প্রহরে প্রহরে প্রহার …

 

বিজয়া পুরকায়স্থ

(দিল্লী থেকে):  ছোটবেলা ভাবতাম ইনি আমার সৎমা। নিজের মেয়েকে এতো শাসন , এতো বকা , এতো মারধোর কেউ করে ? রোজ মার খেতাম…নিদেনপক্ষে এক দুটো গাট্টা তো খেতামই । যাকে বলে প্রহরে প্রহরে প্রহার। মা বেচারিরও বোধহয় আমাকে বকা মারাটা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। রাতে বিছানায় গিয়েও শেষ মারটার জন্য  অপেক্ষা করতাম। ভাগ্য ভাল থাকলে তাড়াতাড়ি মারটা পড়তো আর আমিও নিশ্চিন্ত হয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে পারতাম।

              প্রত্যেকদিন ভাবতাম মা এতো বকেন কেন? এতো মারেন কেন ? এমন কোনো বাজে কাজ তো আমি করি বলে মনে হয়না ? কি করি আমি ? সকালে পড়ার টেবিলে বসে জানালা দিয়ে পাশের বাড়ীর দিদির সঙ্গে একটু গল্পসল্প করি , মাছওয়ালা এলো কিনা দেখি, কি কি মাছ এনেছে একটু খবর করি । শব্জিওয়ালার ঝুড়িতে লাল লাল মিষ্টি কুমড়ো দেখা গেছে কিনা সেটা গলির  প্রতিবেশীরা জিজ্ঞাসা করলে বলে দিই। ওই কোনার বাড়ীতে কাজের মেয়ে ক’টায় ঢুকলো আর ক’টায় বেরোলো সে খবর দিই। গলির শেষ বাড়ীর দাদা বাজার করতে কতক্ষণ আগে বেরিয়েছেন সেটা খেয়াল রাখি।  রিটায়ার্ড দাদুদের সঙ্গে গল্প করে ওদের বোরডমটা একটু কমাই । এই কাজগুলো আমি সবসময়ই দায়িত্ব নিয়ে করি। এগুলো একধরণের জনকল্যাণ হলো কিনা? তাও মা মারেন । কি আর বলবো বলো ? ভালো কাজের আজকাল আর মূল্য নেই।

            কলেজে পড়াকালীন একবার তো মায়ের কাছে প্রচুর মার খেলাম কারণ ওই কোনার বাড়ীর ছেলেটা বুঝি আমার জ্বালায় নিশ্চিন্তে পায়খানায় যেতে পারে না। ওদের বাড়ীতে বাথরুম আর টয়লেট উঠোনের অন্য দিকে। আমি রোজই পড়ার টেবিলে বসে দেখতাম ছেলেটা লুঙ্গি পরে ডালডার একটা কৌটোতে জল নিয়ে মাথা নীচু করে তুরতুর করে হেঁটে টয়লেটে ঢোকে। তারপর পাক্কা আধাঘন্টা বাদে মাথা নীচু করে বেরিয়ে এসে আবার তুরতুর করে হেঁটে স্নানের ঘরে ঢুকে পড়ে । ঢুকে পড়ে তো পড়ে, আমার বয়েই গেল। খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। প্রাণী হয়ে যখন জন্মেছে তখন প্রকৃতির ডাকে তো সাড়া দেবেই। কিন্তু ওর ওই তুরতুর করে হাঁটা দেখলে আমার জব্বর হাসি পেতো। হাসতাম আমি..কিন্তু ওর মা আমার এই হাসির অন্য অর্থ বের করে আমার মায়ের কাছে নালিশ করতে এলেন। ওনার ছেলে বুঝি টয়লেটে যাওয়ার আগে উঁকি মেরে দেখে আমি পড়ার টেবিলে বসে আছি কিনা ? আমাকে দেখতে পেলে ঘর থেকে বেরোয় না। যখন চাপ আর ধরে রাখতে পারেনা তখন  লজ্জার মাথা খেয়ে টয়লেটে দৌড়োয়। টয়লেটের দরজার ফুটো দিয়ে আমাকে লক্ষ্য করে। বসে বসে যখন ওর পা টনটনিয়ে ওঠে তখন বুঝি আবার লজ্জার মাথা খেয়ে টয়লেট থেকে বেরোয় । রোজ এইভাবে আটকে আটকে ছেলের গ্যাস আর অ্যাসিডিটির সমস্যা শুরু হয়েছে । অফিসের দেরী হয়ে যায়। বোঝো কাণ্ড !!

                 মা চুপ করে সব শুনলেন। তারপর ওনাকে চা, পান টান খাইয়ে বিদেয় করে আমার কলেজ থেকে ফেরার অপেক্ষায় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন । আমি মাকে গেটে দেখেই পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে গেছি কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে । কিছু বোঝার আগেই ঠাস ঠাস,গদাম গদাম সঙ্গে প্রচন্ড বকুনি। শুধু একটা শব্দই কানে আসছিল পায়খানা পায়খানা। আমি  আমার পুরো আইকিউ লাগিয়েও পায়খানার ব্যপারটা বুঝতে পারছিলাম না। পরে পাশের বাড়ীর দিদির থেকে পুরো ব্যাপারটা শুনে অবাক হলাম আর তার সঙ্গে চিরদিনের জন্য পড়ার টেবিলের সামনের জানালাটা বন্ধ হয়ে গেল। রান্নাঘরে ডাইনিং টেবিলে পড়ার ব্যবস্থা হলো..সোজা মায়ের চোখের সামনে। আচ্ছা বলো, আমি কি এই শাস্তিটা ডিজার্ভ করি ?  কিন্তু কলিযুগে কি না হয়।

             মায়ের হাতে সবচেয়ে বেশী মার খেয়েছি পড়াশোনার জন্য । স্কুল থেকে ফিরে ভাত খেয়েই এক’শটা অঙ্ক কষতে হতো। আচ্ছা, মায়ের শরীরে কি দয়ামায়া বলে কোনো জিনিস ছিল না গা ? সারাদিন স্কুলে ক্লাসের বাইরে কান ধরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হাতে পায়ে ব্যথা  …তার ওপর আবার এতটা পথ হেঁটে বাড়ী ফেরা । টায়ার্ড লাগে না বলো ? খুব বেশী হলে আধাঘন্টার মধ্যে আবার এক’শটা অঙ্ক কষতে বসে পড়ো। মামার বাড়ীর আব্দার আরকি। তাই সরলীকরণ অঙ্কগুলোর ফল যেনতেনো প্রকারে জিরো বা এক’শ বানিয়ে ফেলে রাখতাম। সন্ধ্যের পর মা অঙ্কগুলো চেক করতেন আর এক একটা ভুল অঙ্কের জন্য একটা করে কানমলা দিতেন । অনেকদিন এক’শটা কানমলাও খেয়েছি। কান দুটো ঝা ঝা করতো। এতো টানাটানিতে কান দুটো যে হাতির কান হয়ে যায়নি সেটাই রক্ষে ।

              আর কতো মার খাওয়ার গল্প বলবো বলো ? লজ্জাও তো লাগে না কি ? ছাদ থেকে কাপড় তোলার ভার আমার ওপর ছিলো। কোনো এক দৈব কারণে  বৃষ্টির দিনগুলোতে আমি কাপড় তুলতে ভুলে যেতাম। এতো এতো কাপড় বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে যেত। মাকে বোঝাতে পারতাম না যে এই ভুলে যাওয়ার পেছনে সিওর কোনো অপদেবতার হাত আছে। আমাকে পাট পাট করে মারার আগে ওনার গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত কেন আমার  সব মনে থাকে কিন্তু কাপড় তোলার কথা মনে থাকে না ? কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা।

           মাসে এক দু’বার নানান কারণে আমাকে বৃহস্পতিবারে ঠাকুর দিতে হতো। ব্যাপারটা এতো লেংদি প্রসেস ছিল যে আমার ধৈর্য্যে কুলোতো না। তাই মাকে লুকিয়ে ঠাকুরদেরকে স্নান না করিয়ে স্পঞ্জ করিয়ে দিতাম। আমরাও তো জ্বর মর হলে স্পঞ্জ করি তাহলে ঠাকুরকে স্পঞ্জ করালে কি ? কিন্তু মা কেমন করে যেন টের পেয়ে যেতেন আর আমার যুক্তি ধোপে টিকতো না। আমার ঠাকুরঘর থেকে শুধু বেরোনোর অপেক্ষা …তারপরই গদাম গদাম শুরু। লক্ষীর পাঁচালি পড়াতে ছিলো আমার সবচেয়ে বেশী অনীহা। মা কাজ করতে করতে আমার পাঁচালি পড়া শুনতেন। যেই মা একটু অন্যদিকে গেলেন তৎক্ষণাৎ আমি তিন চারটে পাতা উল্টে দিতাম। মা একটু পরে ফিরে এসে বলতেন …সদাগর মাত্র বাণিজ্যে গেল আর এরমধ্যে তোর পাঁচালি শেষ হয়ে গেল ? আজ ঠাকুরঘর থেকে বেরো তুই..তোর খবর নেবো একটু ভালো করে। ঠাকুর নিয়ে ইয়ার্কি করা বের করছি তোর । আচ্ছা, তোমরাই বলো এসব ছোটখাটো কারণে নিজের মেয়েকে রামধোলাই দেওয়ার কোনো মানে আছে ?

               অন্য লোকের ভুলের জন্যও কত মার খেয়েছি বাবা রে বাবা। একটু বড় হওয়ার পর ছেলেদের টুকটাক প্রেমপত্র, গ্রিটিংস্ কার্ড, কলম টলম গিফট আসতো । আচ্ছা বল কেউ ভালবেসে কিছু দিলে আমি না করি কি করে ? দুরুদুরু বক্ষে চিঠিগুলো পড়েটড়ে খুব গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখতাম। কিন্তু আমার মা যে গোয়েন্দা গিন্নী, আমার মাতা যে মাতা হারির মতো স্পাই…সব বের করে দুপুরে বালিশের পাশে রেখে শুয়ে থাকতেন। আমি কলেজ থেকে ফিরে চিঠিগুলো দেখে ভিরমি খাওয়ার অবস্থা । পিঠের পেশীগুলো আগাম শিরশির করে উঠতো ..

              মা  উঠে ভাতটাত বেড়ে দিতেন। খাবো কি ? টেনশনে মুখ দিয়ে এক গরাস নামছে না। পিটুনিটা কোন ডিগ্রির হবে ভেবে ভেবে আমি আকুল হতাম । কোনোমতে খেয়ে উঠেই কেমিস্ট্রি বই নিয়ে বসে যাই। ওই একটা জিনিসে মাকে শান্ত রাখা যায়। কিন্তু আমার মতো অভাগিনীর কি কখনও রেহাই আছে ? আমার আর ওই ছেলেটার মধ্যে কেমন কেমিস্ট্রি চলছে সেটার উনি নিজে নিজেই একটা ফর্মুলা তৈরি করে ফেলতেন দেখেছি । তারপর ওনার ইকিউয়েশনে পুরো ধোলাইটা চলে। যতো বলি আমি কিছু করিনি ..করবোও না কখনো কিন্তু কে শোনে কার কথা ? মার খেতে খেতে ছেলেগুলোর শ্রাদ্ধ করতাম। ওদের জন্য বিনাকারণে মার খাচ্ছি। আমাকে যে ছেলের পছন্দ হয়েছে তার রুচি সম্বন্ধে বরাবরই আমার অরুচি ছিল। যার এমন মেয়ে পছন্দ তার সাথে প্রেম করাই যাবে না..সংসার তো দুরের কথা। কিন্তু মা বুঝলে তো ? ওনার মতে আমি প্রেম করছি আর ছাড়ছি ..ছাড়ছি আর ধরছি। যত্তসব।

