দ্বিধান্বিত আমি!

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

 এই যে প্রাণের বাংলায় লিখে যাচ্ছি তাতে শুধু আমার বড় হওয়ার বা বেড়ে ওঠার গল্প।আমি যদি আমার প্রাপ্তির গল্প বলি তাহলে তা অহংকারের মত শোনাবে।তারপর ও আমি ছোট করে বলতেই পারি পাঠককে। কারণ আমার লেখার পাঠক আসলে আমার গানের সম্মানিত শ্রোতা। তাদের কাছে আমি কখনোই কিছু লুকাইনা বা কিছু কথা উহ্য যেহেতু রাখিনা সেখানে আমার আনন্দের গল্প গুলোও অনায়াসে বলা যায় কি বলেন পাঠক? আমার সংগীত জীবনকে যদি দুই ভাগে ভাগ করি তো পয়লা ভাগেও আমার প্রাপ্তি বিশাল।

সব্যসাচি আমার বাবা

আমার প্রথম প্রাপ্তি আমার বাবার মত সব্যসাচী একজন বাবা এবং মায়ের মত একজন কাটাকম্পাস মানুষ কে মা করে পাওয়া! এ আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আলহামদুলিল্লাহ। আমার ওস্তাদ’জী বাংলাদেশের প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী এবং ওস্তাদ জনাব বশীর আহমেদ সাহেবের ছাত্রী হতে পারা।উনি আমাকে গান নয় বরং জীবন শিখিয়েছেন।শিখিয়েছেন গানের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক এবং জীবনের সঙ্গে গানের সম্পর্ক এবং জীবন আর সংগীত এর সমান্তরাল হাঁটাহাঁটি! এর পরের প্রাপ্তি আমার মাদারটেক এর দক্ষিনগাঁওয়ের জীবনযাত্রা।এখানকার শৈশব আমাকে আবেগী অথচ বাস্তববাদী হতে সহায়তা করেছে।আমার স্কুলের বন্ধুরাও আমাকে সৎ হতে সাহায্য করেছে।এ ছাড়াও আমাদের তৎকালিন সামাজিক জীবন যেমন খেলাঘর, চাঁদেরহাট, মুকুলফৌজ, পেন পলস ক্লাব, রেডিও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও আমাদের শৈশব কে মুল্যায়ন করে আমাদের মানসিক ভাবে সম্বৃদ্ধ হতে সহায়তা করেছে। শিশুশিল্পী হিসেবে অনেক বড় বড় কবি, গীতিকবি, সুরকার, ওস্তাদের গান আমি গেয়েছি এবং নতুন কুড়ি, কলকাকলি, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা তে অনেক পুরস্কার পেয়েছি।বলা যায় শুধুই প্রথম হয়েছি।

স্মৃতি

বাবার অফিস ওয়াপদার বাৎসরিক প্রতিযোগিতা তে ধারাবাহিক ভাবেই প্রতি বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।অনেক পুরস্কার এনেছি, বাবা মা স্কুল ও সমগ্র এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছি।যত এগুলো বেড়েছে ততোই মা-বাবার চাপানউতর বেড়েছে। বাবা পড়ার টেবিলের সামনে সেঁটে দিয়েছেন “অহংকার পতনের মূল “লেখা।সেই লেখা যতই অপছন্দ হোক তা সামনে নিয়েই পড়তে বসতে হয়েছে। সেই আমার যখন বিয়ে হলো জীবন কেমন ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছিলো। আমি আমার বাস্তব জীবনের সঙ্গে আমার চিন্তার সময় বাড়িয়ে নিলাম। মানসিক ভাবে সাহায্যের জন্য তেমন কাউকে পাচ্ছিলাম না।

স্মৃতি

আমার কষ্ট কাউকে বলছিলাম ও না।জীবন গুনতে, জীবন বুঝতে জীবন গোছাতে , জীবন বুনতে, জীবন গাঁথতে আমি আরেকজন কে সঙ্গে পেলাম ।তাকে আমি কখনোই আগে দেখিনি, আগে চিনতাম ও না, কখনোই তার সঙ্গে আমার সন্ধি হয়নি, সে মানুষটি হলো আমার দ্বিখন্ডিত ‘আমি’ ।আমার সঙ্গেই সে বেড়ে উঠেছে, কিন্তু তাকে আমি কখনোই দেখিনি।অবুঝ কিশোরী আমার মাঝে যে এক ধ্যানমগ্ন ‘আমি’ আছি তাকে সঙ্গে নিয়েই এই দ্বিধান্বিত আমার পথচলা শুরু হল।শুরু হলো এতদিন সব কিছুকে জয় করে আসা একটি মানু‌ষের দ্বিধান্বিত জীবন। বারবার দ্বিধান্বিত এ জন্য বলছি যে কোন পথে কিভাবে এগোবো এ যেন বলে দেয়ার মানুষ আমার সামনে নাই।দূরদর্শী বাবা আমার, তিনি ও কেমন অন্য ধ্যানে মগ্ন।যেন এমন এক ভাবনা বা বক্তব্য যে, যা শিখিয়েছি তা দিয়েই পথ চলো, আমার আর কিছু শেখানোর নেই! আমি, দ্বিধান্বিত আমি পথ চলা শুরু করলাম।

ছবি: লেখক