শাশুড়ি মা

শর্মিষ্ঠা চৌধুরী

(আগরতলা,পশ্চিম ত্রিপুরা থেকে): কি হলো কুমুদ মনটা এতো খারাপ কেন! অমন সুন্দর মুকখান এতো হাঁড়ির মতো কেন! … নিবারন একথা বলতে না বলতেই কুমুদ মানে কুমুদিনী এক ঝটকা মেরে বিছানা থেকে নেমে স্বামী নিবারণ সান্যালের সামনে কোমরে হাত দিয়ে একটা বিশেষ ভঙ্গিমা করে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বললো…বলি এভাবে আর কদ্দিন হ্যাঁ? আজও আমি ওই সব খেতে পারিনি বুঝলে!! বলে এইবার কান্না জুড়ে দিলো। নিবারণ শশব্যস্ত হয়ে পড়ল বৌকে সামাল দিতে। এই হয়েছে নিবারণের এক জ্বালা। জায়গা, সম্পত্তি ভাই বোনের সঙ্গে ভাগ বাটোয়ারা হয়ে মা নেওটা নিবারণ মাকে আর ভাগ করতে দিলো না। নিজের কাছেই রেখে দিলো। কিন্তু মায়ের আর বৌ এর খাবারের ধরনটা একরকম নয়। তাই রোজ এই নিয়ে খটকা-বিবাদ লেগেই আছে সংসারে। নিবারণের হয়েছে এক জ্বালা, বৌ সামলাবে না মা। নিবারণের অবশ্য কোন ধরনের খাবার দাবারেই আপত্তি নেই। কিছু একটা পেলেই হলো। নিবারণের মা সৌদামিনী আবার বয়সকালে যেমন চোপা তেমনি খোঁপায় ছিলেন। এখন বয়েস পড়ে এলেও চোপাখান ঠিক ধরে রেখেছেন। এই সংসারের যাবতীয় রান্নাবাড়া সব নিজেই এখোনো তদারকি করেন একটা চেয়ারে বসে বসে। হেঁসেলে ঠিক সেটাই রান্না হয় যেটা সৌদামিনী খেতে পছন্দ করেন। মাছ শুঁটকির নেওটা সৌদামিনীর আবার পাতে বেশি বড় মাছ চলে না। উনার পছন্দের পদ হলো উচ্ছের বডি, ছোট মাছের তরতরা, কুমরোর আগা ডগা দিয়ে শুঁটকি, সিমবিচি ভেজে , শুকনো লংকা শিল নোরায় বেটে, মাখো মাখো ঝাল ঝাল করে নামাতে হবে। আর শেষ পাতে দুধ কলা ভাত নয়তো আম দুধ।

বিধবা হবার পরে উনি মাংস ডিম পেঁয়াজ রসুন ছাড়ান দিলেও মাছ আর শুঁটকি ছাড়তে পারেননি। সৌদামিনীর বাবা আদর করে ছোট থাকতে বলতেন… সুদু মা আমার আগের জন্মে বিড়াল আছিল গো হে হে হে। সৌদামিনী কপট রাগ দেখাতেন বাবার উপর তখন। সন্ধ্যাবেলায় ডাকসাইটে সৌদামিনী গলার তুলসীর মালা পরা অবস্থায় হাতেও মালা নিয়ে জপ করতে বসতেন , নিবারণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠাট্টা করে বলতো … মা আমার আধা বৈষ্ণবী। সৌদামিনী এপার বাংলার মানে পূর্ব বাংলার মানুষ। দেশভাগের হিসাব মেটাতে চলে গেছিলেন পশ্চিম বাংলায়। ওইখানে বিয়ে শাদি ঘটি পরিবারে। সব পরিবর্তন হলেও সৌদামিনী মাতৃভাষা বাঙ্গাল ভাষা আর পূর্ব বাংলার খাবার-দাবার পাল্টাতে পারেননি। এই নিয়েও সংসারে বেশ জোরদার ভাবেই নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে করে গেছেন। কিন্তু সৌদামিনীর ঘটি বৌমা কুমুদিনী আবার ওই বাংলার খাবার পছন্দ করেনা। মানে মুখেই তুলতে পারেনা। ওর চাই আলু পোস্ত, চিংড়ি মাছের মালাইকারী ,বড় রুই মাছের পেটি। পাঁঠার মাংস। রোজ শুঁটকির গন্ধে বমি পেতো ওর। এই নিয়ে শাশুড়ি বৌমার দ্বন্দ্ব তুমুল।

আজও সেই একই অবস্থা। ফোড়ন নিয়ে একচোট হলো… জিরে ফোড়ন না মেথি কালোজিরে আর মৌরি ফোড়ন হবে। কিন্তু এই বয়সেও দাপুটে সৌদামিনীর সঙ্গে কুমুদিনী পেরে উঠলো না। অতঃপর এক গালকে তিন গাল করে ফুলিয়ে বিছানা নিলো কুমুদ। এর কিছুদিন পরেই পঁচাশি ছুঁই ছুঁই সৌদামিনী একদিন হঠাৎ স্ট্রোক করে কিছুক্ষণের মধ্যেই পরলোক গমন করলেন। নিবারণ খুব কাঁদলো কাটলো। নিষ্ঠা ভরে মায়ের কাজ করলো। বিলেত থেকে সবার ছেলেপুলেরা এলো। এদেশের ছেলেপুলেরা আর বিলেতের ছেলেপুলে ,নাতি নাতকোর ,মেয়ে জামাইরা বেশ জমজমাট করে শ্রাদ্ধ শান্তি করলো। খুব খাওয়া দাওয়া হলো। বাড়ান দেবার সময় দেখে দেখে শাশুড়ির পছন্দ করা পদ গুলো রাঁধলো কুমুদিনী। নাকে কাপড় চাপা দিয়ে। থরে থরে মাটির থালায় খাবার সাজিয়ে বাড়ান রেডি করলো। চোখের জলে মাকে আকুল করে কেঁদে কেঁদে ডেকে ধুপ ধুনো দেখিয়ে বাড়ান দিলো। এরপর মাছপরশও শেষ হলো একসময়। সব নিয়ম কানুন শেষ। একে একে বাড়ির সমস্ত ছেলেপুলেরা বিদায় নিলো। বাড়ি খালি হলো। পরদিন নিবারণ বাজারে যাবে। কুমুদিনী কে ডেকে বলল… ও কুমুদ বাজারের ব্যাগ দিও। আর ঘরে তো সব ফুরিয়ে গেল। কি আনতে হবে বলো… কুমুদিনী বেরিয়ে এলো… ওগো কিছু ছোট মাছ এনো। ভালো শুঁটকি আর কুমরোর আগা ডগা পেলে আনবে তো। বলে কাজের মেয়েলোক পরীর মার দিকে তাকিয়ে বলল… ও পরীর মা ভালো করে শুকনো লঙ্কা বেটে নিও আর সিমবিচি গুলোও দানাদার বালিতে ভেজে নিও। নিবারণ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। বলছে কি বৌটা তার।…বলছি ও কুমুদ এত্তদিন তো মা থাকতে কিছু খেতেই পারতেনা। এখন তো আর মা নেই।

এখন তোমার পছন্দ মতোন মাছ তরকারি আনি! …অবাক করে দিয়ে কুমুদিনী বললো…নাগো এসব এনোনা। বড় মাছ খেতে কেন জানি বমি আসছে গো। খেতে পারছিনা একদম। ওই সব নারোকোল বাটা পোস্ত বাটাও আর ভালো লাগছেনা। আমিতো ঐ মৌরলা মাছের লাল টকটকে ঝাল ঝাল তরতরা খাবো আর শুঁটকি দিয়ে আগা ডগা। বাস আর শেষ পাতে দুধ দিয়ে মেখে। নিবারণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল। আর কুমুদিনী ঠাকুর ঘরের পাশে মায়ের ঘরের দিকে মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপে দু ফোঁটা চোখের জল ফেললো। আর মনে মনে বলল… মা, আপনার সঙ্গে এভাবে ঘর করতে করতে কখন জানি আপনার অস্তিত্ব আমি দখল করে নিয়েছি বুঝতেই পারলুম না। ছবি হয়ে যাওয়া সৌদামিনী যেন মুখ টিপে একটু হাসলেন, যেন বলে উঠলেন… আত্তরমারী বৌ, তর অত বুইজ্যা কি কাম!! তুই খা না যত্ত পারস শাশুড়ির মতো রাইন্দ্যা , আপত্তি কে করলো?

ছবি: গুগল