             যাইহোক, মোটকথা হলো আমাকে মার খেতেই হবে। আমি মনে মনে ভাবতাম পাশের জেলের কয়েদীও বোধহয় রোজ রোজ এতো মার খায় না। সবসময় আমার মাথায় অন্তত একটা আলু থাকতো। চুল আচড়াতে ব্যথা পেতাম। মাথার আলু গোনা আমার হবি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বাঁদিকের আলুটা পুরশুর মারের.. ব্যথাটা একটু কমে গেছে। কালকের আলুটাতে বেশ ব্যথা। ডানদিকের পুরোনো আলুটা মিলিয়ে গেছে দেখে খুশী হতাম। আজকে জানি মাথার কোনদিকে আলু গজাবে ভেবে খুব দুঃখ পেতাম । সেই দুঃখে দু’বার বাড়ী থেকে পালিয়েছিলাম …ঠিক পালাইনি মানে ভেগে গেছিলাম …ভাগা ও বলে না ..মানে বেরিয়ে গেছিলাম বাড়ী থেকে। দু’চোখ যে দিকে যায় সেদিকে চলে যাবো। আর ফিরবো না। থাক্ মা ওনার পেয়ারের ছোটমেয়েকে নিয়ে। হনহন করে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গলির মুখে এসেই মনে হতো…এই রে , কোথায় যাবো ? সেরেছে, রোয়াব দেখিয়ে তো বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলাম..এখন উপায়? আর তো ফিরে যাওয়ার মুখ নেই। রাত হলে আমি কোথায় থাকবো ? হাতে এক পয়সা নেই যে ফাইভ স্টার হোটেলে একটু আয়েশ করবো। সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকের রাস্তা ধরে মাসীর বাড়ী চলে যেতাম। গিয়েই অ্যানাউন্স করতাম…এই জীবনে আর বাড়ী ফিরবো না। তোমাদের বাড়ীর এক কোণায় আমাকে স্থান দাও। দাসীবৃত্তি করে বাকী দিনগুলো কাটিয়ে দেবো লেকিন উস ঘরমে কভি নেহি। দাদাও আমাকে আদর করে আস্কারা দিতেন..আর যাবি না ওই বাড়ী । কাল গিয়ে তোর সব জামাকাপড় বইপত্র নিয়ে আসবো। ছোটমাসী ইয়ার্কি পেয়েছে নাকি? ফুলের মতো এমন মিষ্টি আমার বোনটাকে মেরে মেরে শেষ করে ফেললো ? আমিও আহ্লাদে আটখানা হয়ে দুচারদিন মাসীর বাড়ী থেকে যেতাম। কিন্তু আমি  এমন নির্লজ্জ ..দুদিন যেতে না যেতেই মায়ের জন্য মনটা হুহু করতো। মাসীর বাড়ীর এতো আদর আর সহ্য হতো না। মারধরের উইথড্রল সিম্পটম বোধহয় একেই বলে । দু’চারদিন পিঠে পড়েনি তাই কেমন খালি খালি লাগতো…মনটা উদাস উদাস থাকতো। দাদা কিছুদিন বাদে নিজে মায়ের কাছে পৌঁছে দিতেন। বাড়ীতে যখন মাথা নীচু করে লজ্জা লজ্জা মুখে ঢুকতাম মনে হতো আমি যেন নববধূ ।

              এখন তো আমি প্রচুর বড়। অভিজ্ঞতা বেড়েছে। মা হয়েছি। মেয়ে বড় করেছি। এখন আমি মায়ের তখনকার মানসিকতা বুঝি। কেন মারতেন বুঝি। বোন তেমন মার খায়নি কেন সেটাও বুঝি। সব বাচ্চা একরকম হয়না। এক ফর্মুলা ধরে  বাচ্চা বড় করাও যায়না। যেমন কুকুর তেমন মুগুর ব্যবহার করতে হয়। আমাদের বাবা ছোটবেলায় মারা গেছেন। মা একা হাতে দুই মেয়েকে বড় করেছেন। এবার একখানা পিস যদি সর্বক্ষণ গল্প আড্ডাতে মজে থাকে, পড়াশোনায় মন না থাকে, কথা না শোনে, কাজ ঠিকমতো না করে, জানালায় দাঁড়িয়ে লোকজনকে সিটি মারে, ঢিল ছোড়ে তাহলে কোন মায়ের এত ধৈর্য্য যে মেয়েকে আদর করে আজকালকার বাচ্চাদের মতো বুঝিয়ে বুঝিয়ে বড় করবেন ? আমি নিশ্চয়ই এমন কিছু করতাম যা মায়ের আর সহ্য হতো না ? আমাকে মেরে মাও নিশ্চয়ই তেমনি দুঃখ পেতেন যেমন মিতুককে একটা চড় মেরে আমি পেতাম? এখন মনে হয় মা আমাকে মেরেছেন বেশ করেছেন নইলে জীবনটা সত্যি সত্যি দাসীবৃত্তি করেই কাটাতে হতো।

আমার মা জিন্দাবাদ ।

ছবি: টুটুল নেছার