আমি যে গান গেয়েছিলেম মনে রেখো

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

পেশাদার জীবনের পয়লা গান গাইলাম মইনুল ইসলাম খানের সুরে সেজান মাহমুদের কথায় বিটিভির অন্তরঙ্গ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে। কবিতা থেকে সুর দেয়া হয়েছিল ।অপূর্ব গান, বলাই বাহুল্য। তখন তো বিটিভি ছাড়া আর কোন চ্যানেল ছিলো না।একটা গানের অনুষ্ঠান হলে সংগীত পিপাসুরা সবাই একযোগে সেই অনুষ্ঠান দেখতেন। কিন্তু তা জানার সরাসরি কোন উপায় ছিলো না।তবুও বিটিভি থেকে জানানো হলো এই গানের জন্য সুরকার, শিল্পী ও গীতিকার এর জন্য দূরদূরান্ত থেকে থেকে চিঠি এসেছে। বিটিভি তে গানটি গেয়েছিলাম নৈমিত্তিক শিল্পী হিসেবে। গান প্রচারের পর কোন অডিশন ছাড়াই আমাকে তালিকাভুক্ত করা হলো বিটিভিতে।গানটি প্রচারের পরদিন আমাদের সেই গ্রামের মতো বাড়িতে একজন লোক এলেন। বিটিভি থেকে ঠিকানা নিয়ে এসেছেন উনি।আব্বা আম্মা একটু অবাক হলেন। কি সমাচার বুঝতে পারছিলেন না।পরে উনি নিজেই পরিচয় দিয়ে বুঝিয়ে বললেন যে গতকাল আমার গান প্রচার হওয়ার পর বিশিষ্ঠ সুরকার সংগীত পরিচালক আলম খান আমাকে দিয়ে ছবিতে গান গাওয়াতে চান।যিনি এসেছেন তিনি আলম খান সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং তবলা শিল্পী গুপি’দা। আব্বা আম্মা একই সঙ্গে অবাক ও খুশী। দিন তারিখ মত আব্বা আম্মা নিয়ে গেলেন আলম ভাইয়ের বাসায়।আমার কোন ভয় ডর নেই।কারণ বয়সে কিশোরী আমি আসলে তখনও শিশু।আলম ভাই আবারও একটা গান শুনলেন। এবং বললেন তাঁর একটা ছবিতে প্লেব্যাকের জন্য তিনি আমাকে নির্বাচন করেছেন। গানটিতে আরেকজন শিল্পী আমার সঙ্গে গাইবেন। পুরুষ শিল্পী কে আমার পছন্দ হলো না।কারণ তার গান আমি শুনেছি। ওই যে বললাম আমি তখনও শিশু, তাই শিশুর সারল্যে বললাম আমি জীবনের পয়লা প্লেব্যাক সলো গাইবো, ডুয়েট নয়! আলম ভাই, গুপীদা, আববা -আম্মা সবাই অবাক হলেন।আলমভাই বললেন ঠিক আছে।সলো গান থাকলে সময়মতো ডাকবেন।আসলে উনি রাগ করলেন। আমি আমার মত কিছু না বুঝেই সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম।দিন এভাবেই যাচ্ছিলো। এর মধ্যে আবার ডাকলেন সুরসম্রাট শ্রদ্ধেয় আলাউদ্দিন আলী।তাঁর বাসায় গেলাম। উনি গান তুলে দিলেন। কি দুর্দান্ত গায়কী আলী ভাইয়ের। ছোট ছোট আবেগ থ্রোইং গুলো যেন মাখন। পিছলে পিছলে মর্মে গিয়ে আটকে যায়।এতদিন তো গাধার মত খালি অনুশীলন শিখেছি।গানে মমতা আনা কি এতো সোজা? শ্রুতি স্টুডিওতে এই পয়লা গাইলাম পরিচালক প্রযোজক নজরুল ইসলাম জীবনের কথায় আলাউদ্দিন আলী ভাইয়ের সুরে ‘আপন কভু পর হয়নারে’ গানটি। ছবির নাম বিধাতা।রেকর্ডিষ্ট ছিলেন মজিদ ভাই।অনেক মিউজিশিয়ান অনেক লম্বা রিহার্সাল, মহরতের গান।সবার টানটান উত্তেজনা, নতুন কন্ঠশিল্পী। কিন্তু আমার কোন উত্তেজনা ভয় ডর কিছুই নেই।গেয়েই যাচ্ছি বোকার মত।বুথে ঢুকে গীতিকার এক জায়গায় সুর ধরিয়ে দিচ্ছেন, সেই মত গাইতেই আলী ভাইয়ের বকা, তোমাকে এমন শিখাইছি? আমি পড়লাম বিপদে! কার কথা রাখি! আলী ভাই এক জায়গায় বললেন ‘এই মেয়ে , এতো কাজ দিচ্ছো কেন?’ জীবনে তোমার বাবা বা ওস্তাদ বেশী শিখিয়ে ফেলেছেন। যা শিখেছো তার কিছু ভুলে যাও।ছবির গানে এতো কারুকার্য লাগেনা। এই প্রথম আমি ভয় পেলাম। একটু দ্বিধান্বিত হলাম, আড়ষ্ট হলাম।বুঝলাম আমাকে অনেক কিছু বুঝতে হবে, শিখতে হবে, জানতে হবে, ভুলতে হবে।একটু থমকে নিজেকে ঝাঁকিয়ে দাঁড় করালাম আমারই জীবন মঞ্চে।সেই থেকে আমি দাঁড়িয়েই আছি, শিখছি থামছি, বুঝছি, থামছি, ভাবছি, থামছি, এভাবেই চলছে আমার জীবন। এইতো জীবন।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে