গানে গানে দিনগুলি

কাকলী আহমেদ

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

আমার মায়ের আমাদের নিয়ে স্বপ্নবিলাসের কোন কমতি ছিল না। কাকরাইলের এই বাড়িতে আসার আগে ৬৭ নয়াপল্টনের বাসায় গানের মাস্টার ও তবলচী রেখে আমাদের দুই বোনকে গান শেখানো শুরু করেন। বছর দু’য়েক আমরা গান শিখেছি। গানের সেই শিক্ষকের নাম আজ আর মনে পড়ছে না। একটা গানের খাতা ছিল হলুদ রঙের। সা রে গা মা নিজ হাতে লিখে স্যার আমাদের তালিম দিতে শুরু করেন।
আলোর গলা ছিল ভীষণ ভাল। আমার গলা যেমন খারাপ, তেমনি সুর ছিল না মোটেও। শেখার আগ্রহও ছিল না একেবারে। সপ্তাহে একদিন আসতেন স্যার। মাসে তিন শত টাকার বিনিময়ে স্যার অত্যন্ত যত্ন সহকারে আমাদের গান শেখাতেন। দুই বছর শেখার পর লেখাপড়ার খরচের পাশাপাশি এই অতিরিক্ত খরচ টানা আম্মার জন্যে কষ্টকর হয়ে পড়লো। মনে আছে গানের স্যারকে বিদায় দেয়ার সময় আম্মা মনে খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। স্যারকে আসল কথা না বলে লেখাপড়ার চাপ বেড়ে যাওয়ায় এখন গান করা আর সম্ভব হচ্ছে না এমনটা বলেই বিদায় দিলেন। সময় সুযোগ করে তাঁকেই আবার রাখবেন এমন প্রতিশ্রুতিও দিলেন। আলোর গানে অপার সম্ভাবনা রয়েছে এ কথাটি প্রায়ই বলতেন স্যার। শেষ দিনও তিনি আমাদের চর্চা অব্যাহত রাখতে বললেন। গানের প্রতি নিদারুণ অনাগ্রহ থাকায় আমি যেন নিস্তার পেলাম। কিন্তু আলোর ভীষণ গান শেখার আগ্রহ ছিলো।

হারমোনিয়াম জায়গা করে নিলো খাটের নীচে। ধূলা জমতে লাগলো পরতে পরতে। মাঝে সাঝে আলো-কে আম্মা প্র‍্যাকটিস করার জোর তাগিদ দিলেও হারমোনিয়াম অযত্নে পড়েই রইল খাটের তলায়।

এ বাড়ির আশে পাশে অনেকেই গান করতো। ভোরবেলা প্রায়শই বিভিন্ন বাড়ি থেকে গলা সাধার আওয়াজ ভেসে আসতো। আম্মা সে আওয়াজ শুনে খুব মন খারাপ করে আব্বুর সঙ্গে ঝগড়ায় জড়াতেন। পড়ার খরচা চালিয়ে যেতে পারলে আলো আর আমাকে গান শেখানোর ইচ্ছেটা তাঁর পূরণ হতো। ততদিনে মুনিয়া স্কুলে ভর্তি হয়েছে। বয়সের সঙ্গে  সঙ্গে ক্লাসে উপরের দিকে উঠছি। লেখাপড়ার খরচ বাড়ছে। সংসারে সব সময় টানাটানি।

বিকেলে পিছনের বারান্দায় মাদুর পেতে আলো হারমোনিয়াম নিয়ে আবার গলা সাধা শুরু করলো। আলোর গান শুনে আশেপাশের সবাই খুব তারিফ করতো। পাশের বাড়ির এক মেয়ে এসে হারমোনিয়ামে যে কোন গান তুলে দিতে পারতো। দি রেইন ছবির সব ক’টা গান আলো এত সুন্দর গাইতো। “আয় রে মেঘ আয় রে” বলে যেই চড়ায় গলা নিয়ে টান দিতো। আমরা দুই বোন আর আশে পাশের বাড়ির মানুষ মুগ্ধ হয়ে আলোর গান শুনতাম।

