যা পেলাম সে আমার সঞ্চয়, যা পেলাম না সে আমার নয়

আনসার উদ্দিন খান পাঠান

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

দেড় বছরের সংঘাত জর্জরিত উত্তর মালির মরুবাস শেষ হলো। আজই আমার শেষ কর্মদিন। হিংসার রক্তে স্নাত এই মরুরাজ্যে এই সময়ে আমি আর আমার ব্লু হেলমেট দল অণু পরিমান প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে পারলেও নিজের শান্তিরক্ষীর তকমা সার্থক।
প্রায় তিন দশক ইউনিফর্মের চাকুরীসূত্রে যুদ্ধদেশে শান্তিরক্ষায় হেন অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা এটি পঞ্চম। পড়ন্ত জীবন উপত্যকায় আরেক স্মৃতির মিনার মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো।
মনে পড়ে, এঙ্গোলায় খরস্রোতা কোয়াঞ্জো নদীর ভাটিতে কালো হাড্ডিসার মানুষের দিনের পর দিন জলের তোড়ে পচন ধরা হাতে হাতে চালুনী দিয়ে বালির স্তুপ নাড়িয়ে চলা,উদ্দেশ্যে হীরের কণা বের করে আনা। দিনশেষে সেই মহামূল্যবান দ্যুতিময় আকর চলে যায় মহাজনের হাত ঘুরে লিসবন বা বেলজিয়ামের কোন কারখানায়,সে তার খবরও রাখে না। সামান্যতম মজুরি নিয়ে সে ফিরে যায় ঘন অরণ্য সাফ করে গড়ে তোলা জীর্ণ কুটিরে। একদিন যুদ্ধে সে হতদরিদ্র আবাসও পুড়ে সাফ হয়, নারীরা হয় ধর্ষিতা, ছেলেশিশুদের জোর করে ধরে নিয়ে যায় যোদ্ধা দলে । সেই রিক্ত মানুষের মাথায় হাত রেখে ভরসা দিতে পেরেছি, তা সে যতো সামান্যই হোক।

কসভোয় প্রিস্টিনার উপকন্ঠে কামানের গোলায় সদ্য মুখ থুবরে পড়া বাড়ির ধংশস্তুপের পাশে বিলাপ করতে থাকা পুত্রহারা বৃদ্ধা মায়ের কথা মনে পড়ে। সে জীবনে কারো অনিষ্ট করেনি, তার অপরাধ সে জাতিতে মুসলিম, অর্থোডক্স খ্রিষ্টান সার্ব বাহিনী তার জাতিকে নিঃচিহ্ন করবে, সেই জিঘাংসার নিরীহ শিকার তিনি। তুমুল বরফ শীতে বুড়িমার হাতটা ধরে নিরাপত্তার আশ্বাসবাণী শুনাতে পেরেছি।

বসনিয়ায় সেভ্রেনিতচার পাহাড়ঢালে সার্ব যুদ্ধবাজ মিলোসভিচ বাহিনীর একরাতে মেরে ফেলা সাত হাজার মানুষের সারি সারি কবর ফলক দেখেছি। সেইসব কবরচিহ্ন আকড়ে ধরে নারীশিশুকে দেখেছি কান্নার রোল তুলতে।পকেট থেকে নিজের রুমাল বের করে সে শোকের জল খানিক মুছে দেবার চেষ্টা করেছি।

চরম অবহেলিত জনপদ দারফুরের কালো মুসলিম জনগোষ্টি কোরআন সুন্নাহর দাবিদার সতীর্থ সুদান সরকারের কাছে স্বাধিকার চেয়েছিলো, শুধু এই অপরাধে জনপদের পর জনপদ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে, পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বসত আর রুজি। ধর্মের বাণী সে সংঘাত থামাতে পারেনি। নিজদেশেই তারা উদ্বাস্তু, কাটাতারের চৌহদ্দিতে আইডিপি ( ইন্টারনেলি ডিস্পলেসড পিপুল) নাম নিয়ে পশুর মত জীবন কাটাচ্ছে।তাদের কাছে সাহায্যের খাদ্যবাহী খানকয়েক যান পাহারা দিয়ে পৌছে দিতে পেরেছি, অস্ত্রহাতে ঠায় দাঁড়িয়ে হায়েনার শ্যোনদৃষ্টি আটকে দিয়েছি ক্ষণিক সময়ের জন্য হলেও।

একদিকে যুদ্ধ আরেকদিকে মরু-খরার শিকার চরমতম দরিদ্র বুভুক্ষু উত্তরমালির অপুষ্ট শিশুর মুখে তুলে দিতে পেরেছি একটুখানি খাবার আর ঠান্ডা জল।

সবমিলে অর্ধযুগের বেশী এই অভিজ্ঞতাই আমার মানবজনমের প্রাপ্তি। শোক নিয়েও আমি তৃপ্ত, এর স্মৃতি আমার অপার গর্বের ধন।’ যা কিছু পেলাম সে আমার সঞ্চয়, যা কিছু পেলাম না সে আমার নয়।’

এবার তবে ফিরে যাই স্বদেশে। ব্রম্মপুত্র-কংশ-সোমেশ্বরী বিধৌত গারোপাড়ারের পলিতে গড়ে উঠা আমার জন্মভিটায়। শেকড় কেবলি টানে। সেখানে সবুজ ঘাসের তলায় ঘুমিয়ে আছে আমার পূর্বপুরুষ, বর্ষা-বসন্ত-শীতে পালা করে ফোটে শিমুল জারুল শিউলি আর কদম। ডাহুক দোয়েল কোকিল ফিঙে অণুক্ষণ গান গায়। বাতাসে ভেসে আসে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। নদীর জলে ঢেউ কেটে ছলাৎ ছলাৎ এগোয় ডিঙি। বিলের স্বচ্ছ জলে মাথা দোলায় শাপলা-শালুক।পড়ন্ত দিনে পশ্চিম আকাশ সাজে অদ্ভুত রঙের ছ্বটায়। সন্ধ্যায় আকাশে লক্ষ পিদিম জ্বলে। জীবন উদযাপন আর সেই সঙ্গে সময়ের তোড়ে মনের কোণায় জমে ওঠা বেয়াড়া ক্লেদ ভুলবার জন্য জগতে আর কি কোন তীর্থ আছে আমার ?

ছবি: লেখক