ওগো আমার আগমনী আলো, জ্বালো প্রদীপ জ্বালো

সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী দাসগুপ্ত

আচ্ছা,একদম বাচ্চাকাচ্চাদের কথা না হয় বাদই দিলাম, আজকালকার কিশোর-কিশোরীরা ‘মহালয়া'( মানে, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আর কি) শোনে? মনে তো হয়না। আমার পুত্রটিকে দেখে তো অন্তত সেইরকমই ধারণা। একে তো রেডিও যন্তরটাই প্রায় একটা অবসোলিট ব্যাপার হয়ে গেছে আজকাল। ঝর্ণাকলম বা ইকমিক কুকারের মত। তার ওপর গনগনে গ্রীষ্ম হোক বা প্যাঁচপ্যাঁচে বর্ষা,ইউটিউব খুললেই,’বাজলো তোমার আলোর বেণু’ স্রেফ ডান হাতের বুড়ো আঙুলের দূরত্বে যাদের কাছে, ভোররাত্তিরের আঠা-লাগা চোখ জোর করে খুলে রেখে ‘জাগো দশপ্রহরণধারিনী’ শুনতে তাদের ভারি বয়েই গেছে। শুধু কি তাই?পুজোর জুতো-জামা-কাপড় ক’টা হলো, আদৌ হলো কি না,সে নিয়েও তো বিশেষ হেলদোল দেখি না, সেও কি না চাইতেই এতো বেশি পায় বলে? আমার সাড়ে-চোদ্দ-র পুত্তুরটি তো এখনো নিজের দাদু,জেঠু,পিসি তো বটেই, এমনকি মায়ের পিসি, দিদার বাপেরবাড়ি, মায়ের খুড়তুতো বোন এদের কাছ থেকেও নাগাড়ে পুজোর উপহার পেয়ে চলেছে, এ যে কি পরম সৌভাগ্যের কথা, সেটুকুও বোঝে কিনা কে জানে! পূজাবার্ষিকীর প্রতি টানটাই বা আর ক’দিন বজায় থাকে, দুরুদুরু বুকে ভাবি মাঝে মাঝে।

আমার কাছে ছোটবেলায় মহালয়া মানেই ছিল মা-কাকিমারা আগের দিন রাত্রে ঠাকুমার ঘরে রাখা ঢাউস রেডিওটাকে নতুন ব্যাটারী পরিয়ে ধুলো ঝেড়ে এক্কেবারে ‘শুচিশুদ্ধ’ করে রাখবে আর ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে আমাদের সক্কাল সক্কাল শুইয়ে দেবে।
পরদিন ঘুম ভাঙতো মা’র হাতের ধাক্কায় আর ” ইয়া চ্ণ্ডী , মধুকৈটভারি দৈত্যদলনী”র সুরে; কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়ায় মনে মনে খুব রাগ হতো মা’র ওপর …আর ঠিক তখনই সেই ম্যাজিকাল কণ্ঠস্বরে শুরু হতো “আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমন্জীর/ ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা’ …. অমনি চোখের পাতায় আদরের মতো জড়িয়ে থাকা ঘুমের শেষ রেশটুকুও কোথায় উধাও হয়ে যেত এক নিমেষে ।

বালিশে মুখ গুঁজে টানা শুনে যেতাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আর মাঝে মাঝে কেন জানিনা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতো বুকের ভেতরটা, চোখ থেকে দু-এক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়তো বালিশে। আর কি যে লজ্জার কথা, আজও পড়ে।দেবদ্বিজে যাবতীয় উদাসীনতা সত্ত্বেও। পৃথিবীর প্রতিটি কোণে যাঁরা প্রিয়জন আছেন,যাঁরা ততো প্রিয় নন, যাঁরা স্মৃতিতে আছেন শুধু, তাঁদের প্রত্যেকের জন্য পড়ে বোধহয়।

ওই যে গোটা বাড়িটার ঘুম ভেঙে যেত একসঙ্গে ওতেই যেন পুজো শুরু হয়ে যেত আমাদের।তারপর জেঠু-বাবা-কাকুদের একসঙ্গে তর্পণ, ফিরে সবাই মিলে বাঁধাধরা লুচি-সাদা আলুর তরকারি- রসগোল্লা, আর দুপুরে কোনরকমে মুখে দুটো ভাত গুঁজে দল বেঁধে কেনাকাটা। বিশেষ করে জুতো কেনাটা তো ওইদিনের জন্যই তোলা থাকতো। নিউমার্কেট চত্বরে গ্র‍্যাণ্ড হোটেল লাগোয়া ‘ভারত’ বলে যে জুতোর দোকানটা বহুদিন হলো উঠে গেছে, ওইখানে পছন্দ না হলে তখন যাওয়া হতো বাটায়। জুতোর সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে সব্বার জন্য অনেকগুলো ব্যাণ্ড-এইড কিনতেও ভুল হত না( গোটা পুজো ধরেই লাগতো তো)।

আজ এতো বছর পরে যখন প্রায় সবটুকুই পাল্টে গেছে, অনেকগুলো প্রিয় মানুষ ছেড়ে চলে গেছেন চিরতরে,প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দর্শনের বিন্দুমাত্র উৎসাহ অনুভব করি না আর,থীম শব্দটা শুনলেই যখন হৃদকম্প জাগে,(বিশেষত এবছর যখন কোটি টাকার পুজোর অশ্লীল আড়ম্বরের মধ্যেও দশহাজারী অনুদানের বোটকা গন্ধ বোনাস-বঞ্চিত রাজকর্মচারীর মর্মপীড়ায় নুনের ছিটে দেবে),পুজোয় যখন নতুন গানের জায়গা দখল করে নিয়েছে বাংলা সিনেমার পুজো রিলিজ,..তবু আজো আমার পুজো মানে ” বাজলো তোমার আলোর বেণু”,আমার পুজো “ওগো আমার আগমনী আলো, জ্বালো প্রদীপ জ্বালো”।

আপনার ??

ছবি: গুগল