শুনশান পড়ে আছে ভুলে যাওয়া ষ্টেশনের মৃতদেহ

জয়দীপ রায় (কলকাতা থেকে)

জয়পুরে ফিরতে ফিরতে গাড়ির মধ্যে হঠাৎ সুরেশের কথা মনে হল। সুরেশ হল কিশনগড়ের শুভম হোটেলের স্টাফ। বছর বারো ধরে আমার কিশনগড়ে কাজের বাইরে বাকি সবকিছুর পাসওয়ার্ড। শুভম হোটেলটা একদম ষ্টেশন থেকে বেরিয়েই সামনে। প্রায় ষ্টেশনের উপরেই। কুলি লাগে না। শেষরাতে ঢোকা ট্রেন থেকে নেমে অটো খুঁজতে হয় না। লাগেজ বেশী থাকলে বা শরীর খারাপ থাকলে সুরেশ এসে দাঁড়িয়ে থাকে রাতদুপুরে। একবার ট্রেন জয়পুর ছাড়ার পরে প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হল। জানলার কাঁচে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো বাইরেটা। কিশনগড়ে ঢোকার আগে ট্রেন যেন আর পেরে উঠলো না। দাঁড়িয়ে গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝড়ের ধাক্কায় প্রায় দুলতে লাগলো। খানিকক্ষণ পর ঝড়বৃষ্টি একটু কমলে ট্রেন ছাড়লো। কিশনগড় ঢুকছে। বাইরেটা অন্ধকার। লোডশেডিং। অন্ধকারে ভুতের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে হোটেল শুভমের চারতলার ষ্টেশনমুখী খোলা বারান্দাটা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে যেরকম ট্রেন দেখা যায়, ট্রেন থেকেও বারান্দা দেখা যায়। শুধুমাত্র ষ্টেশনটাতে আলো রয়েছে। দুনিয়ার বাদবাকি অন্ধকার। ঝড় তখনও চলছে। সুরেশ যথারীতি দাঁড়িয়ে। হাত থেক লাগেজ নিয়ে নিল। আমি ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে ঢুকে গেলাম আমার যুগোত্তীর্ণ আশ্রয়ে। চারতলার বারান্দায় আমার বরাদ্দ ঘরে। চারতলায় মোট পাঁচটা ঘর। আমারটা বাদে সব কটাতেই বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। তারমানে আমি একা। এই ঝোড়ো অন্ধকার রাতে চারতলার খোলা বারান্দায় আমি একা দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি ঝাপট্ মারছে। কোণাকুনি এসে ভিজিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। বাঁদিকে মসজিদের মিনারও অন্ধকার। অন্যদিন সারারাত সবুজ আলো জ্বলে। হঠাৎ দুনিয়া কাঁপিয়ে হুইশেল মারতে মারতে সামনের রেললাইন ধরে এই ঝোড়ো ওয়েদারেও ঝড়ের মতই আলোর রেখা নিয়ে বেরিয়ে গেল মুম্বাইমুখী সুবর্ণজয়ন্তী রাজধানী এক্সপ্রেস। আমি এবার ভয় পেয়ে গেলাম। ঘরে ঢুকে গেলাম। দরজা বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু ঝড় দরজার উপরেও আছড়ে পড়তে লাগলো। যেন খুলে ভিতরে ঢুকে পড়বে। আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম। একা একা ভয় বাড়ে। একাকীত্ব বড় ভয়ের। ভয়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দীর্ঘকালীন দরজার উপর আমার সে বিশ্বাস ছিল শেষপর্যন্ত ভেঙে পড়বে না। পুরনো আশ্রয়ের পরে সে ভরসা ছিল যে একা পেলেও অন্ধকারে, পাশেই দাঁড়াবে। দরজার মচমচ্ শুনতে শুনতে, ভয় পেতে পেতে শেষপর্যন্ত ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। ষ্টেশনের বাইরে এত ঝড়বৃষ্টিতেও রং পাল্টে পাল্টে, ভাষা পাল্টে পাল্টে জ্বলতে থাকলো এলইডির কিশনগড় লেখা বোর্ডটা। একা প্রহরীর মত জেগে থাকলো সারারাত। গতবার এসে দেখি ষ্টেশনটা আর নেই। উধাও। প্ল্যাটফর্ম আর শেডের ভাঙাচোরা কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। টিকিট কাউন্টার যেখানে ছিল সেখানে খোলা ময়দান। চেকার নেই হকার নেই, যেন প্রাচীন কোনও সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। আমি মনখারাপে বসে পড়লাম। এরকমও হয়! একটা জলজ্যান্ত, গায়ের উপর এসে পড়া রেলষ্টেশনের এরকম মৃত্যুও হয়! ষ্টেশন এখন শহরের বাইরে চলে গেছে। ঝাঁ চকচকে গ্রাণাইটে মোড়া হয়ে নতুন সভ্যতার জন্ম দিচ্ছে। নতুন পানের দোকান, নতুন নতুন হোটেল নিয়ে আচ্ছে দিনের আহ্বান করছে। আর পুরনো ষ্টেশনচত্বর থ্রু ট্রেনের গতিময়তায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। কেউ থামে না আর। হুইশেল্ বাজিয়ে জানান দিয়ে চলে যায়। কোনও মানুষ নামে না। বিনা টিকিটে কেউ ধরা পড়ে না। শুনশান পড়ে থাকে ভুলে যাওয়া ষ্টেশনের মৃতদেহ। শুধু সুরেশ মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে চলে যায় ষ্টেশনের দিকে। শিয়ালদা-আজমীর লাগার সময় হয়ে গেছে। বাঙালী দাদারা তো এই ট্রেনেই আসে। আমিও এখন খুঁজে নিয়েছি নতুন আস্তানা। জমজমাট। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের ধোঁয়াওড়া আভিজাত্য। যে আভিজাত্যের কোনও খোলা বারান্দা নেই। ঝড়ের রাত নেই। মসজিদের আজান নেই, দূরে লেক নেই। পাহাড়ের মাথায় রাজপুত রাজার তৈরী কেল্লা নেই। ঘরে কাঁচের বড় জানলা আছে। কিন্তু বাইরে দেখার মত কোনও ষ্টেশন নেই।

ছবি: লেখক