শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি

মৌসুমী দাশগুপ্তা

বাহ্! আজকের সকালটা একদম ঝকঝকে। এমন সকাল দেখলে চা ছাড়াই ঘুমঘুম ভাবটা চলে যায়।পাতলা কার্ডিগানটা চাপিয়েই বের হলাম আজ, ওভারকোট নিলাম না। ওমা! একি! গাড়ি কুয়াশায়ভেজা, ঘাস কুয়াশায় ভেজা, রাস্তার ওপারের বাড়িটা পর্যন্ত কুয়াশা মোড়ানো। বেশ একটু শীত শীতকরছে এবার।দ্রুত গাড়িতে ঢুকে হিটিংটা চালু করে দিলাম, আর ওয়াইপার দুটোও৷ উইং মিরর মুছতেদেরী হয়ে যাবে বলে জানালা দুটো দিলাম অল্প নামিয়ে। কুয়াশা ভেজা ঘাসের গন্ধটা কি যে ভাললাগছে!

মন চলে যাচ্ছে অন্য কোন ভোরে। সেই ভোরে গাড়ি ছিলো না, কাজ ছিলো না, তাড়া ছিলো না। সেই ভোরেপেনি ফ্রক পড়া একটা বাচ্চা মেয়ের ঘুম ভাঙ্গতঠাকুরমার গুনগুন কীর্ত্তনের সুরে –

‘রাই জাগো, রাই জাগো, শুকসারি বলে!

কত নিদ্রা যাও গো রাই, কালো মানিক্যের কোলে!!’

চোখ কচলে উঠে বসে মেয়েটা চটপট মুখে চোখে জল ছিটিয়ে নিত। তারপরই বাটার চপ্পলজোড়া পায়েগলিয়ে, ফুলের সাজি হাতে একছুটে শিউলী তলায়! চামড়ার জুতো পরে পূজোর ফুল তোলা যাবে না, তবে রাবারের চপ্পল চলতে পারে।

সেই কুয়াশামাখা স্বপ্নের ভোরে সবুজ ঘাসের উপর সারা রাত ধরে ঝড়ে পড়া সাদা আর কমলা শিউলীফুল বিছিয়ে থাকতো, যেন খুব দামি একটা গালিচা! কি বুক জুড়োনো গন্ধটা! আলো তখন কেবলই ফুটছে! বাগান জুড়ে জেগে উঠছে জবা, স্থলপদ্ম, টগর, কাঞ্চন। বেলী, কামিনী আর দোলনচাঁপার সময়প্রায় শেষ তখন।রঙ্গনের রাজত্বি প্রায় সারা বছরই থাকে, আরও আছে নীলকন্ঠ আর নীল অপরাজিতা। কত কত ফুল! সাজি ভরে উঠতে দেরী হয় না। শিউলীর সাজি আলাদা, ভারি নরম ফুল ওরা।এদেশের লোক এত বাগান প্রিয়! ঠাকুরমার সেই ফুল বাগান দেখলে ওরা খুশীতে পাগল হয়ে যেত নিশ্চয়ই৷ আর গাছের ডালে ডালে কত কত পাখি! বউ কথা কও, ময়না, চন্দনা, শালিক, আরজীবনান্দীয় ‘ভোরের কাক’ তো আছেই। রঙে, সুরে, স্বপ্নের মত ভোরগুলো!  ফুল কুড়োনো শেষে ঘরে ফিরে মালা গাঁথার পালা।স্কুলে পূজোর ছুটি চলছে, তাড়াহুড়োর কিছু নেই।মালা গেঁথে, ঠাকুরমার পূজোর চন্দন ঘষে দিয়ে তারপর মেয়েটা খেতে যায়।মুড়ির মোয়া, নারকেলসন্দেশ, বাসি লুচি, কত কত মজার খাবার! একঘেয়ে পাউরুটি আর কর্ণফ্লেক্স এর সকাল নয় সেগুলো।
খাওয়া শেষে বাবার কাছে বসে একটু পড়ো, বা অংক করো আর দশটা এগারটা বাজতেই স্নান সেরে নতুনজামা পরে পূজো দেখতে বেরিয়ে যাও।দুপুরে বাসায় ফিরে অমৃত স্বাদের নিরামিষ দিয়ে ভাত খেয়ে গল্পেরবই হাতে বিছানায় গড়াও আর সন্ধ্যেয় আবার পূজামন্ডপ, ধিতাং ধিতাং ঢাক, মাদলে আর করতালেবোল, ধূপের ধোঁয়া, পঞ্চপ্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল প্রতিমা।
তখন ছিলো না কাজের তাড়া, মর্টগেজের দায় অথবা রোজকার হেঁশেল সামলানোর চিন্তা।অনাবিলআনন্দের সেই ভোরগুলোর নাম ছিল শৈশব।

মিষ্টি সেই দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে দেখি পৌঁছে গেছি কাজের দোরগোড়ায়। শৈশব হারিয়ে গেছে, হারিয়েছে শিউলী, তবু আজও আছেকুয়াশা মোড়ানো শরতের সোনালী সকাল।এমনকি সাত সমুদ্র, তের নদীর পারে বিলেতের মাটিতেও সে সকাল উঁকি দিয়ে যায় কখনও কখনও।সে সকালে মিশে থাকে আগমনীর সুর আর ঘাস-চন্দনে মাখানো ঠাকুরমার গায়ের মিষ্টি গন্ধটা!

ছবি: তামান্না সেতু ও তারেকুল ইসলাম