এক দুপুরবেলা বাথরুমে গোসল করতে করতে আলো ভীষণ চড়া গলায় “আয় রে মেঘ আয় রে” গানটা গাইছিলো। আব্বু বাড়ির বাইরে থেকে এসে টিনের দরজায় ঘটাং ঘটাং করে কড়া নাড়ছিলো। বেশ খানিক পর আকলিমা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। আব্বুর মুখ চোখ অনেকটাই গম্ভীর। ঘরে ঢুকে চুপচাপ। আলো বাথরুম থেকে আব্বুর উপস্থিতি টের পেয়ে গান থামিয়ে দিয়েছে। তখনকার দিনে বাবা বা মায়ের আগমনে বাড়িতে এক ধরণের পট পরিবর্তন ঘটতো। অভিভাবকের মুডের উপর নির্ভর করে অনেকাংশেই বাড়ির পরিবেশ পরিবর্তিত হয়ে যেতো। মনে আছে আব্বু সেদিন আলোর এত জোরে গান গাওয়া নিয়ে অনেক বেশি বকা ঝকা করেছিলেন। কেন রাস্তা থেকে আলোর গলা শুনতে পেলেন এমন প্রসঙ্গ নিয়ে আম্মার সঙ্গেও বচসা হলো। মুসলমান মেয়ের কন্ঠস্বর এত দূর পর্যন্ত কেন গেলো সে ব্যাপারেও কিছু কথা বললেন। আব্বু প্রগতিশীল একজন মানুষ। কিন্তু সেদিনের এই আচরণে আমরা অনেক অবাক হলাম।
আম্মা যারপরনাই আলোর হয়ে ঝগড়া করলো। আলো মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। আব্বু বললো, গান গাইতে কোন মানা নেই। কিন্তু রাস্তা থেকে কেন কন্ঠস্বর  শোনা যাচ্ছিলো? বুঝতে পারলাম, দাদার রক্ষণশীল মনোভাবের কিছু অংশ ঝেড়ে দিলেন। আম্মা প্রায়ই বলতো আমার ফুপুরা খুব বেশি পর্দার মধ্যে বড় হয়েছেন। আব্বু হয়তো নিজের বোনেদের সেই নিয়মের কিছু আমাদের উপর আরোপ করতে চাইলেন, বুঝে উঠতে পারলামনা। অন্যদিকে আব্বুই তো আমাদের কাছে গান,শিল্প,সাহিত্যের কথা সদা সর্বদাই আওড়াতেন। এখন বুঝি উঠতি বয়সের মেয়ের প্রতি বাবা মায়ের এক ধরণের বাড়াবাড়ি রকমের শাসন চলে যা অনেকটাই তার কিশোরী  মনের ওপর নেতিবাচক প্রভরি ফেলে। বাবা মা কভু তা ভেবে দেখে কি?
এক সকালে খুলনা থেকে মুনীর ভাইয়া এসে হাজির। মুনীর ভাইয়া আমার আপন চাচাতো ভাই। সেটা ১৯৭৯ সালের কথা। ভাইয়া সেবার এইচ,এস,সি পরীক্ষা দিয়েছে।তখনকার দিনে রেওয়াজ ছিল, ম্যাট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর লম্বা ছুটিতে নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে এক দুই মাসের জন্যে বেড়াতে যাওয়া। আমরা তিন বোন। মুনীর ভাইয়ার আগমন আমাদের জন্যে কি যে আনন্দ বয়ে আনলো। একজন বড় ভাই সেই সঙ্গে আমাদের গল্প বলার এক মানুষ পাওয়া গেলো।
মুনীর ভাইয়া খুলনা সেন্ট জোসেফস স্কুলের ছাত্র ছিলেন। উনি খুব ভাল ছাত্র ছিলেন। আমাদের তিন বোনকে মুনীর ভাইয়া এত আনন্দে ভরিয়ে রাখলেন সে বলার না। ভূগোল লুডু কিনে আনলেন। আমরা সবাই মিলে এই লুডু খেলতাম। মুনীর ভাইয়াই আমাদের প্রথম এই লুডুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।পৃথিবীর কত দেশই না আমরা এই লুডুর মাধ্যমে ঘুরে এলাম। অত্যন্ত শিক্ষামূলক এই লুডু খেলার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন দেশ, মহাদেশ, বিখ্যাত স্থানের নামের সঙ্গে খুব অল্প সময়েই পরিচিত হতে থাকলাম। জুরিখ হাসপাতালে ভর্তি থাকলাম। মস্কোর ঘন্টা দেখলাম।

সন্ধ্যার পর তিনি স্কুলের বাড়ির কাজেও অল্প বিস্তর সাহায্য করতেন। আম্মাকে আর আমাদের নিয়ে পড়তে বসাতে হতো না। অংক না পারলে মুনীর ভাইয়া কি যে সুন্দর করে অংক বুঝিয়ে দিতেন। ইতিহাস, ভূগোল এগুলো মনে না থাকলে কি করে কিছু কৌশল প্রয়োগ করে মনে রাখতে হবে তাও শিখিয়ে দিতেন।
আমাদের শৈশবে মুনীর ভাইয়া যেন নিয়ে এলেন কলতান মুখর কিছু দিনমালা।

ছবি: গুগল