জীবন যেখানে যেমন

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

ঝড়ের মুখে প্রদীপ যেমন পুরো সময়ই নিভু নিভু থাকে এবং তাকে যেমন হাতের তালুর আড়াল করে জ্বালিয়ে রাখতে হয় ঠিক তেমন করেই বাবা আমাকে জ্বালিয়ে বা সচল করে রেখেছেন বা রাখছিলেন অথচ সেই বাবা আমার নিজেই কেমন যেন নিস্প্রভ হয়ে গেলেন। আমার এই নতুন অজানা ধরনের জীবনের পদচারণায় বাবাকে আর আগের মত খুঁজে পাচ্ছিলাম না।বাবা খুব নিরবে সত্যি সত্যিই খুবই দূরে চলে গেলেন। আর মা এই  `নতুন’ আমার কাছ থেকে কি চান আমি কিছুতেই বুঝতেই পারছিলাম না।তবে এটা ঠিক কথা আমি বড়ই একা হয়ে গেলাম। পড়াশোনার ও খুব অসুবিধা হতে লাগলো। মাদারটেক থেকে ভিকারুননিসা কলেজে আসা যাওয়া দূরহ ব্যাপার হয়ে যাচ্ছিলো। শশুরবাড়ি শান্তিনগর কিন্তু আমি তখনও সেখানকার বাসিন্দা নই।এর মধ্যেই জীবন চলছিল। জীবিকা হিসেবে গান শিখাচ্ছিলাম।বিটিভি, রেডিওতে গান বাবদ দু’জন মিলে হয়তোবা শ’পাঁচেক টাকাই আমাদের সম্বল।ওই দিয়েই জীবন কাটছিল ধুঁকে ধুঁকে।এভাবেই একসময় শশুরবাড়ির বাসিন্দা হলাম বলা যায় জোর করেই।এই মুহূর্তে ভাবতে সেই জীবন খুবই ভয়াবহ লাগছে। তখন কিন্তু ওতো ভয় একদমই পাইনি।জীবন, জীবনের স্বচ্ছলতা নিয়ে তখনও আমার চিন্তা ছিলো না, এখনো নাই।আমার মা বলেন এটা নাকি ভাবনার প্রতিবন্ধকতা। হতেই পারে।মা-বাবা যেমন কন্যাকে পাত্রস্থ করতে মেয়েজামাইয়ের আয় উপার্জন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন তেমন কন্যার নিজের ও একটা ভাবনা বলা যায় দুর্ভাবনা থেকেই যায় বা থাকাই উচিত। আমার সেসব চিন্তা কখনোই ছিলোনা। বলা যায় আমি এসব ব্যাপারে সারাজীবনই নির্ভার! এবং এই ভাবনাবিহীন জীবন ভালো না খারাপ তাও কখনোই ভাবিনি এবং ভাবিনা।এ আমার স্পষ্ট উচ্চারণ! গান শেখাতে গিয়ে দেখলাম আমি ওস্তাদজীর কাছে যা শিখেছি তা খাতায় একটু এলোমেলো অবস্থায় সংরক্ষিত। গান শেখানোর প্রয়োজনে তা নতুন খাতায় গুছিয়ে নিলাম।শেখাতে গিয়ে দেখলাম এক সপ্তাহে ওস্তাদজীর কাছে যা শিখেছি একজন শিক্ষার্থীকে শিখাতে তিনমাস লাগছে।তারা এর চেয়ে দ্রুত শিখতে পারছেই না।আমাকে ওস্তাদজী কি করে এত হোমওয়ার্ক চাপিয়ে দিতেন আল্লা-ই মালুম। সব কিছুরই ভালো মন্দ আছে।ওস্তাদজীর কাছে তোতা পাখির মতো যা শিখেছিলাম তা নিজেই আবার শিখছিলাম।কারণ যাদের শিখাচ্ছি তাদের শিখাতে গেলে নিজের ভেতরে তারল্য দরকার হয়।