শুভ জন্মদিন অমিতজি, বেঁচে থাকুন আরও অনেকদিন

লুৎফুল কবির রনি

কী দেখে অমিতাভ কে ভালো লেগেছিল জয়ার? ব্যরিটোন, উচ্চতা, ব্যক্তিত্ব, পপুলারিটি…..না। এসব কিচ্ছু না। সেদিনের জয়া ভাদুড়ি’র অমিতাভ বচ্চন কে ভালো লাগার প্রথম ও প্রধান কারণ ছিল চোখ। ওই চোখ দুটোতেই গভীরতার সন্ধান পেয়েছিলেন জয়া।

তারপরেই আক্ষেপ করেন জয়া, ৮২ সালের সেই ভয়ঙ্কর দূর্ঘটনার পর অমিতের চোখের সজিবতাটাই হারিয়ে গিয়েছিলো। ১৯৮২ সাল, কুলি ছবির সেটে যা হয়েছিল তা আজ ইতিহাস। এরপরেও যে অমিতাভ বচ্চন বেঁচে আছেন, এটাই বড় আশ্চর্যের। প্রথমে ব্যাঙ্গালুরুর সেন্ট ফিলোমিয়ায়, তারপর মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি। যমে মানুষে টানাটানি’র দু’মাস। তাঁর আরোগ্য কামনায় সেদিন কী হয়নি এদেশে। মন্দির, মসজিদ, গীর্জা,গুরুদ্বারে বিশেষ প্রার্থনা। ঘরে ঘরে আরাধ্য দেবতার কাছে মানত। লক্ষ লক্ষ মানুষের উপবাস। দেশে বিদেশে অসংখ্য মানুষের নাওয়া খাওয়া ভুলে শুধুমাত্র তাঁর খবর নেওয়ার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকা। এমন দৃশ্য এর আগে যে দেখেনি।

স্ত্রীর সঙ্গে

নায়ক হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। আর তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। ইন্দিরা গান্ধী কে দেখে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো অমিতাভের। পাশে রাখা কাগজ কলমে লিখে জানালেন, ‘ আই কান্ট টক।, উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বললেন,‘ বাট আই ক্যান স্পিক। ইউ উইল অলসো স্পিক মাই চাইল্ড।, দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২৪ শে জুলাই। ব্রিচ ক্যান্ডি থেকে বচ্চন ছাড়া পেলেন ২৪ শে সেপ্টেম্বর। তারপর পূর্নজন্ম। সেই জীবন আরো দীর্ঘ হোক। আনন্দ ছবির ডায়লগটা ছিলো, বাবু মশায়,জিন্দেগি বড়া হোনা চালিয়ে,লাম্বি নেহি, আমরা দুটোই চাই। পঁচাত্তরের বচ্চন কে আরো নতুন ভাবে, নতুন মেজাজে দেখতে চাই।

‘আমি তাঁর নীরব অনুরাগী।অমিতাভ বচ্চনকে টক্কর দেওয়ার মতো এখন বলিউডে আর কেউ নেই। তাঁর অভিনয় আমার কাছে পণ্ডিত রবিশঙ্করের বাজনা বা শচীন টেন্ডুলকারের ব্যাটিংয়ের মতো।

পারিবারিক শিক্ষা আর মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্বারোপ করে লতাজি বললেন, ‘আমার মা-বাবা কী শিখিয়েছেন? পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে আমি কী শিখেছি? এগুলো মনে রাখতে হবে। অমিতাভ বচ্চন এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।’

-বলিউডের বরণ্য অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের ব্যাপারে বললেন উপমহাদেশে সংগীতের কিংবদন্তী লতা মঙ্গেশকর।

‘ আমি ওঁর ফ্যান বয়।যখন আমার আট-ন’বছর বয়স। সেই সময় ওইসব অ্যাকশন প্যাকড, অ্যাগ্রেসিভ ফিল্মগুলো দেখতে দারুণ লাগতো।

টিনেজ-এ পড়ছি পড়ছি সময়টা আপনাকে গ্রাস করে নিল দু’রকম অ্যাগ্রেশন। টেনিস কোর্টে জন ম্যাকেনরো। সিলভার স্ক্রিন-এ অমিতাভ বচ্চন।’বলেন, শচীন তেন্ডুলকর ।

কবিরা নাকি শৌখিন মানুষ হয়। পদ্মভূষণ প্রাপ্ত বাবা হরিবংশ রায় বচ্চন দেশের বিখ্যাত কবি বলেই হয়তো শৌখিন মানুষ ছিলেন। এই কারণে নিজের প্রথম পুত্রের জন্মকে নিয়ে স্মরণীয় করে রাখতে ছেলেকে হাসপাতাল থেকে বাসায় আনতে একটি গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করেন। ১৯৪২ সালে গরুর গাড়িতে করে জন্মের পরেই যাত্রা করা এক্সট্রা খাতির বা শৌখিনতার চেয়ে কম কিছু ছিলোনা।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তখন আস্তে আস্তে দানা বেঁধে উঠছে, বাবা তাই ছেলের নাম রাখলেন ‘ইনকিলাব’ যদিও সেই নাম পড়ে পরিবর্তন হল।
ছেলের ছোটবেলা থেকেই অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছা ছিল। অনেক চেষ্টা করলেন, লাভ হলনা- এই ক্ষেত্রে তিনি এক্সট্রা খাতির পেলেন না। ছোটভাই তার ছবি তুলে বিভিন্ন প্রযোজকের কাছে পাঠাতেন, অডিশনের ডাক পেতেন, তারপরে সেই একই ফলাফল- আপনি বাদ পড়েছেন। বিমানবাহিনীতে যাওয়ার চেষ্টা করেন, সেখান থেকেও বাদ।

কলকাতার একটা শিপিং কোম্পানিতে মাসিক ৪৭০ রুপি বেতনে চাকরি নেন, কিন্তু মন খালি টানতে থাকে মুম্বাই এর সিনেমার জগতে। শিপিং কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি থিয়েটারেও কাজ করতে থাকলেন।

ছেলের সঙ্গে

অভিনয়ে হচ্ছে না তো কি হয়েছে? মিডিয়া সম্পর্কিত অন্য কিছু তো করা যায় নাকি? বিজ্ঞাপনে বা সিনেমাতে নিজের আওয়াজ দেয়া (ভয়েস ওভার) যায় কিনা তা ভাবতে লাগলেন। গেলেন রেডিও তে সংবাদ পাঠ করতে। তার ভয়েস শুনে তাকে বলা হল- ক্যানভাসার চিনেন? যারা মলম বিক্রি করে? আপনার ভয়েস তো তার মতো মশাই! ওইখানে যান, অনেক ভালো করবেন ক্যানভাসার হিসেবে। খুব আহত হয়েছিলেন এই মন্তব্যে, কিন্তু ভেঙ্গে পড়েন নি।

ভেঙ্গে পড়েন নি বলেই হয়তো এই ভয়েসের কদর হয়েছিল- নাহ, মুম্বাইতে না- বাঙ্গালির কাছে- দুই দিকপাল পরিচালক মৃণাল সেন আর সত্যজিৎ রায় এর কাছে। মৃণাল সেন তার ‘ভুবেনসোম’ সিনেমাতে তাকে ভয়েস ন্যারেটর হিসেবে নেন। সত্যজিৎ রায় নিজের অন্যতম বিখ্যাত ছবি ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ সিনেমাতেও তার ভয়েস ওভার নেন। সত্যজিৎ তার সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ওর যেই জিনিসটায় আমি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেটা হল তার সময়ানুবর্তীতা, সকাল ছয়টায় একদিন আসতে বলেছিলাম, ঠিক ছয়টায় এসেছিল, ৫ টা ৫৯ এও না, ৬ টা ১ এও না, ঠিক ছয়টায়’।

সবই হচ্ছিলো, কিন্তু সিনেমাটাই হচ্ছিলো না। এক পরিচালক বলে বসলেন- আপনি এত লম্বা কেন? আপনার সাইজের নায়িকা কোথায় পাব বলেন? আরেকজন প্রযোজক আরও নিষ্ঠুর মন্তব্য করে বসলেন- এক কাজ করেন, আপনার লম্বা পা দুইটা কেটে ‘সাইজ’ করে নিয়ে আসেন, তারপরে আপনাকে অভিনয়ে নিবো। অবশেষে ছোট ভাইয়ের পাঠানো ছবি একদিন কাজে আসলো, ‘সাত হিন্দুস্থানি’ নামক সিনেমাতে প্রথম অভিনয় করলেন। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা তারপরেও তাকে ছাড়ল না, সুনীল দত্তের সঙ্গে ‘রেশমা অউর শেরা’ নামে এক সিনেমাতে অভিনয়ের কাজ পেলেন। কিন্তু কয়েকদিন পরেই আবিষ্কার করলেন তার চরিত্রকে ‘বোবা মানুষের’ চরিত্র বানিয়ে দেয়া হয়েছে, তার কোন সংলাপই নেই সিনেমাতে! প্রতিবাদ করেও লাভ হল না, সময়টা তার ছিলোনা বলেই হয়তো।

কিন্তু জাঞ্জির আর দিওয়ার এর মতো সিনেমা রাতারাতি সময়কে তার পায়ের কাছে নিয়ে আসলো। একের পর এক হিট সিনেমা দিতে লাগলেন তিনি, পেয়ে গেলেন ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ এর খেতাব। ৭০ আর ৮০ এর দশক পুরোটাই কাঁপিয়েছেন তিনি বলতে গেলে একাই। হিন্দি সিনেমা জগতের অন্যতম ক্লাসিক সিনেমা শোলে তে অভিনয় করলেন, যেই সিনেমা সম্পর্কে আলাদা করে না বললেই নয়। বিখ্যাত ফ্রান্সের সিনেমা পরিচালক François Truffaut ( The 400 Blows খ্যাত) তাকে বলেছিলেন ‘ওয়ান ম্যান ইন্ডাস্ট্রি।’

৭৬ বসন্ত পেরিয়েছে। দাঁড়ি পেকেছে গালের। তবুও মেঘ মন্দ্রিত স্বরে তিনি এখনও দুনিয়া কাঁপিয়ে বলতেই পারেন, ‘‌বুড্ডা হোগা তেরা বাপ’‌। এতটাই সাবলীল তিনি আজও। বলিউডের রয়্যাল পরিবারের শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন আজ।

৭৬ বছরে পা দিলেন বলিউডের এই গুণী অভিনেতা। তবু তাঁর চোখের মনিতে সেই আত্মবিশ্বাস, এখনও তাঁর স্বরে স্বভাবসিদ্ধ ভারিক্কি চাল। এখনও তিনি নতুন, যুবক, অ্যাংরি ইয়ং ম্যান। কারণ, বলিউডে আত্মপ্রকাশের সময় থেকে তাঁকে তো এভাবেই দেখতে ভালোবাসে দর্শকরা।

তিনি যদি বুড়ো হয়ে যান, তাহলে তো একটা প্রজন্ম অস্তিত্ব সংকটে পড়তে বাধ্য হবে। বুকের পাটায় বল হারিয়ে ফেলবে নিমেষে। তাই আজও, হট সিটের ওপর প্রান্তে যখন কোনও হাঁটুর বয়সী যুবক বসে সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা দেন তখন খেলায় হারা জেতার জন্য নয়, তখনও তাঁর হাঁটু কাপে ওপাশের সিটে বসে থাকা দীর্ঘদেহী ভদ্রলোকের জন্য

আর সেই তিনি কী বলছেন। ঠিক রাত ১২ টায় নিজের জন্মদিনে নতুন করে পরিশ্রমের শপথ নিয়েছেন তিনি। ট্যুইটারে লিখেছেন, বিনা পরিশ্রমে একদিনও বাঁচার উপায় নেই।’ নিজের উপর এই অগাধ আস্থা ও কাজের প্রতি সততার কারণেই এখনও তিনি দেশের আমজনতার চোখের মণি।

এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন তাকে- এতদিন ধরে টিকে আছেন কীভাবে? রহস্যটা কি সাফল্যের? উত্তরে তিনি বলেন- সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা এবং সেটা থেকে শিক্ষা নেয়া। সাংবাদিক মজা করে জিজ্ঞেস করেন- সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা আপনার কতটুকু? মজা করে হাসতে হাসতে তিনি উত্তর দেন- কম নয় বৈকি! আমার উচ্চতার সমান!

শুভ জন্মদিন অমিতাভ বচ্চন, বেঁচে থাকুন আরও অনেকদিন , সুস্থভাবে।

ছবি: গুগল