পাখিবাগান এবং মিষ্টি কুমড়োর গল্প

রবিশঙ্কর মৈত্রী

আমি নিরামিষবাড়ির মানুষ। ছোটো থেকেই মিষ্টি কুমড়ো ছিল আমার খাদ্যসঙ্গী। কুমড়ো শাক, কুমড়ো ভাজা, কুমড়ো সেদ্ধ, কুমড়োর লাবড়া-সহ আরও কতোভাবে যে আমরা কুমড়ো খেয়েছি তা ভুলেই গেছি। কুমড়ো পাতার সঙ্গে মুগডালের ঘনঘটা এখনও আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি।
কী ভাগ্য আমাদের… ফ্রান্সে নির্বাসিত হয়েও কুমড়ো-বঞ্চনা ঘটেনি। ফ্রান্সের আলেসে আমরা এবার চতুর্থ বার বাগান করেছি। ঢাকার পাখিবাগানের ধারাবিহকতায় ছেদ পড়েনি।
ঢাকায় সেন্ট্রাল রোডে লেখক মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের বাড়ির চার তলায় আমরা ভাড়া ছিলাম প্রায় ছয় বছর। আলমগীর ভাই একসময় তাঁদের ছয় তলা বাড়ির প্রায় সকল দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমাকে। আমি মানিকগঞ্জ সাভার বেলাব এবং শেরেবাংলানগর থেকে মাটি গোবর এবং গাছ সংগ্রহ করে সেই বাড়িতে বাগান করেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম পাখিবাগান। আমার স্ত্রী নীলু রায় মৈত্রীই মূলত বাগান পরিচর্যা করতো। নীলুকে সহযোগিতা করতো বাড়ির কর্মী আল-আমিন। ঢাকায় ছাদে আমাদের বাগান নিয়ে পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছিলো। আমরা মাঝে মাঝেই পাখিবাগানে আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে নিয়ে গানবাজনা আবৃত্তি আর খাওয়া-দাওয়া করতাম। আমাদের গাড়ি-চালক শিল্পী হামিদুল ইসলাম সে-সব আয়োজনের পুরোভাগে থাকতো।
২০১২ সালের বর্ষায় পাখিবাগানের রূপ ফেসবুকে দেখে সুইডেনপ্রবাসী আলমগীর ভাইয়ের অকাল-আগমন ঘটেছিলো। তিনি সাধারণত বইমেলার আগে ঢাকায় আসতেন। সেবার পাখিবাগান তাঁকে বর্ষাকালেও ঢাকায় টেনে এনেছিলো।
২০১৪ সালের ২৬শে অক্টোবরে দেশত্যাগ অনিবার্য ছিলো। আমরা ইতালি হয়ে ৯ই নভেম্বর প্যারিসে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করি। ছ‘মাস প্যারিসবাসের পর আমাদের আবাসন নির্ধারণ হয় দক্ষিণ ফ্রান্সের আলেসে।
আলেসে আসার পরই আমরা প্রফেসর লেতমাসের মাধ্যমে সেসেআসের বাগানের সঙ্গে পরিচিত। নীলু শখ করে লেতমাসের সঙ্গে একটি প্লটের দায়িত্ব নেয়। জারদিনিয়ে ফেদেরিক নীলুকে ফরাসি দেশের বাগান পরিচর্যার খুঁটিনাটি শিখিয়ে দেয়। আমরা একটা বাগান পেয়ে প্রবাসজীবনে নতুন আনন্দলাভ করি। কিন্তু হায়, কী দুর্ভাগ্য, ২৪শে নভেম্বর ২০১৫ তারিখে নীলুর ফুসফুসে টিউমার ধরা পড়ে। অপারেশন করে টিউমার অপসারণের পরে নীলু শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে। বারোটা কেমোথেরাপির তিন মাস পর গত ১৪ই মে ২০১৭ তারিখে সে আমাদের ছেড়ে চলে যায়।

নীলুকে মনে রেখে প্রফেসর সিলভির সহযোগিতায় আমি আর জলি আলেসে পাখিবাগার অব্যাহত রেখেছি। এ বছর আমাদের বাগানে নানান ধরনের মিষ্টি কুমড়ো হয়েছে। বেগুন, টমেটো, আলু, পেঁয়াজ, ডাঁটা, ধুন্দল, লাউ, ঝিঙে, পুঁইশাক, মিষ্টিআলু, ধনেপাতা, সূর্যমুখী-সহ ফুলও ফুটেছে মহাসমারোহে।

মিষ্টি কুমড়ো খেলে কী হয়?

মিষ্টি কুমড়ো ভিটামিন এ, বি-কমপ্লেক্স, সি এবং ই,পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, জিঙ্ক, ফসফরাস, কপার, ক্যারটিনয়েড এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমূহের ধারক। এছাড়াও বিটা-ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ এই মিষ্টি কুমড়ো আমাদের দেহের ক্যান্সার প্রতিরোধক কোষ গঠন করে।

নিয়মিত মিষ্টি কুমড়া খেলে শরীরে রোগ ব্যাধির সংক্রমণ কমে যায়।
এক কাপ পরিমাণ রান্না করা মিষ্টি কুমড়ো চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

মিষ্টি কুমড়োর উচ্চ ফাইবার খাবার হজমে সাহায্য করে। ওজন কমাতে চাইলেও নিয়মিত খেতে পারেন মিষ্টি কুমড়োর স্যুপ। এই সবজি বাত-সহ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। মিষ্টি কুমড়োর পটাসিয়াম ও ভিটামিন সি উপাদান উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

বাংলাদেশের মাটিতে সারা বছর মিষ্টি কুমড়োর চাষ করা যায়। টবেও মিষ্টি কুমড়ো হতে পারে। বিশ কেজি গোবর ও মাটি ধরে এমন একটা টবে দুটি মিষ্টি কুমড়োর চারা লাগিয়ে দিলে একটানা ছ‘মাস শাক এবং কুমড়ো খাওয়া সম্ভব।

ছবি : লেখক