ফিনল্যান্ডের বই এখন ইন্ডাস্ট্রি

সোফি ওকসানেন

ছোট্ট এক দেশ। পাহাড়, জঙ্গল, হ্রদে মোড়া। জনবসতি কম, আরও কম তার শহুরে দিনযাপন। তিন দিকে ঘিরে আছে থাকা সুইডেন, নরওয়ে, রাশিয়া আর বাল্টিক সাগরের জলপথ। নর্ডিক জীবনযাপনে দাগ কেটেছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার লালরঙা কাঠের বাড়ি কিংবা কফি-কার্ডামম বানের আড্ডা। রাশিয়া কিংবা বাল্টিক অঞ্চলের সংস্কৃতি বা রাজনীতির প্রভাবও কম নয়। ভাষা, সাহিত্য, শিল্প— ফিনল্যান্ড জুড়ে প্রভাব ফেলেছে বৈচিত্র। শতকের পর শতক পেরিয়ে এমন মিলমিশের সাক্ষী ফিনল্যান্ডের মানুষ।
নব্বইয়ের দশকের শেষে বিশ্বে সাড়া ফেললো ফিনল্যান্ডের নোকিয়া মোবাইল ফোন। দাপটে রাজত্ব করা সেই ফোনের দৌলতে বেড়ে গেলো দেশটির আয়। বাণিজ্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রইল তার ফোন রফতানি। কিন্তু এই রমরমা ব্যবসা ধাক্কা খেলো ২০০৭ সালে। প্রতিদ্বন্দ্বী একটি ব্র্যান্ডের ফোন দখল নিলো বিশ্বের বাজার। ছোট্ট দেশটার অর্থনীতি ধাক্কা খেল। এবার শুরু হলো ঘুরে দাঁড়াবার পথের খোঁজ।
এর মধ্যেই চমক। ২০০৮, ফিনিশ-এস্টোনিয়ান লেখিকা সোফি ওকসানেন-এর উপন্যাস ‘পার্জ’ সাড়া ফেলে দিলো সাহিত্যের দুনিয়ায়। সোভিয়েতের দখলে থাকা এস্টোনিয়ার দুই নারীর সংগ্রামের সেই কাহিনি যে শুধু ফিনল্যান্ডেরই পুরস্কার জিতে নিল তা-ই নয়, বিদেশেও জয় করল অজস্র খেতাব। বইয়ের লেখক একের পর এক সাহিত্য সম্মেলনে নিজের বইয়ের প্রচার চালিয়ে স্বয়ং হয়ে উঠলেন একটা ‘ব্র্যান্ড’। ৩৮টি ভাষায় তাঁর বইয়ের অনুবাদ, এবং বিপুল বাণিজ্য চোখ খুলে দিল দেশটির। শুধু ফ্রান্সেই বিক্রি হলো এক লক্ষ সত্তর হাজার কপিরও বেশি!সবাই বুঝল, পৃথিবীর পাঠকের মনের মতো হয়ে ওঠার যোগ্য হয়েছে ফিনল্যান্ডের সাহিত্য। বুঝেশুনে, সাজিয়েগুছিয়ে তুলে ধরা গেলে সাহিত্যই হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের বাজারে ফিনল্যান্ডের তুরুপের তাস। নড়েচড়ে বসলো বইপাড়া।
সেই সময়ে নর্ডিক ক্রাইম থ্রিলারের চাহিদায় ভাটার টান চলছিলো বেশ ক’বছর ধরে। নতুন কোনও ধারাকে তুলে ধরার এই তো সময়! প্রাক্তন প্রকাশক এলিনা আলবাক-এর মাথায় এল আন্তর্জাতিক সাহিত্য এজেন্সি গড়ে তোলার প্ল্যান। সাহিত্যের প্রচারকে এত কাল বাঁকা চোখে দেখে আসা দেশটাকে তিনি বুঝিয়ে ছাড়লেন প্রচারের প্রয়োজনীয়তা। বললেন, সাহিত্যই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। বইয়ের রফতানি আগামী দশ বছরে বাড়তে পারে দশ গুণ।
কাজটা সহজ ছিলো না। এলিনা ও তার দলের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠলো এজেন্সি। বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর দোরে দোরে ঘুরে প্রচার চললো। গোলাপি স্যুট আর গোলাপি বিজ়নেস কার্ডেই পরিচিত হয়ে উঠলেন এলিনা। বিশ্বের সব প্রখ্যাত বইমেলায় তিনি পরিচিত মুখ।
২০০৯-এ শুরু কর্মযজ্ঞ, আর ফ্রাঙ্কফুর্টের বিশ্বখ্যাত বইমেলায় ডাক এলো ২০১৪ সালের অতিথি দেশ হিসেবে। মাঝের পাঁচটা বছরে নিজেকে আমূল বদলে ফেললো ফিনল্যান্ডের বইপাড়া। বাণিজ্যিক চুক্তি, ফরেন রাইটস, অন্য রকম ভাবনার সাহিত্য এবং স্লোগান ‘ফিনল্যান্ড কুল’। আর তাতেই বাজিমাত!
অতিথি দেশ হিসেবে ফিনল্যান্ডের নাম শুনে যারা ভুরু কুঁচকেছিলেন, বইমেলার শেষে তাঁরাই মানতে বাধ্য হলেন— দেশটার ক্ষমতা আছে। পাঠকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল ফিনিশ সাহিত্যের স্বাদ। জার্মানি, অ্যাংলো-আমেরিকান দেশগুলো, যারা ক’বছর আগেও ছিলো ফিনল্যান্ডের বইপাড়ার ধরাছোঁয়ার বাইরে, সেখানেও হই চৈই ফেললো ফিনল্যান্ডের একের পর এক নতুন লেখকদের গল্প-উপন্যাস। ২০১৫ সালে পেঙ্গুইন ক্লাসিকস-এও ঢুকে পড়েছে ফিনিশ উপন্যাস ‘আননোন সোলজার্স’। ফিনল্যান্ডের তিন গুণ বেড়ে যাওয়া বই-রফতানির খাতায় জার্মানিকেও টেক্কা দিয়েছে অ্যাংলো-আমেরিকান দেশের চাহিদা। নর্ডিক এজেন্সি হিসেবে একমাত্র আলবাক-এর এজেন্সিরই এখন নিউ ইয়র্ক এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের অফিস খুলে বসেছে।

