ভালোবাসার সন্ধানে!

চিররন্জন সরকার

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

১৮ বছর ধরে শংকরে একই বাসায় আছি।এটা ঠিক ‘ভালো’ বাসানয়, কিন্তু ভালোবাসায়সিক্ত।বিয়ের আগে স্বপ্না-মানিকদের সঙ্গে চারতলায় দুই বছর, বিয়ের পর প্রথমে পাঁচতলায়, পরে ছয়তলার ছাদে, পাঁচতলা-ছয়তলা মিলে মোট ১৬ বছর!
এই বাসার সবচেয়ে খারাপ দিক ছিল দুপুরের রোদ হজম করা।ছাদের তাপ সরাসরি ঘরে প্রবেশ করতো।গরমকালে কিছুতেই ঘর ঠাণ্ডা হতে চাইতো না। তারপরও অন্যান্য সুবিধার কারণে তাপ এবং গরমের অসুবিধা মেনে নিয়েছিলাম। 
কিন্তু সম্প্রতি এইবাসার লাগোয়া সামনের দিকের বাসাগুলো ভেঙ্গে ফেলে হাই-রাইজ বিল্ডিং তোলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। নির্মাণ যন্ত্রের বিরক্তিকর শব্দ এর মধ্যেই প্রাণ ওষ্ঠাগত করে ফেলছে।
এই বহুবিধ কারণে অবশেষে বাসা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে ইহলো।কিন্তু যেখানে যাচ্ছি-সেটা ঠিক ‘ভালো-বাসা’ হলোনা! বর্তমান বাসার চেয়ে আরও পেছনে, লিফট বিহীন পাঁচতলা, ভাড়াও বেশি।তবুও যেতে হচ্ছে।কারণ আশ-পাশে আমার সামর্থ্যের মধ্যে এর চেয়ে ‘ভালো-বাসা’ জুটলো না! অর্থী-সামির-স্বপা-মানিক-পরিমলদের ‘মায়ারবাঁধন’ ছিন্ন করে দূরে কোথাও চলে যাওয়াও হলো না!
তুলনামূলক কম ভাড়ার এই বাসাটিতে জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ’ সময়গুলো কাটিয়েছি।এই বাসায় কত পার্টি হয়েছে, কত আড্ডা, কত না দাওয়াত! এই বাসার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলো-ছাদ। ইচ্ছে হলে পাটি বিছিয়ে রাতে খোলা আকাশ আর চাঁদ দেখা যেতো। আড্ডা দেয়া যেতো।ছিলো বৃষ্টি উপভোগের সুযোগ। ছাদের একদিকে ববির তৈরি করা বাগানটিও ছিলো একটা মস্ত আকর্ষণ।সেখানে কত না ফুল আর অর্কিডের সমাহার ঘটেছিলো।ছিলো পেয়ারা, ডালিম, লেবু, লিচু, করমচা, ডালিম আরও কত গাছ।এই বাগানটির দিক তাকিয়ে থাকলে এক অন্যরকম ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠতো ।ছুটির দিনগুলোতে দেখতাম, এই ছোট্ট বাগানে অনেক সুন্দর সুন্দর পাখির আনাগোনা।টুনটুনির বাসা বানানো, টুনটুনির সেই বাসায় কাকের সন্ত্রাস!
এই বাসাতেই আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি ‘প্রোডাকটিভ’ সময় কেটেছে।ছোট বড় মিলিয়ে দশটি বই এবং প্রায় ছয় হাজার প্রবন্ধ-নিবন্ধ-রাজনৈতিক কলাম লিখেছি এই বাসায়!
ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে একটা শূন্যতা, হাহাকার একটা বিষণ্ণতা অনুভব করছি! মনে পড়ছে কবিগুরুর কবিতা: ‘‘ভোরের প্রথম আলো জলের ওপারে।/তাহারে জড়ায়ে ঘিরে/ ভরিয়া তুলিব ধীরে/জীবনের কদিনের কাঁদা আর হাসা।/ধন নয়, মান নয়, এইটুকু বাসা/করেছিনু আশা।…’’
হায় আশা, হায় বাসা! হায় ভালোবাসা!

ছবি: লেখক