ই-সিম (e-SIM) কি

সাইফ তনয় (টেক ব্লগার)

SIM এর পুরো বিস্তারণ Subscriber Identity Module বা বাংলায় একে গ্রাহক পরিচিতি মডিউল বলা যেতে পারে। এটি মূলত চিপ সম্বলিত একটি কার্ড, যা একজন মোবাইল গ্রাহককে কোনো মোবাইল সেবা প্রদানকারী নেটয়ার্ক এ সংযুক্ত করে। অর্থাৎ, একজন গ্রাহক কোন মোবাইল সেবা প্রদানকারী নেটয়ার্ক এ সংযুক্ত হতে পারবে বা হবে তা নির্ধারনের জন্য সীম কার্ডটি একটি পরিচিতি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সীম ছাড়া কোনো মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটি বোঝা সম্ভব নয় যে, ওই গ্রাহকটি সেই প্রতিষ্ঠানের সেবা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত কিনা। বিগত প্রায় ২৭ বছর ধরে এই প্রযুক্তি একটি চিপ সম্বলিত ফিজিক্যাল কার্ডের মাধ্যমে কঞ্জিউমার ওয়ার্ল্ডে প্রচলিত যেটাকে আমরা আমাদের মোবাইল ফোন/ সেলুলার ডিভাইসে প্রবেশ করিয়ে নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত হয়ে আসছি। প্রায় এই তিন যুগে প্রযুক্তি বিশ্ব অনেক সামনে এগিয়েছে, বলা যায় এই পরিবর্তন সিম কার্ডেও হয়েছে কিছুটা। সেই ১৯৯১ সালে যে সিম কার্ড মোবাইলে প্রবেশ করতে হত সেটার সাইজ ছিল বর্তমান সময়ের একটা ক্রেডিট কার্ডের সমান। তারপর থেকে সিম কার্ডের এই আকার অনেকাংশে কমেছে- মিনি সিম, মাইক্রো সিম, আর এখন ন্যানো সিম। কিন্তু এত আকৃতির পরিবর্তনের পরেও, এটা এখনও সেই চিপ সম্বলিত একটা কার্ড, মানে আসল প্রযুক্তি রয়ে গেছে সেই ২৭ বছর পেছনেই।

প্রযুক্তিবিদরা এখন এই সীম কার্ড প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছেন। তারা তৈরী করেছেন এমন একটি প্রযুক্তি যাতে মোবাইলফোনে সীম কার্ড সংযোজন করার প্রয়োজন না পড়ে। eSIM এর e-এর মানে হল Embedded. আগে এটাকে eSIM না বলে eUICC বলা হত (embedded Universal Integrated Circuit Card)। এটা আকারে অনেক ছোট, দৈর্ঘ্যে আর প্রস্থে মাত্র ৫মিমি করে। এটা আর কোন কার্ড না, বরং একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সিম সার্কিট যেটাকে ম্যানুফ্যাকচারের সময়ই ডিভাইসের মাদারবোর্ড বসিয়ে দেওয়া হয়, পরবর্তিতে যেটা যেকোন সিমকার্ডের মতই কাজ করবে। এটার মেশিন-টু-মেশিন আর রিমোট প্রভিশনিং ক্ষমতা আছে যা ফোন ম্যানেজমেন্ট, সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিফিকেশন, অথেন্টিকেটিং ইত্যাদিতে আরও উন্নত কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স নিশ্চিত করে। কারণ ইসিমের কল্যানে আমরা আমাদের ফোন সেটিংসের মধ্যে থেকেই আমাদের পছন্দের অপারেটর, তাদের প্ল্যান, ট্যারিফ ইত্যাদি সিলেক্ট করতে পারব। কোন সিম কার্ড কেনা, বদল করার ঝামেলা নেই। সাধারণ সিম কার্ডে যেমন কোন অপারেটরের স্পেসিফিক ইনফর্মেশন সংরক্ষিত থাকে সেভাবেই ইসিমে সব সংরক্ষিত থাকবে কিন্তু যেহেতু এটা বদল করা যাবেনা তাই এই সিমের সকল তথ্য অপারেটর কর্তৃক রি-রাইটেবল হবে। OTA এর মাধ্যমেই সকল অপারেটরের সকল তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।

সম্প্রতি কিছুদিনের আগে গুগল আর অ্যাপল ইসিম (eSIM) কে বিশ্ববাসীর সামনে অনেকটা নতুন করেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, তাদের লেটেস্ট কিছু ডিভাইসের মাধ্যমে ( গুগগুলের পিক্সেল ২ আইফোন এক্স, এক্স এস, এক্স ম্যাক্স আর অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ৩, ৪ সেলুলার)। কিছুদিন আগেই তিনটি নতুন সেট (iPhone XS, XS Max, XR ) লঞ্চ করেছে অ্যাপেল৷ যেখানে গ্রাহকরা প্রথমবার পাবেন ডুয়েল সিমের সুবিধা৷ তবে, বাজার চলতি অন্যান্য ফোনের ডয়েলসিমের মতো হবে না অ্যাপেলের এই ডুয়েল সিম পরিষেবা৷ আইফোনগুলির দ্বিতীয় সিমটি থাকছে একটি ডিজিটাল সিম বা ইসিম৷ দুটি সিমের দুটি আলাদা নম্বর থাকবে৷ যেখানে ইউজার দুটি সম্পূর্ণ আলাদা কানেকশেন পাবেন৷

ইসিম-এর কনসেপ্ট অনেকদিন আগে থেকেই প্রযুক্তি বিশ্বে ভেসে বেড়ালেও অনেকেই এটা সম্পর্কে সঠিকভাবে ডিটেইলে কিছু জানতেন না, আর এখন পৃথীবির দুই শীর্ষস্থানীয় টেক জায়ান্ট যখন এই প্রযুক্তি ফাইনালি তাদের ডিভাইসে ইমপ্লিমেন্ট করেছে তো বলা যায় এখন সময় এসেছে ইসিম এর ব্যাপারে আরও একটু বিস্তারিতভাবে জানার। প্রযুক্তিবিশ্বে সকল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটা অন্যতম লক্ষ্য থাকে যেটা হল কিভাবে আরও আকারে ছোট, পাতলা আর হালকা ডিভাইস তৈরি করা যায় যেটা আবার ফিচার, কনফিগারেশন, ডিজাইনের দিক দিয়ে প্রিমিয়াম আর ফ্ল্যাগশিপ গ্রেড হবে। এই লক্ষ্য উদ্ধারের জন্যই স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে এতকিছু সম্ভব হয়েছে এত তারাতারি, তৈরি করা হচ্ছে বেটার অলটারনেটিভ অপশন। যেমন আমাদের সবার প্রিয় হেডফোন জ্যাকও গায়েব হয়ে যাচ্ছে দিন দিন (যদিও আমি এটার পক্ষে, কারণ আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, এই পথে প্রযুক্তির বদলটা স্বাভাবিক)। ধারণা করা হচ্ছে ইসিমের ব্যাপ্তি সকল কানেক্টেড ডিভাইসে হবে। যেহেতু এটা একটা বিল্ট ইন সার্কিট, কোন খোলা-লাগানোর ঝামেলা নাই সেহেতু এই প্রযুক্তি শুধু ফোনে নয়, খুব সহজেই স্মার্ট হোম, অটোমোবাইল, ল্যাপটপ, ঘড়ি, ইত্যাদি সকল ডিভাইসে ব্যবহার করা যাবে। যদিও বর্তমানে পরিধেয় ডিভাইসগুলো সচেয়ে বেশি লাভবান হবে এই প্রযুক্তি থেকে কিন্তু শিঘ্রই এটা বিস্তার লাভ করবে আমাদের অন্য সব ডিভাইসেও। ল্যাপটপ/কম্পিউটার ইউজারদের সাথে সাথে অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো/ইউজার লাভবান হবে ইসিমের মাধ্যমে সহজে তাদের গাড়িগুলোকে সেলুলার নেটওয়ার্কে কানেক্ট করে। ধারণা করা হচ্ছে যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কানেকটেড ডিভাইস ক্যাটাগরিতে ‘Internet of Things’ ডিভাইসগুলো সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে, মোবাইলফোনের থেকেও। এই অগ্রগতিতে ইসিমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

ইসিমের ব্যাপারটা অনেকটা মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটির মত মনে হতে পারে। আসলেই অনেকটা সেরকম হলেও ফিজিক্যালি আর সার্বজনীনতার দিক দিয়ে ইসিম আলাদা। MNP তে সিম কার্ড ব্যবহার করা হয়, শুধু এক কার্ডে থেকে দেশের অন্য অপারেটরে সুইচ করা যায়। কিন্তু ইসিম কোন কার্ড না আর এটা শুধু কোন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা। যেমন আপনি অন্য দেশে গেলে আপনার ফোন অটোমেটিক বুঝবে যে আপনি কোথায়, কোন দেশে, আপনার ফোনই তখন সেই স্থানের এভেইলেবল নেটওয়ার্ক আর তাদের প্ল্যান শো করবে, আপনি আপনার পছন্দ মত অপারেটর সিলেক্ট করবেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই যদি ধরা যায়- দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইউজার গ্রামীনফোন আর বাংলালিঙ্ক এর। কিন্তু দেশেই এমন অনেক যায়গা আছে যেখানে সকল অপারেটরের নেটওয়ার্ক নেই। দেখা যাচ্ছে শুধু রবি বা টেলিটক হয়তো আছে। এমন অবস্থায় আপনি আগে থেকে ব্যাপারটা না জানলেও আপনার ফোন নিজে থেকেই সব জানিয়ে দেবে আপনাকে। কষ্ট করে সিম নিয়ে বেরানো বা বদল করার আর কোন ঝামেলা থাকবেনা।

আমাদের জানা মতে বাংলাদেশে এখনো কোন অপারেটরা ইসিম পরিষেবাটি সূচনা করে নাই। ইসিমই হল ভবিষ্যত৷ এমনটাই মনে একছেন ইউজারদের একাংশ৷ তাই এখন বিনা ঝঞ্ঝাটেই কানেকশন বদলাতে পারবেন ব্যবহারকারীরা৷ তবে, আইফোনে ইসিম পরিষেবাটির জন্য মার্কিনি সংস্থাটিকে যুক্ত হতে হবে।

ছবিঃ গুগল