লিখছি তোমাকে শরৎকাল…

কুয়াশা পড়তে শুরু করেনি এখনো। ইট কাঠের এই নগরীতে কুয়াশা কোথায়! প্রকৃতি ভাদ্র পার হয়ে আশ্বিনে পা দিয়েছে। শরৎকাল ক্যালেন্ডারের পাতায়। দিনের বেলায় এখনো খর সূর্যের আলো, উত্তাপের রাজত্ব। তবুও শরৎ এসেছে আমাদের এই নগরীতে। কোনো কোনো দিন ভোরবেলা এলোমেলো হাওয়া বইতে শুরু করেছে, আকাশে ফেটে পড়া নীলের উৎসব। কারো বাগানের শিউলিতলা আলো করে ফুটতে শুরু করেছে ফুল। এই শহরে সামান্য ক্ষুদকুড়োর আয়োজন করতে গিয়ে নাকাল মানুষদের কেউ কেউ হয়তো স্মৃতির ভেতরে খুঁজে ফেরেন হারানো শরৎকালের ছবি।  কত স্মৃতি একটার পর একটা দৃশ্য হয়ে ভেসে যায় শরতের আকাশে সাদা মেঘের মতো। কত জায়গায় বাঁধা পড়া মন, কতবার ভেসে যাওয়া মন, কত গন্ধ, কত ভালোলাগা লেগে থাকে সেসব কাহিনিতে। শরৎকালের সেইসব ফেরারী গল্পের অসামান্য ছবি নিয়েই প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন ‘লিখছি তোমাকে শরৎকাল।’  

হামিদ কায়সার (লেখক)

আমরা শরতের পক্ষেই আছি

সত্যি কথা বলতে কী, এই শহরে যদি কারোর আকাশের দিকে তাকানোর অভ্যাস না থাকে, সে হয়তো বুঝতেই পারবে না যে শরৎ কখন এলো। আগে তো তবু আকাশের দিকে না তাকালেও চলতো, যার ইন্দ্রিয় একটু সজাগ আছে, সে গায়ে হাওয়া লাগলেই বুঝে ফেলতো শরৎ প্রিয়তমা এসে শরীর ম্যাসাজ করতে শুরু করেছে। হা বেশ মনটা ফুরফুরে হতে লাগছে। মচমচে করে ভাঙছে বর্ষায় জমে থাকা মনের সব অবসাদগুলো। এবার সব ছেড়েছুড়ে বেরিয়ে পড়ো ঘর থেকে, পারলে দূরে কোথাও হারিয়ে যাও। হাঁ, একসময় আমার কাছে শরতের ইমেজ বলতে বরাবর মনে হতো, শরৎ মানে হঠাৎ ছুটির মন্ত্রণা! বজ্র-বৃষ্টির বাধা নেই, শীতের জবুথবু থাবা নেই, একটু গরম তো একটু শীতলতার ছোঁয়া হাওয়ার ভাঁজে ভাঁজে- মন গানের মতো হয়ে যেতো। সেই সুরটুকু যেন আজ ঠিক মিলছে না। এখন শরৎও শিকার প্রকৃতির বৈরিতার, গুমোট ভ্যাঁপসা গরমে কী আর সেই ভালো লাগার ফুলরেণু পাওয়া ‍যায়? যায় না। ওদিকে মেঘবৃষ্টিও যেন নিজের সীমারেখা ভুলে গেছে। পরপুরুষের মতো পরকীয়ার ঢলঢলানিতে কখন যে শরতের বুক-পিঠ-নিতম্ব ভিজিয়ে ছাড়ে- একেবারে কেলেংকারি কাণ্ড!
আর আকাশ দেখে যে কেউ ঠাওরাবে শরৎসুন্দরীর এলো কীনা, সে জো তো দিন দিনই মিইয়ে আসছে বলেই মনে হচ্ছে। ঢাকার আকাশের মধ্যে যে কার্বন ডাই অক্সাইডের মড়ক লেগেছে, সেই বিষবাষ্পের চাদর ভেদ করে প্রায়শই তো শরৎরাণীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে নীল শাড়ি আর শাদা ব্লাউজের ম্যাচিং পরানো নিজের রূপ দেখানোর! আর এরই অভাবে কীনা, আমার মতো প্রকৃতিস্বভাব ভীরু মানুষগুলো যেন কিসের অভাবে কিসের অভাবে, একটু এলোমলো আর একটু খাপছাড়া আর একটু অস্থির। এভাবেই কী সমাজ থেকে স্বস্তির পালক একটা একটা করে খসে পড়ছে?
তবে কেউ কেউ বটে হঠাৎ শহর ছেড়ে কোথা চলে যায়! গাড়ি ভর্তি ভর্তি করে কাশবন নিয়ে আসে, ভরিয়ে তোলে ফেসবুকের পাতা জড়ো করে নীল মেঘ শাদা আকাশ আর জানাতে চায়, আমরা শরতের পক্ষেই আছি, আমরা শরতে রাজী!

 

স্বরূপ সোহান (লেখক)

শরৎবাবু খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে

ভুপেনের এই শরৎবাবু আর আমার শরৎবাবু এক নন।

মিল কিন্তু নেই চিঠিতেও। ভুপেনের চিঠি অভিযোগনামা। আর আমার চিঠি? সে তো শুধুই খুঁজে ফেরা।

কখনো শৈশবের আবার কখনোবা কৈশোর কাটিয়ে সদ্য তারুন্যের শরৎকে নিয়মিত লিখে যাওয়া। এই শহরের শরৎ যেনো রঙ বদলের যাদুকর।বর্ষার সাদাকালো বিষন্নতাকে হটিয়ে দিয়ে চারপাশকে ঝলমলে করে রাঙ্গিয়ে দেয় আমার শরৎ।আর তখনই এই শরৎকে আমি চিঠি লিখতে শুরু করি। অনুভবের এই চিঠি বছর বছর জমতেই থাকে। পোষ্ট করা আর হয়ে উঠে না। মাত্র দুইমাস বয়সী আমার শরৎকে লেখা এই অজস্র চিঠি থেকে দু’একটি বরং আজ পোষ্ট করা যাক। অনেকদিন পর আজকে হেটে স্কুলে যাচ্ছি। কী যে বিচ্ছিরি বৃ্ষ্টি গেল এই ক’দিন। আমার মোটেও রিক্সায় স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু কী করা, প্যাচপ্যাচে কাদা আর বৃষ্টি জ্বর ঠেকাতেই রিক্সা। অথচ আকাশে আজ যেনো নীলের উৎসব। রাস্তায় আজ সব কাদাঁ উধাও। আমাদের পুরান ঢাকার ভোরবেলায় আবার সেই চিরায়িত দৃশ্য। মাঠা বিক্রির হাঁক ডাক।বাখরখানির দোকান আজ আবার সরগরম। রোদ ঝকমকে চারপাশ। কোথায় যেনো একটা বদলে যাওয়া। ঠিক ধরতে পারছিলাম না। আমার স্কুল বন্ধু মিঠু বাসা থেকে বেরিয়ে আমার সঙ্গী হয়েই বললো, ‘যাক মরার বৃষ্টি আর হবে না বুঝলি, সিজন শেষ।’ আর তখনই বুঝে ফেললাম শরৎবাবু চলে এসেছেন আমার প্রিয় এই শহরে।

আমাদের কলেজের করিডোরের একদম শেষপ্রান্তে ছিলো হাত ধোয়ার বেসিন। আমার ক্লাসে আমি যে জায়গাটায় বসতাম সেখান থেকে সরাসরি বেসিনটা দেখা যেতো। অন্য ক্লাসে আমার কয়েকজন ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলো যাদের সঙ্গে আমি নিয়মিত ক্লাস পালাতাম। আমার ওই বন্ধুদের মধ্যে কেউ একজন ওই বেসিনে মিথ্যে হাত ধোওয়ার ভান করতো। সেটাই হচ্ছে সিগনাল। বুঝে যেতাম পালানোর সময় হয়েছে। পিছনের দরজা দিয়ে হাওয়া। কত কত দিন এভাবে পালিয়ে দলবেধে এই শহরের আনাচে কানাচে আড্ডা জমাতাম।

সত্যি বলতে কি, ক্লাস পালানো বেড়ে যেতো শরৎবাবু শহরে এলে। রৌদ্রজ্জল এই শহরে তখন জমে যেত হরেক ইভেন্ট। শীতের আগেই শরৎবাবু জমিয়ে দিতেন মিনাবাজার, ফ্যাশন শো আর ওপেন এয়ার কনসার্ট দিয়ে পুরো ঢাকা শহরকে।মনে আছে ডব্লিউ ভি এ মেলা আর বামবা কনসার্টের জন্যে আমরা নতুন কাপড় ও বানিয়েছি। সারা বছর ছিলো অপেক্ষা শরৎবাবুর জন্যে। কবে আসবেন তিনি। আমরা ক্লাস পালাবো আর ছুটে বেড়াবো শহরময় বন্ধুদের নিয়ে। শরৎবাবু চলে গেলেই কিন্তু সর্বনাশ।বসতে হবে পরীক্ষার পড়ায়। তাই শরৎবাবুআমার এত প্রিয়।

আর প্রিয় হবে নাই বা কেন ? শরৎবাবুর জন্যেই যে আমি আমার প্রেয়সীকে পেলাম। কোন এক পাতাঝরা সময়ে আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি। অক্টোবরেরশুরুতে। প্রথম দেখায় মুগ্ধ হয়েছিলাম তার দাঁত আর হাসি দেখে। অপলক চোখে তাকিয়েছিলাম তার মাথায় গোঁজা শিউলির মালায়। আজ ভাবি,শরৎবাবু শিউলি ফুটিয়েছিলেন বলেই আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম।

শরৎবাবুকে নিয়ে চিঠি লিখা আমার এখনো থামেনি। আজো কর্পোরেট জীবনে আমি চিঠি লিখছি। কর্মময় জীবনের চলতি পথে গাড়ীর জানালা দিয়েআমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় শরৎবাবুর । মুচকি হেসে তিনি প্রশ্ন রাখেন, তোমার প্রিয় সময় ? আমিও চোখের তারা নাচিয়ে উত্তর দিই, কেন আপনি? শরৎকাল !!!

 

শায়ন্তন ঠাকু ( লেখক, কলকাতা)

অকালবোধন ও নিঃসঙ্গতার গল্প

গতরাতের বৃষ্টি ভেদ করে জেগে উঠেছে নরম আলোর সকাল। দৃষ্টিরেখার বাইরে কোথাও নিশ্চয়ই ফুটেছে কাশ। আমাদের দূর মফস্বলে ভাঙা পুরোনো বাড়ির উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সাদা আর কমলা বোঁটার শিউলি। ট্রেন রাস্তার দুপাশে ভরা হাওর, তার একটু পর নাবাল জমি তারও পর অনেক শাদা মেঘ ছড়ানো আকাশ পার হয়ে মানুষজনের ফিরে যাওয়া। হরেক কিসিমের ট্রলি আর সুটকেস। আমার ভাবতে ভালো লাগে ওইসব ব্যাগের পেটের ভেতর লুকিয়ে আছে উপহার। প্রিয় মানুষের জন্য বয়ে নিয়ে চলা উপহার। মধ্যবিত্ত সংসারের উপহার। আর ওই চলে যাওয়ার পিছনে পড়ে থাকে কলকাতা। সেখানে ঝলমলে দিনের শেষে সন্ধ্যের মুখে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে ছাতিম। ফ্যাব ইন্ডিয়া,বাইলুম,শপার্স স্টপের পাশাপাশি ভিড় জমে উঠছে হাতিবাগানের ফুটপাতে,গড়িয়াহাটে। বড়বাজার আর হাওড়ার হাটে। ধর্মতলার রেলিংএ। শেষবেলায় মানুষ কিনছে জামা কাপড় জুতো সানগ্লাস আরও কত কী যেন! অতিকায় সব প্যান্ডেল ইভেন্ট টক শো সেলিব্রিটি জীবনের পাশে সেজে উঠছে পাব বার ডাইন আউটের সব আস্তানা। চাইনিজ ইতালিয়ান মেক্সিকান থাই ইউরোপিয়ান ডিশ সহ ডাব চিংড়ি বা ইলিশ ভাপা অথবা কচি পাঁঠার ঝোল। মধ্যবিত্ত পাড়ার নটরাজ রোল সেন্টার অথবা “নিউ আসের্নাল বিরিয়ানি” ও আছে। সবার মুখে জ্বলে উঠছে মায়া প্রদীপের আলো। এই এত উৎসবের থেকে পালানো কি তবে নেই কোথাও ? আছে তো! সে পালানোর ট্রেন এসে থামে ছোট্ট একটা প্ল্যাটফর্মে। ঝপ করে লাফিয়ে নেমে পড়তে হয়। স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করে থাকে সব ছোটবেলার বন্ধুরা। একটা রংচটা স্কুটার থাকে,যেটায় চাপিয়ে জেঠু আমাকে আর দিদিকে নিয়ে যেত ঠাকুর দেখাতে। মস্ত ক্যাপের রিল আর কালো বন্দুক। ক্যাপ্টেন হ্যাডক আর পাগলা সাহেব। অনেক নাড়ু আর মুড়কি। নবমীর খাসির মাংস। আর সেই অলৌকিক বাগান ঘেরা বাড়ি। সেও তো আছে। গমগমে। আত্মীয় স্বজনের ভিড়ে ভর্তি। শিউলি গাছটাও আছে। তবে কেউ আর কুড়োয় না। উঠোনে শুয়ে থাকে অনাদরে। একটু আগেই মিথ্যে বললাম। খাঁ খাঁ সে বাড়ি একলা চুপ করে বসে থাকে। আমারই মতো। জেঠু আর হাঁটতে পারেন না। ক্যাপ বন্দুকের দোকানও উঠে গেছে যেন কবে। সে মফস্বলে আমি আর ফিরে যাই না। রোদ্দুর মেঘ আর জোছনা ভেসে যায় আনমনে। তারই মাঝে আবার একটা পুজো চলে আসে। এবার সব আলো আর উৎসবের উল্টোদিকে আমি হেঁটে আসব কুড়ি বছর। ট্রেন এসে থামবে আমার দরজায়। প্ল্যাটফর্ম নাম্বার নয় পূর্ণ তিনের চার ! তার হুইসেল শোনা যাচ্ছে।ভুসভুসে কয়লার ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে চরাচর। ধলচিতের খেয়াঘাট, বেত্রবতী, হরিহর রায়ের কোঠাবাড়ি আর সেই বিখ্যাত কাশফুল ভর্তি মাঠ পার করে এবার ছুট লাগাবে ওই রেলগাড়ি। আমারও গোছগাছ সব শেষ। হোল্ডওলে বেঁধে নিয়েছি জামা কাপড়, পুরোনো মুভেবল ফিস্ট, কলেরার দিনগুলোতে প্রেম, দুটো ধুতি, একটা শার্ট, নারকোলের নাড়ু, গোটা নোট আর খুচরো মিলিয়ে বিয়াল্লিশ টাকা, চিরুণী, ছোট হাত আয়না। হাতে নিলাম গ্লোব। রামদেওরা পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। কোন দেহাতি স্টেশনে চাপাটি আর আলুর চোকা মিলে যাবে নিশ্চয়ই। অন্ধকার প্ল্যাটফর্মের একপাশে হলুদ লণ্ঠনের আলোয় তখন কি শোনা যাবে রামগাত্তার সুর ? আমাকে যেতে হবে আরও অনেকটা পথ। সকালের শিউলি আর অপরাজিতা ঘেরা সেই বাগান বাড়ির দরজায়। ভেতর বাড়ি থেকে ভেসে আসে বোধনের ঢাক। আলপনা আর নতুন তাঁতের শাড়ির খসখস শব্দ। লাল সুড়কির পথ পার হয়ে আমাকে পৌঁছাতে হবে সেখানে। সে কি আছে এখনও ? সেই শ্যাওলা রঙের শাড়ি? শোনা যায় কি তার পায়ের আওয়াজ এখনও ? উৎসব শুরু হওয়ার আগেই পৌঁছে যাব আমি। তারপর পদ্মদিঘীর বাঁধানো ঘাটে বসে দেখবো তার জল আনতে যাওয়ার সেই প্রাচীন মিথ। আকাশে তখন রোদ্দুর আর রোদ্দুর। এক’শো আট পদ্ম এবং অকালবোধনের গল্প।

অদিতি বসুরায় (কবি, সাংবাদিক, কলকাতা)

রঁদ্যেভু

আজ এক পুরোনো স্যাঙাতের সঙ্গে দেখা । এক বছর পর। সন্ধ্যেয় ফেরার পথে। আঁধারে। একলা। পাগল যে, সে।
আজ বিকেল থেকে বেখেয়ালের বশে সেল ফোনের চার্জ খতম।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখি, ফোন বন্ধ । ফেরার পথে, কি আশ্চর্য, লোডশেডিং।
ওমনি, দুপাশের বাড়িগুলোর ছায়া ঝুলনের খেলনার মতো। ফোন নেই, আলো নেই – এবড়ো খেবড়ো পথ – জল জমে আছে সদ্য বৃষ্টি থামার পর। আমিও একাই। ও হ্যাঁ, সঙ্গে সে। সামান্য খুনসুটি। তার ডিও-তে হিম হিম গন্ধ।
আহা! কি হিরণ্ময় সেই মিনিট পনেরো!
আলো চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত শহর ছিল আমার কাছে বিষ । পুজোর কলকাতাকে আমি কোনও প্ররোচনাতেই ভালবাসতে পারি না। এ সময় এই শহরের গা থেকে গরম ভাপ বের হয়। সেই ভাপে জ্বলে যায় আত্মাও। এখন আমার বাড়ির ফেরার সময়!
আজকাল নস্ট্যালজিয়া মেরে ফেলতে পারলে, লোকে তাকে ‘আধুনিক’ বলে। আমি এক আদিম, বাড়ি- প্রবণ লোক।
সেকেলে। অনাধুনিক রকম ভাবে বাড়ি ফিরতে ভালবাসি। আর সেই মফঃস্বল, আমার সেই প্রিয় মফঃস্বল শেষ বর্ষা থেকে স্বপ্নে হানাদারি করে। সেই রেল স্টেশন , সেই ক্লাব, সেই সব প্রতিবেশি, আমাদের বাড়ি, মেহগনি গাছ, অনভ্যস্থ কাঁচের চুড়ি, দরদালানের কাটাঘুড়ি, উদার রোদ্দুর আর সবার ওপরে আমার প্রিয় ইছামতী – এ দুনিয়ার সেরা জায়গা। অতুলনীয়।
বন্ধুগণ, সারা বছর আমি কলকাতার মায়ায় ঘুরে মরি ভালবেসে। মাণিকতলায় ইলিশ, বাগবাজারে বন্ধু, পার্ক স্ট্রিটে মেমসাহেবি, ইলিয়ট রোডে ট্রাম, রবীন্দ্র সদনে নাটক, বো ব্যারাকের বাওয়ালি, নিউ মার্কেটের সুজির বিস্কুট এসব আছে যতদিন ততদিনই আমার বাঁচার বড় সাধ।
কিন্তু এই স্যাঙাৎ – সে এখানে আমাকে টিঁকতে দেয় না।
আজ সামান্য ওই পাওয়ার কাটেই সে, আমাকে বসিয়ে দিল এক ম্যাজিক শোয়ের মাঝে। এক পুরোনোকালের টাইম মেশিনে – সেখানে লম্বা লম্বা ছায়া, ঝিকিমিকি জল, কালচে ইন্ডিগো ওড়নার মতো আকাশ, শিশির পড়ার প্রাক মুহুর্ত, আর ডাকহীন এক গাড় আদর – অপরূপ!
এরপর আর খুচরো গুনতে ইচ্ছে করে না, রিক্সাচালকের সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প হয় খানিকক্ষণ
আজ আমরা একসঙ্গে রাত কাটাবো। প্রায় এক বছর পর ভালবাসাবাসি হবে।
ওর নাম, শরৎকাল।

শেখ রানা (গীতিকার, কবি)

এখন শুনি অটাম বা ফল

শরৎ মানে নীল সমুদ্র আকাশ। সেই আকাশে সাদা পেজা তুলোর মত ঝকঝকে কিন্তু উদাস উদাস মেঘ। শৈশব-কৈশোর এর আমি আর আমার ঢাকা শহর।

গ্রীষ্মের গরম আর বর্ষার বিপুলা বৃষ্টি হবার পর কোন ফাঁকে যে শরৎ এসে উপস্থিত হতো ক্যালেন্ডারে আমি অন্তত টের পেতাম না। কেমন শান্ত আর নিমীলিত হয়ে ভাদ্র আশ্বিন মিলে শরৎ একটা কাল হয়ে ধরা দিতো সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে, আমার প্রিয় শহরে।

আমরা তখন হাইকোর্ট কম্পাউন্ডের ভিতরে থাকি। কলোনী জীবন। সে এক মহাযজ্ঞ। স্কুল শেষ করে বাড়ি ফিরে একটা যৌথ পরিবার খুঁজে পাওয়া প্রতিদিন। রাতে মাঝে মাঝেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে যেত তখন। মুহূর্তে হাসিমুখ হয়ে যেত আমার। আম্মার কড়া চোখের চাহনি যেহেতু দেখা যাচ্ছে না সেই অন্ধকারে তাই ‘খবরদার বের হবি না’ শোনার আগেই বের হয়ে যেতাম। পি ডব্লিউ ডি কলোনীর ভিতরেই চিলতে মাঠ আর ইট সুরকির পথ। ততক্ষনে আমার সমবয়সী আর বড় ভাই-আপুরা সবাই বাইরে। আকাশ থেকে জোছনা নেমে আসছে সুন্দরীতমা হয়ে। চারপাশে একটা অপার্থিব আলো। কৌমুদী রাতের ছটা এসে আমাদের চিত্ত চঞ্চল করতো। মনে মনে ভাবতাম, এই রাত থাকুক। শরতের এই রাত আলিঙ্গন করুক এভাবেই অনন্তকাল।

কিন্তু তা কী হয়? হয় না। কাল পরিক্রমায় বয়স বাড়ে। বয়স যেহেতু সব কাল ধরে রাখে বুকের বাম অলিন্দে আমিও সেই বয়সকালের আবর্তে নতুন শরৎ দেখি। বিলেতের আকাশে, বাতাসেও শরৎকাল আসে। কাশফুল আসে না, আসে না শৈশব।

শরৎ, আমার কবিতার খাতায় নিবিড় যতনে গান হতে থাকে একা একা।

শামীমা জামান (লেখক)

শিউলির ঘ্রাণে ঘুম ভাঙ্গতো

শরৎ আসে সেজেগুজে।স্নিগ্ধ সফেদ নির্মল সাজে।বসন্তের চেয়ে তার আবেদন কোন অংশে কম নয়।আজ যদি সন্তান কে শরৎ বোঝাতে চাই কোন অনুভূতির ছোয়া ওকে দিতে পারবোনা কেবল ভার্চুয়াল শিউলি বা বন্ধুদের কাশবনে যাওয়া ছবি ছাড়া। অথচ শরৎ আসতো ভীষন ভাবে। ঘন কাশবনে । আমাদের কচি কচি প্রাণে । শিউলির ঘ্রাণে।

সেইসব ভোরে। পথের পাঁচালীর দুর্গা এসে ডাকতো ।ঘুমের ঘোরে। পা টিপে টিপে বের হয়ে প্রথমে খানিক পথ ঘাসের গায়ে শিশিরের চাঁদর মাড়িয়ে শরীরের যত্ন নেওয়া।কিছুটা শিশির হাতে নিয়ে মুখে আলতো করে ছোঁয়ানো। দুধ খেয়ে যেমন শক্তি বোধ হয় তেমনি যেন রূপসী হয়ে উঠতো ত্বক সে ছোঁয়ায়। এসবই দুর্গা মানে লতা প্রযত্নে এডভোকেট ওয়ালিউর রহমান এর কথা। সে ছিল সবজান্তা। দস্যি জ্ঞানী।

