আকাশ ভরা বৃষ্টি আর গল্প কমিকসে ভরা পূজা সংখ্যা

স্বরূপ সোহান (লেখক)

গন্ধটাই যেনো কেমন। মনটাকে চনমনে করে দেয়। হাতে নিয়ে চোখটা বুজে নাকের কাছে সবে ধরেছি। গভীর শ্বাসটা ছাড়তেও পারিনি, আচমকা হাত থেকে এক টানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কী চিৎকার বাবার। ‘কাল না ইংরেজী পরীক্ষা? এসময় আউটবই নিয়ে বসে আছে, ফেল করলে বের করে দিব বাসা থেকে।’ বাবার অগ্নিমুর্তির বদলে আমার দৃষ্টি মাটিতে পড়ে থাকা বস্তুটির দিকে। অনেক কষ্টকরে জমানো টাকা দিয়ে পাড়ার লাইব্রেরি থেকে ভাড়া করে আনা আউট বই (!!) নাহ্ , ঠিক হলো না। ওই সময়ের বাবা মায়েরা পড়ার বাইরের সব বইকে আউট বই বললেও এটা তো আউট বই নয় ।আনন্দমেলা পূজা সংখ্যা মোটেই আউট বই নয় বরং আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। এভাবেই প্রায় তিন দশক আগে এই শহরে পূজা সংখ্যার সংগে আমার ভালবাসার শুরু।

আমাদের শৈশবের পূজা মানেই স্পেশাল দুটি জিনিস । আকাশ ভরা বৃষ্টি আর গল্প কমিকসে ভরা পূজা সংখ্যা। পূজার ছুটির বাদলা দিনের একমাত্র সঙ্গী আনন্দমেলা। একজন ফেলুদা আর একজন কাকাবাবুর জন্যে সারা বছর অপেক্ষা। এক মলাটে কত কিছু। ফ্যান্টম , বাঘা, আ্যাসটেরিক্স, ব্যাটম্যানরা যেনো ঘিরে থাকতো পুরো পূজার ছুটিতে। কেন যেন টেনেও ঘর থেকে বের করতে পারতোনা কেউ তখন। মধ্য আশির জনপ্রিয় চরিত্রগুলো তো ছিলোই, এমনকি পুরোনো অনেক চরিত্রের সংগে আমাদের পরিচয় করিয়েছিল আনন্দমেলা পূজাসংখ্যা। সত্যজিৎ, সুনীল, শীর্ষেন্দু ছাড়িয়ে চল্লিশদশকের পেমেন্দ্র মিত্রের মেসবাড়ীর ঘনদার সংগে ঘনিষ্টতা ও হয়েছিল একই সূত্রেই। আনন্দমেলা তখন পাক্ষিক বেরুতো নাকি মাসিক তা মনে থাকতো না। সহজলভ্যতার অভাবে নিয়মিত যে পড়াও হতো তাও নয়। কিন্তু যেভাবেই হোক পূজাসংখ্যাটি চাই । আর পাড়ার লাইব্রেরিওয়ালারাও ঠিকই জোগাড় করে ফেলতো চাহিদা বুঝে। মনে আছে আমার কৈশোরের শেষ প্রান্তে সত্যজিৎ চলে গেলেন।সেবারের আনন্দমেলার পূজাসংখ্যায় বের হলো ফেলুদার শেষ গোয়েন্দা অভিযান নয়ন রহস্য। সংখ্যাটি হাতে নিয়ে অনেক্ষণ কেঁদেছিলাম । কৈশোরের বুকভরা অভিমান নিয়ে পণ করেছিলাম আর কোন দিন পূজাসংখ্যা পড়বো না।কিন্তু পারিনি।

বয়সের রংবদলে বদলেছে আমার চারপাশ, আর বদলেছে পড়ার অভ্যেস । মনের অজান্তেই কখন যেনো আনন্দমেলা ফিকে হয়ে গেল। প্রবলভাবে আমার পড়ার ভুবনে এসে হানা দিলো দেশ আর আনন্দবাজার। আমার কবিতা পড়ার শুরুটা এই দুই পত্রিকার হাত ধরেই। শক্তি, জয়, সুনীলের সংগে কবিতার ভুবনে প্রবেশ আমার দেশের সংগে।পত্রিকা পড়ে যখন মনের খিদে মিটতোনা,তখন ঝাপিয়ে পড়লাম কবিতার বইয়ে। কিন্তু অপেক্ষায় থাকতাম সারাবছর কখন পূজা আসবে আর আমার প্রিয় এই দুই পত্রিকার পূজাসংখ্যা হাতে পাবো। কারন একটাই । বেশী বেশী কবিতা পাওয়া যাবে পূজা সংখ্যায়। শরতের সকালে পাড়ার মোড়ের পত্রিকার স্টল গুলা ছেয়ে যেতো শারদীয় সংখ্যায়।শারদীয় শব্দটিও এই শহরে বহুল প্রচলিত হয়েছিল কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয়এই পত্রিকারগুলোর পুজাসংখ্যার কল্যাণেই। সারাবছর প্রকাশিত সংখ্যাগুলোতে নিয়মিত লেখকদের গল্প, ধারাবাহিক উপন্যাস থাকতো সীমিত, আর শারদীয় সংখ্যা ছিল স্পেশাল। সারাবছর যাদের নতুন লেখা পাওয়া যেতো না, শারদীয় সংখ্যায় তারা লিখতেন। গুচ্ছ কবিতা, ছোট গল্প আর আস্ত উপন্যাসে ঠাসা শারদীয়। সুচিত্রা, সমরেশ, বুদ্ধদেব, সন্জীব, সুনীল, শীর্ষেন্দুরা ছিলেন আবশ্যিকভাবেই। এর বাইরেও থাকতেন বিমল কর, হর্ষ দত্ত , মতি নন্দী, বানী বসু, নবণীতা দেবসেন সহ আরো অনেকে। এমনকি বাদ পড়েননি আমাদের হুমায়ূন আহমেদ ও। কোলকাতার পাঠকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় চরিত্র ছিল হিমু। আর হিমুকে আমাদের হুমায়ূন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এই শারদীয়তেই।

