রমনা পার্কের আনন্দ…

কাকলী আহমেদ

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

কাকরাইলের আমাদের এই বাসার হোল্ডিং নম্বর ছিল ৭৯। এখন কাকরাইলের এই বাসার সামনে দিয়ে যাবার সময় তাকালে বিরাট এক গাড়ির শো রুম ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। বড় বড় গাছ, বিরাট খোলা জায়গা সব অদৃশ্য হয়ে গেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যেন সব। কাকরাইলের বড় রাস্তার উপরে সেই বাড়ি তো দূরে থাক, নিজের শৈশবের সুখ চক চকে সেই দিনগুলোর কিছুই খুঁজে পাই না এখন। খুব বেশি দিন তো নয়,অথচ সব পালটে গেছে। বাতাসে অল্প স্বল্প গন্ধ রয়ে গেছে বটে। মনের আয়নাতে সব প্রতিচ্ছায়া ঝকঝকে আছে কেবল। কিন্তু সেই বাড়ি ঘর, গাছপালা, টিনের দরজা কিচ্ছুটি নেই। সব যেন মন সিন্দুকে খুব দামি ধন সম্পদ হয়ে রয়ে গেছে। সিন্দুকের ঝাঁপি বন্ধ করে তালা এঁটে রাখা। মাঝে মাঝে ঝাঁপি খুলে কেবল দেখা। আর মন হাতড়ে সেদিনগুলির মাঝে উথাল পাথাল সাঁতার কেটে ফেরা।

কাকরাইলের খুব কাছে রমনা পার্ক। আমার মা সব সময় বিশ্বাস করতেন লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটালে তা ওই শিশুটির পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে। আমরা মাসে এক দুই দিন বিকেল বেলা আকলিমার সঙ্গে রিক্সায় করে রমনা পার্কে যেতাম। আম্মা যাবার আগে বার বার করে সাবধান বানী আউড়ে দিতেন অজানা, অচেনা কারো সঙ্গে যেন কথা না বলি। কারো হাত থেকে যেন চকলেট, লজেন্স না খাই। বিশেষ করে মুনিয়ার দিকে খেয়াল রাখতে বলে দিতেন।
মুনির ভাইয়ার সঙ্গে আমরা এবার গেলাম রমনা পার্কে।বড় ভাইয়ের সঙ্গে গেছি এমনই একটা ভাব। এবার যেন গায়ে অনেক বেশি জোর। বাচ্চাদের দোলনা, সি-স,স্লীপার খেলার জায়গাটায় বাচ্চারা ছাড়া অন্যদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। আলো, আমি আর মুনিয়া ঢুকে গেলাম। মুনির ভাইয়া পার্কের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমাদের সে কি ফুর্তি। অন্য সময় আকলিমার সঙ্গে এসে আমরা অনেক মজা করলেও, একজন বড় ভাইয়ের সঙ্গে আসায় মনে যেন অনেক বেশি শক্তি। অতিরিক্ত সময় কাটিয়ে দিলেও কোন ক্ষতি নেই এমন ভাবসাব। আলো ছিলো কিছুটা ডানপিটে ধরণের। অন্যান্য ছেলেমেয়েদের হটিয়ে দিয়ে দোলনা দখলে নিয়ে নিতো নিমিষেই। আসলে রমনা পার্কে যতগুলি দোলনা ছিল তার দুই তিনটি থাকতো ভাঙা। রক্ষণাবেক্ষণের দিকটি ছিলো খুব খারাপ। যত বাচ্চা রমনায় বিকেলে জড়ো হতো সে তুলনায় দোলনা,সি-স এর সংখ্যা ছিলো অপ্রতুল। ফলে অনেক শিশুরাই খর রোদে বিকেলের আগেই সেগুলো দখল করে নিতো। আলো রীতিমতো যুদ্ধ করেই তাদের হাত থেকে আধ ঘন্টার জন্যে নিজ দখলে আনতো। আমি দোলনায় উঠলে আলো ধাক্কা দিতো। মুনিয়া ছিল নেহায়েত ছোট। আলোর কোলে বসেই কেবল সে দোলনায় উঠতে পারতো।
রমনার দোলনা,সি-স, স্লিপারের খেলার জায়গা থেকে বের হয়ে আমরা খালি মাঠে দৌড়াতে থাকতাম। মুনির ভাইয়া পুরো সময় আমাদের দেখে রাখতো। বাদাম ওয়ালার কাছ থেকে ঠোঙ্গায় করে চার আনা করে এক এক জনকে একেক প্যাকেট বাদাম কিনে দিতেন। বাদামের চাইতে আমার কাছে ঝাল দেয়া লবন ছিল আরো প্রিয়। বাদাম শেষ করে হাতের তালুতে লবন নিয়ে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে চুক চুক করে শুধু লবন খেতাম। আজো মনে মনে ভাবি এই লাল মরিচ মাখা লবনে কি এমন স্বাদ ছিল। সব ছাপিয়ে জীবনের এই লগ্নে এসে কেবল সেই লবনের কথাই বার বার মনে পড়ে। এখনো বাদাম খাবার সময় রমনা পার্কের সেই বাদাম আর ঝাল লবনের কথা মনে পড়ে কেবল।
সপ্তাহে দুই দিনের জায়গায় রমনায় বিকেলে বেড়াতে যাওয়া আরেকটু বেড়ে গেল। কারণ মুনির ভাইয়ার কারণে। আম্মা নির্ভরতা পেতেন। মুনির ভাইয়াও আমাদের নিয়ে এক আনন্দঘন সময় কাটাতেন।রমনা পার্কে নানা রঙের বেলুন ওয়ালা ঘুরে বেড়াতো। বাড়ি ফেরার সময় আমাদের তিন বোনের হাতেই থাকতো তিনটে বেলুন। আম্মা মুনির ভাইয়াকে যাওয়া আসা বাবদ আর সেই সঙ্গে আরো কিছু বাড়তি টাকা পয়সা দিয়ে দিতেন। যদিও প্রতি দিনই মুনির ভাইয়া এর বাইরেও বেশ কিছু টাকা খরচ করে ফেলতেন। আম্মা টাকায় হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করলে, মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিতেন। আমরা ঠিকই বুঝতাম, মুনিয়া বার কয়েক বাদাম খেতে চাইলে মুনির ভাইয়া কখনোই তা মানা করতেন না।(চলবে)

ছবি: গুগল