বাঙালি চিমটি – ১ম পর্ব

অনিরুদ্ধ দে

(কলকাতা থেকে): কথাটা শুনতেই কেমন অদ্ভুত লাগছে না! আমারও লেগেছিল, যখন প্রথম শুনেছিলাম। বছর তিনেক আগের কথা, প্রিজমের টিমের আমরা চারজন – নিতা ধর, কল্পনা কার্জী, এমেলদা টোপনো আর আমি বল্লালগুড়ী গ্রামে (আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারীহাট-বীরপাড়া ব্লকে টোটোপাড়া যাবার পথে একটি গ্রাম) বায়ো কম্পোষ্ট তৈরি শেখাতে গিয়েছিলাম কৃষকদের। কাজটা হচ্ছিল একজন কৃষকের গোয়াল-এর পাশের জমিতে। মূলত কল্পনা আর এমেলদা হাতে হাতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলো। মাঝে মাঝে কাজ করতে করতে ওরা পাশের যে গাছটিতে হাত দিচ্ছিল সেটা বেয়ে অজস্র কাঠপিপড়ে বা বিষপিপড়ে লাইন দিয়ে ওঠানামা করছিল। সেটা দেখেই আমি সতর্ক হয়ে গেছিলাম। ওদেরকেও সতর্ক করলাম। আর তখনই কল্পনা একবার তাকিয়ে দেখে নিয়েই বললো, “হ‍্যা দাদা, ইসকো হামলোগ বাঙালি চিমটি কহতে হ‍্যায়।” একই কথা বললেন অন‍্যরাও। আর আমি শুধু অবাক হয়ে ভাবতে শুরু করলাম কত অত‍্যাচার, নিপীড়ন সহ‍্য করলে তবেই আদিবাসী অধ‍্যুষিত এলাকার মানুষ বিষ/কাঠ পীপড়ের কামড়ের যন্ত্রণাকে মনে করে বাঙালিদের চিমটির সঙ্গে তুলনা করে ওই পিপড়ের নামকরণ করেছে। বিষয়টা আমাকে অনেকটাই অনুসন্ধিৎসু করে তুললো। যথার্থতা যাচাই করতে গিয়ে একদিকে মর্মাহত যেমন হলাম, ততটাই লজ্জিত হলাম, ডুয়ার্সের বাগান এলাকাগুলিতে আদিবাসী দের প্রতি শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে বাঙালি দের ঘৃণা, অত‍্যাচার, অমানবিক ব্যাবহার ও শোষনের প্রকার জেনে। 

আসলে এক অর্থে সাওতাল, ওরাও, মুন্ডা, খড়িয়া এই আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষদেরকে ইংরেজরা জঙ্গল পরিষ্কার করে চা বাগান গড়ে তুলতে নিয়ে এসেছিল তাদের আদি বাসস্থান ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চল। যারা এসেছিলেন তাদের অধিকাংশই পরে চা বাগানের কুলী হিসেবেই থেকে গিয়েছিলেন। বাঙালিরাও বেশিরভাগই এসেছিলেন চা বাগানের কেরানির চাকরি নিয়ে, আর অনেকেই এসেছিলেন কোনো আত্মীয়তার সূত্র ধরে চাকরির সন্ধানে। স্থানীয় বাসিন্দা যারা ছিলেন, যেমন মেচ, রাভা, রাজবংশী রা একসময় মোটামুটি তলিয়ে যেতেই বসেছিলেন। ছোটনাগপুরের আদিবাসীদের পরিচয় চা বাগান এলাকাতে ‘মদেশিয়া’ নামে। সৌজন্যে তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালি কেরানিকূল, যাদের ধারণা ছিল না যে নেপালে যে সমস্ত মানুষ মধ‍্যভাগে বসবাস করেন তারা মদেশিয় নামে পরিচিত। কিন্তু আদিবাসীরা যেহেতু হাড়িয়া খেতে অভ‍্যস্ত ছিল। যা বাঙালি বাবুরা লুকিয়ে পান করলেও মদ হিসাবেই বিবেচনা করতেন। তাই আদিবাসীরা তাদের সংস্কার বাঁচাতে গিয়ে পরিচিত হলেন মদেশিয়া নামে।

বাঙালি চিমটি কথাটা কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা বোঝাতে কিছু উদাহরণ দেব।

