আমাদের বন্ধু… আমাদের প্রতিবেশি

মিজানুর রহমান খান (বিবিসি সাংবাদিক)

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

এই ভদ্রমহিলাকে আমি মাঝে মধ্যেই দেখি। অফিসের সামনে যে কয়েক’শো বছরের প্রাচীন একটি গীর্জা, অল সোলস, তার গোড়ায় একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এসময় তাকে খুব অবিচল থাকতে দেখা যায়। এরকম দৃশ্য লন্ডনে খুব একটা বিরল কিছু নয়। রাস্তাঘাটে চলার সময় এরকম ছোটখাটো প্রতিবাদী মানুষ হরহামেশাই চোখে পড়ে।
কিন্তু এই মানুষটি আমাকে খুব অবাক করতো। প্রথমত তিনি বৃদ্ধ একজন মানুষ। দ্বিতীয়ত তিনি একা, এই প্রতিবাদে তার কোন সঙ্গী নেই। তৃতীয়ত তার প্ল্যাকার্ডটি আমাকে খুব আকৃষ্ট করতো। ভাবতাম- ছোট্ট একটা রবিন পাখির জন্যে তার কত্তো মমতা!
দু’একদিন তাকে দেখেছি, এবং নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে চলেও গেছি তার পাশ দিয়ে। কিন্তু গতকাল কিছুটা কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেলাম তার দিকে। নিজের পরিচয় দিলাম। তারপর কিছুক্ষণ গল্প করলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অনুমতি নিয়ে এই ছবিটিও তুলেছি।
এই মানুষটির নাম মার্গারেট অ্যালেন। বয়স ৯০ এর উপরে। থাকেন লন্ডনের টটেনঅ্যাম এলাকায়। বললেন, গত দু‘মাস ধরে তিনি আসেন এখানে। আসেন প্রতিদিন। কাজের ভেতর থেকে কিছুটা সময় বের করে এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। কখনো সকালের দিকে আসেন, কখনো দুপুরে, আবার কখনো বিকেলে আসেন। বুঝলাম, যদি আমার অফিসে আসা কিম্বা ছুটি হওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায় শুধু তখনই আমি তাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।
তার এই দাঁড়িয়ে থাকার কারণ – যদি তার দাবিটা কখনো বিবিসির চোখে পড়ে। কি সেই দাবি? লন্ডনের যে বাড়িতে তিনি থাকেন সেই বাড়ির বাগানে একসময় নাকি অনেক রবিন পাখি ছিল। এখন সেখানে সেই আগের মতো আর কিচির মিচির ডাক শোনা যায় না। বিপন্ন হয়ে পড়েছে ছোট্ট এই পাখিটির জীবন। কীভাবে? পোষা বিড়ালের কারণে। তিনি বললেন, শুধু গত সপ্তাহেই তিনি যে রাস্তায় থাকেন তার আশেপাশের বাড়ির বিড়ালগুলো নাকি সাত সাতটা রবিন মেরে ফেলেছে!
তিনি বললেন, অস্ট্রেলিয়াতে গত বছর ৬১ মিলিয়ন রবিন প্রাণ হারিয়েছে বিড়ালের হাতে। একারণে নিউজিল্যান্ডের কয়েকটি গ্রামে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে বিড়াল পোষা। আমি জানতে চাইলাম, তাহলে বিড়ালের কী হবে! উত্তরে তিনি বললেন, কেউ যদি বিড়াল পালে তাহলে সেটা ঘরের ভেতরে থাকতে হবে, আর যদি বাইরে বের হয় তাহলে সেটা একটা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকবে মালিকের হাতে।
আমি বললাম, এই রবিন পাখির জন্যে আপনার এতো ভালোবাসার কারণ কি? দেখলাম তার বয়স হয়ে যাওয়া চোখ দুটো হঠাৎ করে ছলছল করে উঠলো। বললেন, ওরাও তো আমাদের বন্ধু। আমার বাড়ির চারপাশে যেমন কিছু প্রতিবেশী আছেন তেমনি ওরাওতো আমার প্রতিবেশি। এখন আমি যদি দেখি যে আমার প্রতিবেশী একটা একটা করে মারা যাচ্ছে তাহলে কি আমার কষ্ট হবে না?
আমি আর কথা বাড়াই নি। বিদায় নেওয়ার আগে শুধু বললাম, এভাবে আপনি আর কতোদিন এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকবেন?
যতদিন দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে এই শরীরে শক্তি পাবো, ততদিন- বললেন তিনি।

ছবি: লেখক ও গুগল