ছোট্ট এই দেশটার সাহিত্যের ইতিহাস অবশ্য পুরনো। দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে উনিশ শতকের শুরু অবধি ফিনল্যান্ড সুইডেনের শাসনে। সুইডিশই ছিল উচ্চবিত্ত ফিনিশদের ভাষা। তবে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা লোককথা— যার বেশির ভাগটাই পৌরাণিক বীরগাথা ছিল ফিনল্যান্ডের নিজস্ব। মালার মতো সেই ছড়া আর গান গেঁথেই অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে তৈরি হল ফিনল্যান্ডের মহাকাব্য ‘কালেভালা’।
উনিশ শতকে সুইডেনের শাসন থেকে বের হয়ে রাশিয়ার স্বশাসিত অংশ হল ছোট্ট দেশটা। সাহিত্যেও নিজস্বতা গড়ে তোলার ভাবনা জেগে উঠলো তখন থেকে। লেখার মাধ্যম যদিও সুইডিশ, জোহান লুডভিগ রুনবার্গ-এর লেখায় প্রথম জীবন্ত হয়ে উঠল ফিনল্যান্ডের প্রকৃতি আর জীবনযাপন। তার পর এলেন আরও কয়েকজন লেখক। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আলেক্সিস কিভি-র লেখায় প্রাণ পেল ফিনল্যান্ডের সাহিত্য। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, বাড়তে লাগল সাহিত্যের পরিধি। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সাহিত্যের ধাঁচে তাদের সাহিত্যে এলো বাস্তবের কথা, সমাজে মেয়েদের অবদমন আর শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশার ছবি। সমালোচিত হল চার্চের ভূমিকা।
উনিশ শতকের শেষ থেকেই সুইডিশ আর ফিনিশ ধারার ক্রমশ আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশ শতকের শুরুতেই দু’রকম ধাঁচে ভাগাভাগি হয়ে গেল ফিনল্যান্ডের সাহিত্যজগৎ। পরবর্তী কয়েক বছরে দুই ধারার লেখকদের কলমে কবিতায়, গদ্যে, নাটকে, উপকথায়, গীতিকাব্যে এল আধুনিকতার নতুন স্বাদ। তাতে ঠাঁই পেল বাস্তব সমাজের কথা, ম্যাজিক রিয়েলিজ়ম, নর্ডিক ক্রাইম থ্রিলার, ব্লগ লেখনীর আঙ্গিক, নানা ধরনের নিরীক্ষামূলক বিষয়বস্তু। ইতিমধ্যে ফ্রান্‌স এমিল সিলানপা-র হাত ধরে ফিনল্যান্ডের মুকুটে লেগেছে নতুন পালক। প্রথম বার সাহিত্যে নোবেল— ১৯৩৯ সালে।
প্রশ্ন উঠতে পারে হঠাৎ করেই কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠলো ফিনল্যান্ডের সাহিত্য? পাঠক এবং প্রকাশক, দু’দলই একবাক্যে বলছেন— এ দেশটার সাহিত্য এক্কেবারে আলাদা স্বাদের। আর সেটাই তার ইউএসপি। ঝরঝরে লেখনী আর টানটান প্লট দ্রুত পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে তাদের সাহিত্যকে। জোহানা সিনিসালো-র ‘দ্য কোর অফ দ্য সান’-এ স্বাবলম্বী নারীদের বন্ধ্যাত্বকরণ আর পায়ের নীচে শক্ত জমি না-থাকা মেয়েদের যৌনতায় ঘিরে রাখার এক নয়া ধাঁচের অবদমনের গল্প, পাজ়তিম স্তাতোভসি-র ‘মাই ক্যাট যুগোস্লাভিয়া’য় একেবারে অন্য চোখে যুগোস্লাভিয়ার পতনের কাহিনি কিংবা লরা লিন্ডস্টেট-এর ‘ওনেইরন’-এ এক অন্য জগতে সাত নারীর আলাপচারিতার মতো বিষয় মন টেনেছে সারা বিশ্বের পাঠকদের।
ফিনল্যান্ডে সাক্ষরতার হার বরাবরই বেশি, পাশাপাশি স্বাভাবিক কারণেই বেশি পাঠকও। প্রকাশক, এজেন্সির ব্যাপক উদ্যোগের পাশাপাশি এখন চলে এসেছে সরকারি সাহায্যও। লেখিকাদের আধিক্য এবং অদ্ভুত বিষয়বস্তু এখন ফিনল্যান্ডের সাহিত্য-বিপ্লবে দুই মূল অস্ত্র। বই-ই এখন দেশটির নতুন ইন্ডাস্ট্রি, নিঃসন্দেহে বলা যায়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল