শীতকাল কবে আসবে সুপর্না?

সকালবেলা জানালা দিয়ে ঘরে উড়ে আসছে হাওয়ার চাইতেও ফিনফিনে কাশফুলের বিচ্ছিন্ন অংশ। ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে উপচে পড়া রোদ আর হঠাৎ-ই বইতে শুরু করা উত্তরের হাওয়ায়। ঘরের কোণে মাকড়সা বুনতে শুরু করেছে জাল, কোনো বাড়ির অন্যমনষ্ক একমুঠো বাগানে ঝরে পড়ছে নির্জন শিউলি ফুল। ওরা জানে শীত আসছে। শুধু আমরাই জানি না। পাপের মতোন বাড়তে থাকা এই নগরের নাগরিক আমরা জানতেও চাইনা কবে আসছে শীত?
তবুও কোথাও কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। কারো আবছা, মলিন স্মৃতি আর বাড়ি ফেরে না। এই নগরে কোথায় কোন পথের পাশে কারো সঙ্গে দেখা হয় না আর। চেনা চায়ের দোকান ঠিকানা পাল্টে উঠে যায় অন্য কোথাও। শীতকাল কি বিচ্ছেদের স্মৃতি? নীরবতা আর অন্ধকারের অনুভূতি? হয়তো তাই। হয়তো শীত সুখী সময়ের গল্প। অনেক আলো, অনেক উৎসব আর সম্পন্ন সময়ের আখ্যান। সুদিনে তো শুনতে পাই মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সংখ্যা কমে, দীর্ঘ আয়ুর সংখ্যা বেড়ে যায়। সেজন্যই হয়তো কেউ কেউ অপেক্ষা করে থাকে শীতের জন্য। অক্টোবরের উষ্ণ আবহাওয়ায় ভোরবেলা পথে নেমে ডাকে শীতকালকে।  এই সংখ্যা প্রাণের বাংলায় প্রচ্ছদ আয়োজনেও শীতের জন্য সেইসব অপেক্ষার কথা ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?’

  আশ্বিন মাসের প্রায় শেষ ভাগ চলছে এখন। পূজার উৎসব উৎসব গন্ধ চারদিকে। কিন্তু এই থৈ থৈ আনন্দের আবহের মাঝেও আশ্বিনের কোথায় যেন বিচ্ছেদের সুর লেগে থাকে। অকারণে হুহু করে মন। পাতা পোড়ানোর ঘ্রাণ আর দূর থেকে ভেসে আসা পূজার ঢাকের আওয়াজে ফেলে আসা স্মৃতির গল্প গভীর হতে থাকে। তীব্র হতে থাকে শীতের জন্য অপেক্ষা। কিন্তু সেই শীত কোথায় এখন? পৃথিবীজুড়ে উষ্ণায়নের চাপে শীত কোনঠাসা। বাঙালীর জীবনে শীতের সকাল, টেনে নেয়া লেপ, গরম চা, সেলুনের বেঞ্চিতে বসে খবরের কাগজের পাতা উল্টানো, ছাদের রেলিংয়ে শীতবস্ত্র রোদে দেয়া-এসব এখন বিলাসিতা।
বাংলা ক্যালেন্ডার বলে ছয় ঋতুর কথা। এই ষড় ঋতুতে শীতের আগমন বৈচিত্রময়। প্রকৃতি আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাবে বছরের ১২টি মাস ২মাস করে ৬টি ঋতুতে ভাগ হয়েছে। এই ৬টি ঋতু হলো গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। তবে সব ঋতুর প্রাধান্য ও প্রভাব এক নয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত প্রত্যক্ষ আর শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত পরোক্ষভাবে প্রকৃতিতে প্রতিফলিত হয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত আর বসন্ত প্রকৃতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। শুষ্ক চেহারা আর হীমশীতল অনুভব নিয়ে আসে শীত। কিন্তু তারপরেও আশ্বিন মাসে প্রচণ্ড গরমে বসেও সেই শীতের জন্য অপেক্ষার কথা উড়ছে উত্তরের মৃদু হাওয়ায়।
প্রকাশিত এক গবেষণা জানাচ্ছে, শীতকালে পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এক ধরণের মনোরোগ দেখা দেয়। এই রোগের নাম ‘সিজেনাল ইফেক্টিভ ডিজর্ডার’। এই রোগে আক্রান্ত হলে ক্ষুধার অনুভূতি নষ্ট হয় শরীরে। মনে তৈরী হয় হতাশা। আর এই হতাশা থেকে আত্নঘাতী হওয়ার মতো মারাত্নক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে কেউ। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই রোগের অন্যতম কারণ কমে আসা সূর্যের আলো।
সকাল বেলা সূর্যের আলো পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখিরা জেগে ওঠে। পাখিদের শরীর সূর্যের আলো সংবেদনশীল। শীত কালে পাখিরা অনেক দেরি করে ডাকতে শুরু করে । কারণ শীতে সূর্য দেরিতে ওঠে। পাখিদের মতো আমাদের শরীর ও মন আলোক সংবেদনশীল । শীতকালের স্বল্প আলোয় তাই মানুষের মনে ঘর বাঁধে বিষন্নতা।
শীতকাল আসলে ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। শীতের বিকেলে গলিতে ক্রিকেট জমে উঠেছে। একটা মাত্র ভাঙ্গা ব্যাট, বলের অবস্থাও করুণ তবু সূর্যের নিভু নিভু আয়ুতে খেলা ফুরায় না। ডাক ভেসে আসে-বাসায় আসতে হবে না? উত্তরে বলি-লাস্ট ওভার। আজ বাতাসে শীতের ঘ্রাণের হাত ধরে মনে ভেসে এলো কথাটা। শীতে গলির ভেতরে ঘড়বাড়িগুলো গায়ে-গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো আরেকটু উষ্ণতার জন্য। ডেকে যেতো মাঠাওয়ালা, আসতো খবরের কাগজ দরজার তলা দিয়ে। আকাশ হয়ে থাকতো ফটফটে নীল।
এবার রৌদ্রের দহন কমছেই না। আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে, এখনো তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এ মাসের মাঝামাঝি সামান্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু শীতের দেখা এখনই মিলছে না। কিন্তু শীতের জন্য অপেক্ষা করতে তো দোষ নেই। চলে যেতে বাধা নেই মনের ভেতরে সিঁড়ির পর সিঁড়ি টপকে স্মৃতির পাতালপুরীতে। সেই কবে এক শীতকালে সে নির্জন দুপুরে কথা বলেছিলো কারো সঙ্গে। বড় বড় চোখ তার ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছিলো কারো নির্জনতা। আবার শীতেই সে চলে গিয়েছলো সব স্মৃতি ফেলে। তাদের শূন্য বাড়িতে আত্নহত্যা করেছিলো শীতের হাওয়া।শীত কেন যে এতোসব মনে পড়িয়ে দেয় কে-জানে?
কতকিছু মনে পড়ে শীতের শুরুতে। মনে পড়ে পাড়ার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। চাঁদা তুলে নিজেরাই নিজেদের উপহার কেনা, বিকেলে মাঠে একশ মিটার দৌড়, ব্যাঙ লাফ। বেঁচে যাওয়া পয়সা দিয়ে সন্ধ্যায় গরম প্যাটিস।
এখন হালকা কুয়াশার পরত পড়তে শুরু করেছে গ্রামে। ম্লানমুখ, রক্তহীনতায় ভুগতে থাকা রুগীর মতো বিকেল মিশে যাচ্ছে কুয়াশা অথবা পাতা পোড়ানোর ধোঁয়ায়। কতকাল আগে কোনো বাড়ির ঘরে ঘরে জ্বলছে হ্যারিকেন, দূরে কোন পাড়া থেকে ভেসে আসছে কীর্তনের সুর। আকাশে ফুটে উঠছে একটি দুটি তারা। শীত কখনো কখনো বধির করে দেয়। টুপটাপ ঝরে পড়া শিশিরের শব্দ শুধু চারপাশে। শোনা যায় রাত্রিচর পাখিদের ডানা ভাঙ্গছে শীতরাতের মৌনতা। জীবনানন্দ দাশ বোধ হয় এমনি সব রাতের কথা ভেবে লিখেছিলেন: ‘এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;/ বাইরে হয়ত শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা।’
শীতের পাঁচালী অনেকদূর পর্যন্ত ছড়ানো। সকালবেলা কাশফুলের ছিন্ন মঞ্জুরীকে ডাকে যে উত্তরের হাওয়া তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আসতেই হয় শীতকে।
পশ্চিম বাংলার কবি ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছিলেন-‘‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্না?’’ জানা হয়নি কবির সেই মৃদু প্রশ্নে ট্রেনে অথবা পায়ে হেঁটে শীত ফিরেছিলো কি না চায়ের দোকানের গরম ধোঁয়া ছাড়তে থাকা কেৎলি, নরম বিস্কুট আর রাতের কুয়াশামাখা নির্জন পথ ছুঁয়ে। শীত তো আর এই শহরে ডাকলেই আসবে না। তার জন্য কত আয়োজনের মালা তো পথে পড়ে থাকে অবহেলায়। আশ্বিনের গরমে পিচ গলার উপক্রম, গুমট হাওয়া মনে করায় ভাদ্রের কথা। তাহলে সুপর্নাই কি শীতের ঈশ্বর? সুপর্না চাইলেই শীত নামবে? বাংলা ভাষার কবির সেই সুপর্না এখন কোথায় থাকে, সাইবেরিয়া অথবা ফিনল্যান্ড? যেখান থেকে সে আমাদের শীতকথা তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না?
ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার আগে গত শীতে যে পরিযায়ী পাখিটা নিবিড় প্রতিশ্রুতি রেখে গিয়েছিলো, এবার নিশ্চিত আসবে সে। আরও গভীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসবে। গত শীতে পিকনিকে প্রেমিকাকে ছুঁতে চাওয়া হাত এবার হয়তো সফল হবে। কারো না কারো সঙ্গে হয়তো এই শীতে দেখা হলে বিস্ময়কে দাঁড় করিয়ে রেখে পার্কে বসবে কেউ। কড়া চিনি দেয়া দুধ চা নিয়ম ভেঙ্গে ঢুকে পড়বে গল্পে, হাই তুলবে পথের কুকুর গভীর আলস্যে। বিক্রি হবে শীতের পোশাক, আলো ঝলমল কেকের দোকান সেজে উঠবে বড়দিনে। শীতের প্রেমিকদের সীমাহীন অপেক্ষা। অপেক্ষা আছে বলেই মুহূর্তরা আসে। চারপাশে রেখে যায় অনুভব। অনুভূতিমালা শীতকথা হয়ে আরও একবার ফিরে আসে। আসে বলেই শীতকাল এত সুন্দর।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ প্রাণের বাংলা