চিত্রা পাড়ের সরু ইট বিছানো রাস্তা ধরে কিছুপথ এগোলে বালিকা বিদ্যালয়। ভোরের অভিযান কেন্দ্র। যত ভোরে দারোয়ান ,ঝাড়ুদার মাসী ও এসে পৌছায় না। অগত্যা তালাবন্ধ গেটের নিচে দিয়ে ছোট্র শরীর দুটো পাচার হতো।মাঠের এক কোনে দাঁড়িয়ে সেই মোহময়ী সুন্দরী! সারা গা সবুজ পত্র পল্লবে ঢাকা। গেরুয়া বোটার গায়ে সাদা তারাগুলো ঝিকমিক করে। আর আমাদের বিজয়ী মন চনমনে উদ্যমে নেচে ওঠে। মাটির ফুলেল বিছানা থেকে ফ্রকের কোরচ ভরে আনন্দ তুলি। ফিরতে পথে মুঠো ভরে মৃগনাভি নিঃশ্বাস নিতে নিতে কে জিতলো সেই হিসেব কষা। বারান্দার সিড়িতে বসে সেই গেরুয়া বোটায় সুই ফুড়ে যেতো। এত যত্ন আয়োজনে গড়া শিউলি মালা খানিকবাদেই তার রূপ রস হারাতো। তাতেকি? পরদিন আবারো মহা সমারোহে অভিযান চলতো। কোন কোনদিন ঘুম ভাঙ্গতো সেই মাতাল গন্ধে। চোখ মেলে দেখতাম একমুঠো শিউলি।বালিশের পাশে নাক বরাবর। সুবহে সাদিকের সময় আব্বা নামাজ পড়তে যেতেন। ফেরার পথে পকেট ভরে শিউলি এনে ঘুম ভাঙ্গাতেন। কখনোবা বেলি,গন্ধরাজ আর কাটা কাটা বকুল ফুল। আহা ! এমন করে এখন আর কেউ ঘুম ভাঙ্গায় না।

পাড়ার মাঝে দুরের বাড়ী থেকে লতা আর তার বোন আশা মধু ঢেলে সকলকে এক করতেন। আমরা সে মধুর টানে পায়ে পায়ে সেখানে পৌঁছে যেতাম বিশ্ব জয়ের আনন্দে। যেমন করে অপু আর দুর্গা রেল লাইন অবধি পৌঁছেছিল। ছুন সায়েবা ছুন পেয়ার এক ধুন…। কাছে গিয়ে সেই ধুপ ধুনে মিশে যেতাম। প্রসাদের থালায় থরে থরে সাজানো পরিপাটি খাবারে আড়চোখে চেয়ে নেওয়া। ছোট ছোট আখের টুকরোগুলো জিভের জলে গড়াগড়ি খায়। অসুর কে বধ করে হেমা মালিনী দুর্গা (তখনকার শিল্পীরা হেমা মালিনীর আদলেই দুর্গাকে গড়তো ) নারীবাদের ঝান্ডা হাতে দাঁড়িয়ে। সেদিকে চেয়ে থেকে লিলিবুবুর সাবধান বানী কানে বাজে ‘ওদিকে চাইতে নেই। পাপ হয়। ‘ কে শুনেছে কার কথা। শহরের সবগুলো পুজো মণ্ডপ ঘুরে বিচারকের দায়িত্ব যে আমাদেরই পালন করতে হতো। আর প্রতিবারই পাড়াতো পুজো মণ্ডপ হিসেবে অঞ্জলীদির দুর্গাই সেরা হতো আমাদের একপেশে বিচারে। আহা! সেই অপরূপ সেক্সি হেমা মালিনী দুর্গা।এখনকার দুর্গারা লাইফের স্ট্রেস নিতে নিতে কেমন যেন রুক্ষ আর দাজ্জাল চেহারার। মিনিমাম প্রিয়াংকা চোপড়ার চেহারাও দিতে পারেনা এরা। আহারে সেই শরৎ এর মন কত ভাল ছিল।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা, তারেকুল ইসলাম ও গুগল