কাগজ পেতেই বন্ধ চোখে লিখে ফেলা সুরের টানে আমার নেশা। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

কিছুদিন পর স্টুডিওতে যাই সেই কাগজের টুকরোটা নিয়ে। বুকপকেটে সযতনে রাখা। বাপ্পা তখন জেমস ভাই এর জন্য একটা গান করবে। অপরিচিতা মিক্সড অ্যালবামে। কী বোর্ডে নিজ মনে সুর তুলছিল ও। আমার কাছে লিরিক চাইতেই আমি পকেট থেকে সেই কাগজের টুকরো বের করে দিলাম। তখনই তৈরি হয়ে গেল ‘সুরের টানে আমার নেশা’। জেমস ভাই একদিন কন্ঠ দিলেন। কী অপার্থিব ভালো লাগা! এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, এমন লিরিক আর লিখতে পারবো না! এমন মুহূর্তও আর আসবে না ফিরে।’-স্মৃতিকাতর হলেন মাস মাসুম।

প্রিয় গীতিকবিদের জন্য পংতিমালা..

প্রিয় গীতিকবিদের প্রসঙ্গ আসতেই মাস মাসুম প্রথমেই স্মরণ করেন সঞ্জীব চৌধুরীর কথা। মাসুমের কথায়,’ সঞ্জীব’দার মত শব্দচয়ন আমি আর তো কাউকে করতে দেখি না। কী হাহাকার আর বিষাদ। নিজের জীবন থেকে শব্দ ধরা এক এক। সঞ্জীব’দার সব লিরিক আমার প্রিয়।

মাস মাসুমের প্রিয় গীতিকবিদের মধ্যে আরো আছেন লতিফুল ইসলাম শিবলী, নিয়াজ আহমেদ অংশু, শেখ রানা আর লুৎফর হাসান।

‘এদের সবার নিজস্বতা আছে। আমার খুব পছন্দের গীতিকবি এই  ক’জন। যেমন শিবলী ভাই এর গীতিকবিতার কথা বললে তো কথাই ফুরাবে না। ‘হাসতে দেখ’, ‘আহা জীবন’, ‘জেল থেকে বলছি’-অসংখ্য গান প্রিয়। দ্রোহ আর ভালোবাসার অপূর্ব মিশেল পাই শিবলী ভাই এর লেখায়।

নিয়াজ আহমেদ অংশুর লেখার হাত দারুণ। বাচ্চু ভাই এর সাথে দূর্দান্ত সব সৃষ্টি। অংশুর ছোট ছোট বাক্যে গান লেখার ব্যাপারটাই অন্যরকম, খুব স্টাইলিশ লাগে আমার কাছে।

শেখ রানা-র সঙ্গে আমার পরিচয় রাতের ট্রেন অ্যালবাম এ কাজের সময় থেকেই। বাপ্পা আর দলছুট এর জন্য দারুণ সব লিরিক আছে ওর।  এক ‘পরী’ গান-ই তো একটা নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করলো। রানার গদ্যে লেখার হাতও চমৎকার।

এ রকম আর এক গীতিকবি লুৎফর হাসান। বহুমাত্রিক লেখক, গীতিকবি। অন্তর্জালে আমি ওর লেখা মন দিয়ে পড়ি।’- মাসুমের কথা শেষ হয়।

কিন্তু নতুন করে পথ চলা শেষ হয় না। নতুন করে, নতুন কিছু গান এর সৃষ্টি চলতে থাকে। পথের বাঁকে, ভাবনার অলি-গলিতে এই যে সৃষ্টির অনুরণ-নতুন করে নতুন ভাবে দ্যোতনা দেয় মনে।

গীতিকবি মাস মাসুমের পথ এভাবেই সুরের টানে লেখা হয়। একের পরে এক।

ছবি: লেখক