অন্যজীবন অন্য আমি

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

খুব কম বয়সে আমার বিয়ে হয়।বিয়ে হয় না বলে বিয়ে দেন বলাই ভালো। এখন যদি দৃষ্টি রাখি সে জীবনে তবে তাকে পুতুল খেলা বলে মনে হয়।সারাজীবন যত্ন করে গান শিখিয়ে বাবা-মা হয়তো গানের পরিবারের সন্তান কে পাত্র হিসেবে পেতে চাইছিলেন। সেভাবেই তারা পেয়েও গেলেন। মোটামুটি যেমন তেমন ভাবেই অথবা বলা যায় বাবার অপারগতার জন্যই অসম্ভব সাধারণ ভাবে বিয়েটা সম্পন্ন হলো। আমি আমার স্বভাব মতই আমার জীবন, আমার স্বামী, আমার সামাজিক অবস্থান, আমার পরবর্তী অবস্থা, আমার স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থা কিছু নিয়েই বিচলিত ছিলাম না।বরং বিয়ে যখন হচ্ছেই তখন গায়ে হলুদের সাজগোজ, হাতের মেহেদীর আল্পনা, বিয়ের সাজ ইত্যাদি নিয়েই বিচলিত ছিলাম। আমার জন্য তা খুবই স্বাভাবিক।

আমি এর চেয়ে হিসেব কষা কখনোই শিখিনি।বরং তিন বাক্স কাপড়ের পুতুল গুলো নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত ছিলাম আর পড়াশোনা নিয়েও কিছুটা চিন্তিত ছিলাম।বিয়ের পর পরই পৃথিবী বদলে গেলো। বদলে গেলো আমায় ঘিরে থাকা আত্মিয়স্বজন।তাদের কি ধ্যানধারণা ছিলো জানিনা তবে জামাই তাদের পছন্দ হয়নি এ আমি বুঝে গেলাম। থোড়াই কেয়ার। জীবন যুদ্ধে নেমে গেলাম দুই বেকার স্বামী স্ত্রী। আমার স্কুলের বান্ধবী লক্ষ্মী রানী দাস কি মনে করে বললো সে আমার কাছে গান শিখবে।আমি কেঁপে উঠলাম ভয়ে।আমি কিইবা জানি আর কিইবা শিখেছি যে আরেকজন কে গান শিখাবো! যদিও এর আগেও আমাকে শেখাতে হয়েছিল খুব অল্পদিন। তা আমি ভুলেই গেছি।কিন্তু এখনকার জীবনের সব হিসাবই আলাদা।সব কিছুই আলাদা, হয়তোবা আমার পুতুলগুলোর সঙ্গেও আমার কিছুটা দুরত্ব তৈরী হয়েছে। আমার বিড়াল পুটলীর সঙ্গেও দুরত্ব তৈরী হয়েছে, সেও ম্যাও ম্যাও করে আর দুরে দুরে হাঁটে।

আমিও নিঃসংকোচে পুতুল খেলতে পারিনা! এই পয়লা আমার মনে হয় আমি বড় হয়েছি।আমার শশুড়বাড়ির মানুষের সামনে বড় বড় ভাব ধরে শাড়ি পরে ঘুরলেও ধরা পড়ে যাই।শশুর মশাই শিক্ষক মানুষ উনি জিজ্ঞাসা করেই বসেন এতো ছোট একটা মেয়ে তুমি, কোথায় বেনি দুলিয়ে কলেজে যাবে তা থুয়ে তোমার বাবা-মা বিয়ে দিলেন কেন? আমি ভাবি আমি যে এ বাড়ির বৌ হয়ে এলাম তা আমার শশুর জানতেন না? আমি না পারি জিজ্ঞাসা করতে না পারি কৌতূহল নিবারণ করতে।শাশুড়ি-মা আদরে প্রশ্রয়ে বলেন মাথার ঘোমটা সরাও আর সালোয়ার কামিজ থাকলে তাই পরো।শাড়ি সামলানো কি যা তা কথা? আমার বা আমাদের না আছে চাল, না আছে চুলা। দুই বেকার ঘুরে ঘুরে বেড়াই খাই। এই হলো জীবন। অনিশ্চিত জীবন। গুরুজনরা মনে করিয়ে দেন এটা কোন জীবন নয় পয়সা উপার্জন করতে হবে, ঘর বানাতে হবে, ঘরে বিছানা কিনতে হবে, বিছানার চাদর কিনতে হবে তোষক, বালিশ লেপ কাঁথা, ঘটি বাটি থালা চামচ! ইয়া আল্লাহ, এতো কিছু পাবো কোথায়, কিভাবে মানুষ এতো কিছু কেনে, পয়সা কোথায় পায়, আমার বা আমাদের দুজনেরই মাথায় ঢোকেনা।অতএব এই পয়সার চিন্তা বাদ, হা হা হা। গুরুজন দের চেহারায় চিন্তার ছায়া পড়ে, ভ্রুরেখা বদলে যায়, বদলে যায় তাদের আচরণ।

আমরা দুজন তা বুঝতেই পারিনা।জগৎ সংসার বলাবলি করতে থাকে এই মেয়েটির অনেক প্রতিভা ছিল কিন্তু এমন লোকের সঙ্গে বিয়ে হলো যে প্রতিভা আর বিকাশই হলোনা! আরে, প্রতিভা বিকাশ কি একদিনেই হয়? এতো তাড়াতাড়ি উপসংহার টানা কি উচিৎ? আমি সবার কটাক্ষ সবার দুশ্চিন্তা সবার উপসংহার একপাশে টেনে ফেলে রেখে পথ চলতে থাকি, গান করতে থাকি, গান শিখতে থাকি, গান শেখাতে থাকি, সংসারকে ভালবাসতে থাকি, সংসার সাজাতে থাকি, স্বপ্ন আঁকতে থাকি, স্বপ্ন সাজাতে থাকি ।যত চাওয়া পাওয়া আমি সাজাই আমার কর্মক্ষমতা কে পাশে রেখে।অবাস্তব কোন কল্পকাহিনী মনে বাসা বাঁধতে দেইনা।খুব সাধারণ ভাবেই জীবন চালাতে থাকি আমি আর তিনি।কিন্তু হঠাৎই এই নরম কোমল সাজানো পথকে মনে হয় নুড়ি পাথরের এবড়ো থেবড়ো কঠিন পথ, আমরা এতোটুকুও থামিনা।চলতেই থাকি চলতেই থাকি এই বদলে যেতে দেখা পৃথিবীর পথে এই বদলে যাওয়ায় হতবাক আমরা, কিন্তু কাউকেই বুঝতে দেইনা সে কথা। শিল্পীদের কি খালি গাইলে আর গান বানালেই চলে? তাদের ক্ষুধার্ত অবস্থাতেও হাসিমুখে থাকা শিখতে হয়, কষ্ট করতে করতে পাথর হয়েও গানের সুরে হাঁটতে হয়।তা না হলে তারা কি করে বিনোদন দেবেন অন্যকে? আমি আমার বদলে যাওয়া অন্যরকম পৃথিবীতে অন্যমানুষ হয়ে প্রবেশ করলাম অন্যরকম এক প্রতিজ্ঞা নিয়ে।

ছবি: লেখক