গল্প, উপন্যাস আর কবিতার শারদীয় ছাড়াও লাইফস্টাইল আর সিনেমার জগতের সানন্দা, আনন্দলোক ও কম জনপ্রিয় নয়। হলিউড, বলিউড আর টালিউডের চলচ্চিত্র দাপিয়ে বেড়ানো মুখগুলোর আবেদনময় ফটোসেশনই আনন্দলোক শারদীয় সংখ্যাগুলোর মুল আকর্ষন।

সানন্দার ফ্যাশন ফটোসেশনগুলোও কিন্তু ভুমিকা রেখেছে হালের সেনসেশন্যাল তারকা তৈরী করতে। কোলকাতার মেয়ে বিপাশা বসু বলিউড মাত করার আগে কিন্তু নিতান্তই সানন্দার ফ্যাশন মডেল ছিলেন। বেশ অনেকগুলি শারদীয় সংখ্যার প্রচ্ছদ হন এই আবেদনময়ী। এছাড়া তারকাদের অন্দরমহলের গালগপ্পোওছিলো আনন্দলোক শারদীয়র বিশেষ আকর্ষন। এই ধারাবাহিকতা চলছে যুগ যুগ ধরে। শতবর্ষের দারপ্রান্তে দাড়িয়েও আনন্দবাজার গোষ্ঠির জাকজমক প্রকাশনা এখনো শারদীয়।

শারদীয় প্রকাশনা আনন্দবাজারের মাধ্যমে জনপ্রিয় হলেও পূজাসংখ্যার প্রথম প্রকাশকাল কিন্তু চমকে ওঠার মতো। কোলকাতা থেকে ১৪৬ বছর আগে বের হয়েছিল প্রথম পূজাসংখ্যা। ভাবা যায়!প্রকাশকাল ১৮৭৩ বা ১২৮০ বঙ্গাব্দের ১০ আশ্বিন । কেশব সেন সম্পাদিত সুলভ সমাচার পত্রিকার প্রথম এই শারদীয় সংখ্যাটির নাম ছিল ‘ ছুটির সুলভ’। দাম ছিল মাত্র এক পয়সা। তবে পুর্নাঙ্গ শারদীয় পূজাসংখ্যা বের হয় ১৯১৩ সালে। ২০০ পৃষ্ঠার এ পূজা সংখ্যাটি ছিলো ভারত বর্ষ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যা। লিখেছিলেন অনেক গুনীজন । এতে লিখেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, বিপিনবিহারীগুপ্ত, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। কতটা সমৃদ্ধ ছিল সংখ্যাটি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপর কিন্তু আনন্দবাজারের জয়গান শুরু হলো। ১৯২৬ বা ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম পূজা সংখ্যা বের করে। ৫৪ পৃষ্ঠার এ পূজা সংখ্যার দাম ছিল দুই আনা।

আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম পূজা সংখ্যায় উপন্যাস ছাপে ১৯৩৯ সালে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শহরতলী। শরতে শারদীয় সংখ্যা আজ ও বের হচ্ছে । তবে শহরের রাস্তায় শারদীয় নেই। আগে বাস স্ট্যান্ডের পাশে পত্রিকার দোকান ঝুলতে দেখা যেতো আনন্দবাজার, দেশ, সানন্দা, আনন্দমেলা শারদীয়।আর আজ? শহরের বাসস্টপ থেকে বেশীরভাগ পত্রিকার স্টলই উধাও। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এখন বড় সড় এল ই ডির বিজ্ঞাপন। নেই পাড়ার সেই লাইব্রেরিগুলিও। শারদীয় সংখ্যা কিনতেএখন যেতে হয় গুটিকয়েক নির্দিষ্ট বইয়ের দোকানে। বাবা মায়েদের ও আর আউট বই নিয়ে খুব বেশী চিন্তা করতে হয় না। বরং গ্যাজেট নির্ভর প্রজন্ম শারদীয় উদযাপন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। শারদীয় পূজা সংখ্যাগুলি তাই আজ ভালবাসায় জড়িয়ে আছে বিশেষ একটি প্রজন্মের কাছে। যাদের চোখের তারা নেচে ওঠে একটি মলাট দেখলেই। শারদীয়।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা