কাকরাইলের বর্ণিল দিনগুলো

কাকলী আহমেদ

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

পাড়ার অন্যান্য অনেকের সঙ্গেই ততোদিনে আমাদের পরিচয় হয়ে গেছে। আমার আগের স্কুলের সহপাঠী তারিক মজিদ সামনের ছয়তলা বাসার চার তলাতে থাকে। আমরা বিকেলে বাসার পিছন দিকের মাঠে নামলে সে উপর থেকে আমার নাম ধরে ডাকে। আমিও হাত নাড়ি। তারেক মজিদের ডাক নাম ছিল সৌরভ। আর তার ছোট ভাইয়ের নাম ছিল গৌরব। ওরা দুই ভাই লিটল জুয়েলস স্কুলে পড়তো। তারিক মজিদ আমার ক্লাসেই পড়তো। আমি ভিকারুননিসায় চলে গিয়ে এক ক্লাস উপরে ভর্তি হই। তারিক আর ওর ভাই গৌরব মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে খেলার জন্যে চলে আসতো। কিন্তু ছেলে আর মেয়েদের খেলায় কিছু তারতম্য থাকায় বেশি জমে উঠতো না। তাছাড়া তারিকের মা ছিলেন একটু কড়া প্রকৃতির। প্রায় সময়েই অনেক জোর গলায় ছেলেদের তিনি ডেকে নিয়ে যেতেন। ফলে ওদের বাড়ির বাউন্ডারির মাঝে ক্রিকেট খেলে ছেলেরা সময় পার করতো।
কাকরাইলের এই বাড়িতে দিনগুলো খুব বর্ণিল মনে হতো আমার। এক রাতে আম্মা আমাকে আর আলোকে ডেকে কিছু কথা বললেন। আমি আগামাথা কিছুই ঠিক মত বুঝে উঠতে পারলাম না। মুনির ভাইয়াকেও আম্মা আলাদা করে সবক দিলেন। পরেরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখি আবীর আশিক আমাদের বাড়িতে। ওদের বাসায় ওদের একজন চাচা ছিলো। আকৃতির দিক দিয়ে উনি ছিলেন বেশ মোটাসোটা। মুনিয়াকে উনি শাশুড়ি বলে ডাকতেন। কি করে জানি না আমরা তিন বোন উনাকে ‘শাশুড়িয়া’ বলে ডাকতাম। আবির আশিকের দেখাশুনা করার জন্যেই কিছুদিনের জন্যে উনি এসেছিলেন। অত্যন্ত মায়াবী এই ব্যক্তিটি আব্বুকে ভাই আর আম্মাকে ভাবী বলে ডাকতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সঙ্গে উনার খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক হয়ে গেলো।
আবির আর আশিক আমাদের বাড়িতে কেন আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আশিকের চোখের ঘুম তখনও কাটেনি। কিছু সময় পর আমরা দেখলাম আখতার চাচা বরের সাজে একটা গাড়িতে উঠলো। সঙ্গে শাশুড়িয়াও যাচ্ছেন। আম্মা বাচ্চাদের ভেতরের রুমে বসিয়ে খুব আদর যত্নে নাস্তা খাওয়ালেন। আবির যদিও বা কিছু নাস্তা খেলো। কিন্তু আশিক কিছুই মুখে দিলো না। বাবার দ্বিতীয় বার দ্বার পরিগ্রহের ব্যাপারটা আশিক ঠিকই টের পেয়ে গিয়েছিলো। পুরো ব্যাপারটা আমাকে এত বেশি মুষড়ে দিলো। অতটুকু বয়সে এমন এক ঘটনা হজম করা অনেকটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছিলো।  দুপুরের পর চাচা আর সঙ্গে নতুন বৌ গাড়ি থেকে এসে নামলো। পাড়ার সবার চোখে কৌতুহল। অনেকে অনেক কথাই বলছে। আমি কেঁদে ভাসাচ্ছি। আবীর অনেক ছোট। ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে আছে। আশিক কঠিন কঠোর মুখে তাকিয়ে আছে। শাশুড়িয়া আমাদের ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে কিছুতেই দুটি ছেলেকে তাদের ঘরে নিয়ে যেতে পারলেন না। এক পর্যায়ে আম্মা বললেন, ‘ ভাই। ওদের মনের বিরুদ্ধে কিছু না করাই ভাল হবে। আমি সন্ধ্যের পর ওদের খাওয়াদাওয়া করিয়ে দিয়ে আসবো।’ জানালার ভিতর দিয়ে দেখতে পেলাম চাচা শেরোয়ানী পরে সঙ্গে কাতান শাড়ি পরা নতুন চাচীকে নিয়ে ঘরে ঢুকছেন। সারা পাড়ার ছেলে মেয়ে বাড়ির উঠান ভরে ফেলেছে।সবার চোখ ঠিকরে বের হচ্ছে অযাচিত কৌতুহল। আবির আশিককে বাথরুমে আটকে রেখে এই দৃশ্য দেখা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। আমি আম্মার বুকে আছড়ে পড়ে কেবল কেঁদে ভাসাচ্ছি। দুটি শিশুর মনের আকুতি আমাকে ছিঁড়ে খুরে দিলো। আবির মায়া কাতর চোখগুলো আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো।( চলবে)