বাঙালি চিমটি (২য় পর্ব)

অনিরুদ্ধ দে

(কলকাতা থেকে): নীতা ধর সেই লড়াকু মেয়ের নাম, বাড়ি আলিপুরদুয়ার জেলার কালচিনী ব্লকের হ‍্যামিলটনগঞ্জে। বাবার ছিলো বড় সাইকেলের ব‍্যাবসা। সবার ছোট নীতা ছোটবেলা থেকেই বাবার প্রশ্রয়ে বেশ ডাকাবুকো-ডানপিটে প্রকৃতির। মাথা ভালো থাকলেও পড়াশোনার কাজে যতটা না ব্যবহার হয়েছে, তার থেকে বেশি ব্যবহার হয়েছে খেলাধুলা, সাইকেল-মোটর সাইকেল চালানো, সাইকেল সারানো, নাটক করা, সমাজসেবার কাজে। ছোটবেলা থেকেই নীতার মধ‍্যে অন‍্যায় কিছু হতে দেখলে প্রতিবাদ করাটা মোটামুটি রুটিন কাজ। তবে খুব কাছ থেকে দেখেছি বলে জোর দিয়ে বলতে পারি নীতার প্রখর বুদ্ধি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ওকে অতি বড় সমস‍্যাতেও বিচলিত হবার পরিবর্তে ঠান্ডা মাথায় সমাধান খুঁজে বার করতে সাহায্য করেছে। নীতা ২০১৮ সালে কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (CII) ফেলো ও সারা ভারতের মধ‍্যে একজন ব‍্যাতিক্রমী মহিলা হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে।

আমার লেখা আগের পর্বটি নীতা জানালো যে ও খুব মন দিয়েই পড়েছে আর ভেবে রেখেছিল সময় পেলেই আদিবাসীদের উপর নির্যাতনের বিষয়ে আরও অনেক না জানা কথা আমাকে জানাবে।

নীতাই বলছিল যখন ও চা বাগানের মহিলাদের সঙ্গে কাজ করতে যেত সেই ‘৯৪-‘৯৫ সালেই ও প্রথম লক্ষ্য করে এলাকার কিছু যুবক খুব উৎসাহ নিয়ে যেসব আদিবাসী কুলী-কামিনদের রিটায়ারমেন্ট আসন্ন তাদেরকে জানাতো “তয় এক মাহিনা বাদমে রিটায়ার হ’বে, এ কাকা তর তো দিন পহুচ গেলাক।” নীতা তাতেই ভেবে নিয়েছিল যে ওরা তো বেশ মহৎ কাজই করছে। তাও জানতে চেয়েছিল কেন করছে ওরা ঐ কাজ। জবাবে জেনেছিল “ইমান কুন ও নি জানেল, পড়াই-লিখাই না খে। উকর চলতে হামরে মান সব কুছ কর দেওথো।”

খটকা লেগেছিল বেশ অনেক দিন পরে যখন একজন আদিবাসী রমণী নীতাকে জানায় “দেখ দিদি ময় শুনলো মোর পাঁচ লাখ রূপীয়া ভেটেল, ময় একো পয়সা নি পালো।” নীতার কথায় তখনই ও একটু নড়ে বসলো। যেহেতু টাকাপয়সার লেনদেন গ্রামীণ ব‍্যাঙ্কে হতো, ও চলে গেলো একদিন কালচিনী শাখায় ব‍্যাপারটা জানার জন‍্য। রহস‍্যের জাল খুললো যখন জানলো আগের দেখা সেইসব অতি উৎসাহী যুবকরা প্রায় ঐ আসন্ন অবসর গ্রহণ করতে চলা আদিবাসী কুলী-কামীনদের বাড়িতে গিয়ে মাসখানেক বা কখনও মাস দুয়েক আগে থেকেই ওদেরকে মুদি দোকানের জিনিস কেনা, মদ খাওয়া, ঘরবাড়ি সারানো, প্রভৃতি কাজের জন‍্য উপযাচক হয়েই ধার দিয়ে রাখে। যারা ধারে জিনিষ দিলেন তাদের তাদের খাতায় ধারের অঙ্ক লেখা থাকে, ১০ এর জায়গায় ২০ বা ৩০ বা আরও কিছু। আর অবসর গ্রহণের ঠিক আগের দিনগুলোতে সব পাওনাদার প্রায় একসঙ্গেই হামলে পড়ে। তখন আবার সেই পাওনাদারদের মধ্যেই কোনও একজন এগিয়ে আসে তাকে ব়াঁচাতে এই বলে যে “তয় তো ইতনা ধার-ঋণ হোই গেলে, ক‍্যায়সান পয়সাকে শোধ করবে।” এইভাবেই তার উপরে চাপের সৃষ্টি করে। প্রায় বাধ্য করে বোঝাতে যে পি.এফ. এর বইতে যে টাকাটা থাকে সেটা দিয়েই ধার শোধ করা যাবে।

কথার কথা যদি ৫০,০০০ টাকা ধার হয়ে থাকে তখন সেই উপযাচক উপকারী ব‍্যাক্তিটি বলে, “৫০,০০০ রূপইয়া উধার বয়েন গেলাক ত’র, তয় পি.এফ. মে এক লাখ রূপইয়া পাবে, লেকিন পতা না খে পইসা কব মিলী। ময় ৭০,০০০ দে দেওনা, তয় ৫০,০০০ শোধ দে দেবে, ত’র ২০,০০০ রূপইয়া বাচি। দেখ চিন্তা কর তয় মোকে পি.এফ. কা কিতাব বিক্রি করবে?” বারবার এভাবেই চাপ সৃষ্টি করা হতো। আসলে অতি উৎসাহী ঐ যুবকদের দলটাই ভিতর থেকে টাকার পরিমাণ, অবস‍রের তারিখ সব জেনে পি.এফ. লুঠের এক চক্রান্ত পাকিয়ে তুলতো। পাওনাদারেরা ছিল চক্রান্তের অংশ। একসময় বাধ‍্য হয়েই অবসর নিতে যাওয়া আদিবাসী কুলী-কামিনরা কোর্ট পেপারে লিখে দিয়ে তাদের পি.এফ. বই ৭০,০০০ টাকা দিতে এগিয়ে আসার মত ব‍্যাক্তিদের হাতে তুলে দিতো। পি.এফ. -এর টাকা যখন sanction হতো তখন ঐ যুবকেরা সব প্রাপকদের অত‍্যন্ত যত্নের সঙ্গে, গাড়িতে বসিয়ে ব‍্যাঙ্কে নিয়ে যেত। সই-সাবুদ করে টাকা তোলার পর তাদেরক চা-মিষ্টি খাইয়ে, আরও হয়ত দু-এক হাজার টাকা হাতে দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হতো। নীতা আসলে ঐ মহিলার কথা শুনে ব‍্যাঙ্কে গিয়েছিল ম‍্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে ব‍্যাপারটা জানতে। আর তখনই ওর কাছে আগের দেখা অতি উৎসাহী যুবকদের আসল চেহারা প্রকাশ পায়। ব‍্যাঙ্কে গিয়ে দেখলো ৮জন সদ‍্য অবসরপ্রাপ্ত আদিবাসী আর তাদের সঙ্গে ঐ যুবকেরা।

আদিবাসীদেরকে জিজ্ঞাসা করে নীতা জানলো তারা সবাই পি.এফ.-এর টাকা তুলতে এসেছেন। নীতা প্রশ্ন করেছিল “ইমান যে তোহরেমানকে সহায়তা করথে, ইমানকে পয়সা দেওয়েক নি পড়ি?” জবাবে ওরা জানায়, “হামরে মানকে পয়সা উমান পহলেই দেই দেলাক, আভি পয়সা উঠাইকে উমানকে দেই দেবু।” সবটা জানার পর নীতা ওদের বোঝাতে চেষ্টা করে তোমাকে নাহয় ৭০,০০০ দিয়ে দিল, কিন্তু বাকী ৩০,০০০ টাকা? কিন্তু তখনও ওদের মনে বিশ্বাস ছিল যে তাদের খারাপ সময়ে ঐ যুবকেরাই সাহায্য করেছে। এতসব আলোচনা চলতে চলতেই নীতা ঐ যুবকদের চলে যাওয়া লক্ষ্য করে। নীতার মনে হয়েছিল ব‍্যাঙ্ক কর্মীরাও ঐ চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত। সেদিন কিন্তু আর কোনও পি.এফ. তোলা হয়নি। পরদিন নীতা আবার ব‍্যাঙ্কে গিয়ে দেখে আগের দিনের ৮ জনের সঙ্গে আরও ১০ জন মিলে মোট ১৮ জন অবসরপ্রাপ্ত আদিবাসী ব‍্যাঙ্কে বসা, আর তাদের সাহায্য করতে আসা যুবকেরা। নীতা সোজা ম‍্যানেজারের ঘরে গিয়ে আপত্তি জানায় এই বলে যে সবাইকে প্রাপ‍্য টাকা তাদের হাতেই দিতে হবে। কিন্তু বিরোধ বাধে যাদের জন‍্য লড়াই তাদের সঙ্গেই। তারপরও ব‍্যাঙ্ক ম‍্যানেজার যদিওবা শেষ পর্যন্ত নীতার দাবির কাছে নতিস্বীকার করে সিষ্টেমে পরিবর্তন আনলেন কিন্তু টাকা আদায়ের কারবারটা হলো ব‍্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে। শেষপর্যন্ত নীতাকে ঐ অবসরপ্রাপ্ত লোকগুলোই বোঝাল যে “নি দিদি বুরা সময়মে উমান দেখলাক, তু নি জানোথিস, কিতনা বুরা সময়মে উমান দেখলায়, পয়সা দেলায়, তো তানিকুন পয়সা লেকবে হ’লে কা হুই?”

ছবি : গুগল