তার জন্য পুরো উচ্চাংগ সংগীত এর ভেতরে ডুবে যেতে হয়।একটা খেয়ালের ভেতরে ডুবে যাওয়া এতো সহজ কাজ নয় মোটেই।এ যেন নিজের কাছে নিজেকে আরো পরিশুদ্ধ করার মত ব্যাপার। এই অন্যকে শেখাতে গিয়ে আবার নতুন করে নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম। এটা যে কত বড় উপকার হলো তা বলতেই পারবো না। টিভিতে রেডিওতে গাইছিলাম।জীবনের পয়লা গান ‘এলোমেলো চুল আর ললাটের ভাঁজ’, ‘ অঙ্কুরে জীবন স্বপ্ন দেখোনা’, ‘ সুদূর নীলিমায় তাকিয়ে দেখি’, ‘আমি নই সেই বনলতা সেন’, এগুলো গান বিয়ের আগেই গেয়ে মানুষের মনে ঢুকতে পেরেছিলাম।বিয়ের পর পরই গাইলাম ‘নিলাঞ্জনা নামে ডেকোনা’, ‘পড়লো ঝরে কৃষ্ণচুড়া বৃষ্টি ঝরা বরষাতে’,  ‘বিরহ আমার নদীর মত এঁকেবেঁকে চলে’, ‘জানি আসবে তুমি’।এভাবেই দিন পার হচ্ছিলো।একজন কন্ঠশিল্পী হিসেবে বিয়ের আগে যেভাবে অন্য মিউজিক ডিরেক্টর দের ডাক পাচ্ছিলাম বিয়ের পর ঠিক সেভাবেই ব্রাত্যজন হয়ে গেলাম।জীবনের পয়লা গান বিটিভি তে গাইবার পরই ছবিতে প্লেব্যাক করার জন্য ডেকেছিলেন বাংলাদেশের সুরসম্রাট শ্রদ্ধেয় আলাউদ্দীন আলী।এক সপ্তাহে গাইলাম আট টা গান। শ্রদ্ধেয় মনসুর আহমেদ, আলম খান, আনোয়ার পারভেজ, সত্য সাহা আমাকে দিয়ে আটটা গান গাওয়ালেন পাঁচটি ছবিতে।সেই আমার যখন বিয়ে হলো তারপর থেকেই আমার আর ছবিতে গাওয়া হচ্ছিলো না।প্রথম গেয়েছিলাম ৮৪ সালের জানুয়ারী তে।এর পর আমাকে নিরেট বসে থাকতে হয়েছে ৮৯ সাল পর্যন্ত। কি দোষ তখনও জানিনি।কাউকে জিজ্ঞাসা করার মত স্পর্ধা তখনও ছিলনা, এখনো নাই। এর মাঝে মঞ্চানুষ্ঠান করে যাচ্ছিলাম।ঢাকার বাইরে, ঢাকার ভেতরে। খুব সামান্য পারিশ্রমিকে গাইলেও তা দিয়েই ধীরগতির জীবন ঠিকই চলছিলো। চলে যাচ্ছিলো। জীবন কখনও বসে থাকে না। আমি, আমরা এবং আমাদের সততা অধ্যবসায়, একাগ্রতা, ধৈর্যশীলতা, এবং আল্লাহর উপর ভরসা নিয়েই ছোট্ট একটা জীবন চালিয়ে নিচ্ছিলাম। তখন এমন একটা জীবন ছিলো যেন কুয়াশার মত উপস্থিতি! দেখা যায় কি যায় না।সবার পাশে থেকেও আমরা দুজন ছিলাম বায়বীয়।বাবার বাড়ি, শশুরবাড়ি এবং গানের জগতে। তবে এটাও সত্যি বায়বীয় পদার্থের ও শক্তি আছে, জায়গা লাগে।সময়ে সে শক্তি প্রকট হয়ে উঠতে পারে।আমি এবং আমরা সবার এবং নিজেদের অলক্ষ্যে সে শক্তি অর্জনের পথে খুবই ধীরগতিতে এগোচ্ছিলাম বটে।

ছবি: তারেকুল ইসলাম