কথা হচ্ছিল আদিবাসী দের পরিচয় নিয়ে। কুলী হলেও তাকে তো কাগজে একটা রেকর্ড রাখার জন‍্য একটা নাম লিখতেই হবে, আর বাগানের চাকরিতে কেরানি বাবু মাত্রেই বাঙালি আর সকলেই বিশেষতঃ কোলকাতা ও তার আশপাশের দক্ষিণ বঙ্গের জেলাগুলি থেকে আগত। তারা কেউ কেউ রেজিস্ট্রেশন এর সময় প্রথম নামটা কোনোমতে জেনে পদবীটা নিজেরাই লিখে দিতেন সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা প্রভৃতি। এর প্রধান কারণ ছিল আদিবাসী দের বিষয়ে সম‍্যক জ্ঞানের অভাব, যা হয়তো খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু যেটা অস্বাভাবিক সেটা হল আদিবাসীদের জ্ঞান, বুদ্ধি, সংস্কৃতি সম্পর্কে এক অদ্ভুত রকমের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও ঘৃণার মনোভাব। আসলে যেদিন থেকে একজন।আদিবাসী বা একটি আদিবাসী পরিবার শুধু সাঁওতাল বা ওঁরাও বা মুন্ডা বলে পরিচিত হতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই তার বা তাদের পরিচয় সঙ্কটাপন্ন হয়েছে। তারা হারিয়েছে তাদের টোটেমিক নাম। যা তাদের সংস্কৃতিতে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন খুব কম পরিবারই এক্কা, মিন্জ, টোপনো, লাক্রা এই টোটেমিক নাম গুলোকে পরিবারের নাম হিসেবে ব‍্যবহার করে। এটা যে শুধু আদিবাসী দের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তা কিন্তু নয়। এর সঙ্গে জীব বৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবারও একটা নিবীড় যোগসূত্র আছে। আসলে টোটেম অর্থ আমাদের মত করে ভাবলে আদিবাসীদের গোত্রদেবতা। প্রকৃতির সন্তান বলে প্রাকৃতিক সবকিছুকে নিয়েই তাদের সংস্কৃতি। ওদের আসল ধর্ম হল অ্যানিমিসম ও অ্যানিমেটিসম। এক্কা, মিন্জ, টোপনো, লাক্রা – এগুলো কোনো জন্তু, মাছ, পাখী এইসবের নাম। যারা লাক্রা, বাঘ হল তাদের গোত্রদেবতা। যারা এক্কা তাদের গোত্রদেবতা হল কচ্ছপ‌। তাই সেই বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের নিজের গোত্রদেবতাকে কখনও শিকার করে না (এখন অবশ‍্যই সরকারি নিয়মে অনেক রকম জন্তু-জানোয়ার শিকার নিষিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু আদিবাসীরা এই নিয়ম তৈরী করেছিল অনেক অনেক যুগ আগেই, বাস্তুসংস্থান তন্ত্র বজায় রাখার তাগিদেই)। শিক্ষার আলোকে আলোকিত না হয়েও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে কি সুন্দর কৌশল তারা গ্রহণ করেছিল। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব আমরা এখনো লক্ষ্য করি। গ্রীণ স্কাউটের সদস‍্যদের নাম লিখতে গিয়ে দেখি বেশিরভাগই নামের শেষে মূল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নামই ব‍্যাবহার করছে। প্রিজম-এর গ্রীণ স্কাউট কো-অর্ডিনেটর শর্মিলাও নিজের নামের শেষে ওঁরাও লেখে। দেখে একদিন বকা দিলাম, কিন্তু ওর তো করার কিছুই ছিল না, স্কুলে ভর্তির সময় টিচার যা লিখেছেন সেটাই ওকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। ও ওদের গোত্রদেবতার ‘লাক্রা’ নাম প্রায় ভুলতেই বসেছে।

