বাচ্চার কথা চিন্তা করে হলেও সয়ে যাও

তামান্না সেতু

‘বাচ্চার কথা চিন্তা করে ওই খারাপ মানুষটাকে মেনে নিয়েছিলাম।’ – বেশিরভাগ নারী পুরুষের মুখে শোনা সংসারে ভুল সঙ্গিকে সয়ে যাওয়ার কারন হিসেবে বলা সর্বোচ্চ ব্যবহৃত বাক্য।

বিয়ের পর বছর ঘুরে গেলেই ভুল সঙ্গিকে বদলে নেয়ার কথা এখানে ভাবা যায় না। লোকে বলে, ‘শুরুতে বোঝ নাই? একটা বছর পাড় হয়ে গেছে যখন বাকী জীবনটাও দাও পাড় করে’! একটা বাচ্চা হয়ে গেলে তো কথাই নাই। ‘বাচ্চার কথা চিন্তা করে হলেও সয়ে যাও’- এই লাইন শুনেই মেনেই দেখেই শিখেই জীবনটা পার করে প্রায় সবাই।

বিয়ের ৬ বছর পর আমি যখন বিবাহবিচ্ছেদ করলাম ৬ বছরের সঙ্গির সঙ্গে, মাথায় বাজ পড়েছিল পরিচিতদের। না পড়ে উপায় কী! আমি তখন দুই ছেলের মা। পরিচিতাদের প্রথম প্রশ্নবান, ‘সে যে খারাপ আগে বুঝো নাই? দুই ছাওয়াল জন্মাইয়া এখন বুঝলা?’
না, আমি আগে বুঝিনি। বিয়ের পর প্রথম ২টা বছর বোঝা না বোঝায়, ভালোলাগা না লাগায়, আশায় হতাশায় মিলেমিশে কেটে গেছে। বুঝিনি কিছু। তার ভেতরেই তো আরাফ এলো। আরাফের জন্মের পর একেকবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এক সঙ্গে না থাকার। নানান ভয়, পাশে আত্নীয় বন্ধু না থাকায় একা সাহস করে উঠতে পারিনি। নিজেও দুর্বল ছিলাম শিক্ষায়, সাহসে, সিদ্ধান্তে৷ ধ্রুব হবার পর একটা কথা মনে এলো একদিন, বলতে পারেন উপলব্ধি, তার ওপর ভর করে ঘর ছাড়লাম!

আমি এবং আমার সঙ্গির ততদিনে একে অন্যের ওপর সম্মান, ভালোবাসা, বিশ্বাস ফুরিয়েছে। হ্যাঁ, শেষ তেলটুকু ফুরাতে ৬ বছর লেগে গিয়েছিল। কেউ কারো সঙ্গে মার্জিত আচরন করতে পারছিলাম না, সম্মান করতে পারছিলাম না। তাঁর শক্তি ছিলো, সে ফুঁসে উঠতো। আমার ছিলো না শক্তি তাই কাঁদতাম।
একদিন শুধু মনে হলো, আমার সন্তান যা দেখছে তা দেখে কোন শিশু সুস্থভাবে বড় হতে পারে না। শক্তির ব্যবহার দেখছে, সয়ে যাওয়া কান্না দেখছে, অসম্মান দেখছে! শুধু দেখছেই না শিখছেও তো! এটা হতে পারে না।
মনে হলো, আমি যদি নিসন্তান হতাম তবে হয়তো মা বাবার সম্মান বাঁচাতে সয়ে যেতামও। সন্তান হয়ে মা বাবার সম্মান রক্ষার ভার নিয়ে নিজের জীবন নষ্ট করার বোকা সাহস করা যায়। কিন্তু মা হয়ে জগতের কাছে নিজেকে এক স্বামীর স্ত্রী হবার বোকা গর্ব করে নিজের সন্তানকে একটা অনুচিত পরিবেশে বড় করার বোকামি আমি করতে পারি না। মায়ের জোর অনেক, দায়িত্ব অনেক, সন্তানের কাছে কমিটমেন্ট অনেক৷ মেয়ে হয়ে নরম হওয়া যায় হয়তোবা কিন্তু মা হলে শক্ত না হয়ে উপায় নাই৷

লোকে আমাকে বললো, ‘বাচ্চাগুলা বাপের ছায়া পাইলো না, এইটা কী তাদের জন্য ভালো হইলো?’
আমি বললাম, বাচ্চার জন্য একজন অসুস্থ বাবা বা একজন অসুস্থ মানসিকতার মা বা মা-বাবার সম্মিলিত অবস্থানে অসুস্থ পরিবেশ পাবার থেকে একটা সুস্থ পরিবেশ বেশি দরকার। সেই পরিবেশ সে যেখানে পাবে সেখানে থাকবে৷ সেইটা মা হইলে মা, বাপ হইলে বাপ, বাপ মা কেউ না হইলে অন্য কোন সুস্থ মানুষের দুয়ার, প্রয়োজনে কোয়ালিটির এতিমখানাও! কিন্তু অসুস্থ পরিবেশ না।

মা-বাবা মিলে সন্তানকে সুন্দর পরিবেশ দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো। যদি না পারে তবেও গোড়ামি করে খারাপ বাবা মার কাছে বাচ্চাকে ফেলে রাখার ইমোশন ভুল।

হাজার হাজার কাপল নিজেদের ভেতর ভালো নাই। তারা মারামারি করে, গালাগালি করে অথবা এক পক্ষ সয়ে যায় চুপ করে! কেন? কারন, বাচ্চা মা-বাবার সঙ্গে একসঙ্গে থাকবে! এই একসঙ্গে থাকা বাচ্চাকে কী শেখায়? কী দেয়? কী পায় তারা?

তারা সম্পর্কের সবথেকে খারাপ অংশ দেখে শিখে বড় হয়। তারা অসুস্থ শৈশব নিয়ে বড় হয়। তারা সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়। তারা ভালোবাসতে ভয় পায় এবং তারাও ভবিষ্যতে একটি অসুস্থ পরিবেশে নিজ সন্তানকে বড় করে প্রথার অংশ হয়ে!

আমি এই প্রথা ঘৃণা করি। আমি বিশ্বাস করি, মৃত মা-বাবার সেই সন্তানটি সুযোগ্য সুন্দর মানুষ হতে পারে যে সুন্দর পরিবেশে নানুর কাছে বড় হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না, সেই সন্তানটি সুস্থ সুন্দর ভাবে বড় হয় যে রোজ ঝগড়া করে মা বাবাকে এক ঘরে থাকতে দেখে তাদের সঙ্গেই বাস করে।
আমি এও বিশ্বাস করি, আমি একবার জন্মেছি। সুন্দর একটা জীবন কাটাতে ঈশ্বর আমাকে বার বার পাঠাবেন না এ জগতে। আমার বেঁচে থাকার, ভালো থাকার, হাসার অধিকার আছে। আমি মৃত্যুর আগের দিনও যদি মনে করি, একটা দিন আমি এভাবে না ওভাবে কাটিয়ে ভালো থাকবো, তবে আমি তাই থাকবো। শুধু আমার সেই থাকাতে জগতের ক্ষতি যেন না হয় সেটা লক্ষনীয়।

আমি বিশ্বাস করি, সন্তানকে ভালো রাখতে বাবা মায়ের নিজেদের ভালো থাকাও জরুরী। একজন অপুষ্ট মা যেমন সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারে না ঠিক তেমন ভাবেই একজন অসুস্থ মনখারাপ করা অসুখি বাবা মাও সুস্থভাবে সন্তানকে বড় করে তুলতে পারে না।

খুব খারাপ শোনালেও যা বলতে চাই তা হলো, সন্তানের কল্যানের কথা ভেবে অসুস্থ সম্পর্ক বয়ে বেড়ানোকেই আমি সন্তানের সর্বোচ্চ ক্ষতি মনে করি।

ছবি: তামান্না সেতু