দীর্ঘদিন ধরে ডুয়ার্সের চা বাগান গুলোতে ঘোরাঘুরি করছি, বেশিরভাগটাই আদিবাসী অধ‍্যুষিত এলাকায়, কিন্তু লক্ষ্য করেছি অনেক রকম গাছপালা থাকলেও ‘করঞ্জ’ গাছের সংখ‍্যা খুবই কম। দুটো একটা এখানে সেখানে থাকলেও আদিবাসী বাচ্চারা এমনকি যুবক/যুবতি ও মধ‍্যবয়সীরাও সেগুলো চেনেন না। অথচ এই করঞ্জ গাছ তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হিন্দুদের যেমন ধূতরা ফুল না হলে শিব পূজা হয়না, আদিবাসীদের তেমনি করঞ্জ ছাড়া করম পরব হয় না। বেশ কয়েক বছর আগে উড়িষ‍্যার গঞ্জাম জেলায় গিয়েছিলাম প্ল্যান ইন্টারন‍্যাশনাল (ইন্ডিয়া) র ম‍্যালেরিয়া নির্মূলিকরণ প্রোজেক্টের মূল‍্যায়ন করার কাজে। সেখানে আদিবাসীদের কাছে শিখেছিলাম করঞ্জ তেল গায়ে মাখা, স্প্রে করা ও প্রদীপ জ্বেলে ধোঁয়া দিলে মশার হাত থেকে কতটা নিস্তার পাওয়া যায়, যেমন নীম তেলের ক্ষেত্রে হয়। তাছাড়া করঞ্জ তেল জমিতে স্প্রে করলে জৈব কীটরোধকের কাজ করে। এই কথাগুলো বলার একটা বড় কারণ হল, এর সবটাই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস-এর সঙ্গে যুক্ত। যারা নিজেদেরকেই চেনে না, যাদের ঘর বলতে চা কোম্পানির দেওয়া বাগানের কুলী লাইনের এক চিলতে কুঠুরি, পেশা বলতে একসময় ছিল পাতা তোলা আর বাগানের অন‍্যান‍্য কাজ তারা করঞ্জ গাছ চিনবে বা নিজেদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখবে সেই আশাই বা করি কি করে। এতগুলো বছরে অনেক গবেষণা হয়েছে চা বাগানের আদিবাসীদের নিয়ে, গবেষকদের বেশিরভাগই অনেক উচ্চপদে আসীন হয়েছেন, কিন্তু সমস্যা বেড়েছে ছাড়া কমেনি একটুও। যদিও ছোট ছোট সমাধান করা যেত। একটা ছোট্ট প্রচেষ্টা প্রিজম শুরু করেছে। গ্রীণ স্কাউটের আদিবাসী বাচ্চাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল প্রায় তিন হাজার করঞ্জ বীজ, সেগুলো সবার বাড়িতে লাগানো হয়েছে, আর সেই সঙ্গে আলোচনা চলছে করঞ্জ গাছকে ঘিরে আদিবাসী সংস্কৃতি ও তাদের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিভাবে তার ব‍্যাবহার সম্ভব সেই বিষয়ে। ফল পেতে হয়তো সময় লাগবে কয়েক বছর।

তবে নিপীড়নের একটা দিককে আবার নৃবিজ্ঞান-এর পরিভাষায় ‘ট্রাইবালাইজেশন’ বলে গরিমান্বিত করার একটা চেষ্টা করা হয়। আমার দৃষ্টিতে যা একটি অপচেষ্টা মাত্র। কারণ বাঙালি কেরানিকূল এদেরকে ঘৃনা করলেও এদের ভাষাটা অনেকেই রপ্ত করেছেন। আসলে এই বিষয়টা ভালোভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করে যা বুঝলাম, আদিবাসীদের ভাষা আয়ত্ত করাটা আরও ভালোভাবে শোষণ করার জন্য প্রয়োজন ছিল। কুলী হিসেবে বাগানে কাজ করলেও ওদের বাগানের রেশন, বাড়ি, স্বাস্থ‍্য পরিষেবা, হপ্তা (সপ্তাহান্তিক মাইনে), প্রভিডেন্ট ফান্ড এগুলো পাওনা ছিল, আর বাঙালি কেরানিবাবুদের উপরি আয়ের উৎস ছিল আদিবাসী মজুরদের ঠকিয়ে তাদের টাকা আত্মসাৎ করা, ভাষা জানা থাকলে যে কাজটা করা অনেক সহজ হয়। তাই শুধুমাত্র বাঙালিরাই নয়, মাড়োয়াড়ি, নেপালী, বিহারী সবাই আদিবাসী ভাষায় যথেষ্ট সড়গড়। কিন্তু মজা হল সবাই যেটাকে আদিবাসী ভাষা বলে তার নাম যে ‘সাদ্রী’ তা এমনকি অনেক আদিবাসী ছেলেমেয়ে বা বয়স্ক লোকজনও জানে না। অন‍্যদিকে আজকের প্রজন্মের ওঁরাও রা নিজেদের কুরুক ভাষা, সাঁওতাল ও।মুন্ডারা তাদের নিজের নিজের ভাষাই ভুলে গেছে। সাদ্রী আসলে আমাদের হিন্দি ভাষার মতো। যখন একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর লোক অপর একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকের সঙ্গে কথা বলে তখন তারা সাদ্রী ভাষা ব‍্যাবহার করে। আরও একটা বিষয় আছে, তা হল আদিবাসী নাচ। এটা অনেক উদারমনা আদিবাসী মাত্রেরই যেন রক্তে মিশে আছে। সঙ্গীত ও সুর আদিবাসী মাত্রেরই শরীরকে আন্দোলিত করে। বাঙালি বাবুরা সেই নাচে যোগ দিয়ে আদিবাসী রমনীর শরীরের উষ্ণতা উপভোগ করে। (চলবে)

ছবি : লেখক