বহু বর্ণ ও সংস্কৃতির শহর লন্ডন

ঊর্মি রহমান

লন্ডনের মেয়র এখন সাদিক খান, যাঁর পরিবার পাকিস্তান থেকে এসেছিলো। তিনি যে ভালই চালাচ্ছেন, সেটা মনে হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে, অর্থাৎ ২০২০ সালে তিনি থাকবেন, না কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী শন বেইলি আসবেন, সেটা বোধহয় এখনই বলা যাচ্ছে না। এর মধ্যে শন বেইলির বেশ আগে কিছু বলা কথা ফাঁস হয়ে গেছে যা তাঁর বা তাঁর দলের পক্ষে ইতিবাচক নয়। তিনি ২০০৫ সালে বলেছিলেন, বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে মুসলমান ও হিন্দুদের ধর্ম, তাদের উৎসব সম্পর্কে শেখে। বড়দিন সম্পর্ক যা শেখে, তার চেয়ে বেশী শেখে দিওয়ালি সম্পর্কে। এর ফলে ব্রিটেন অপরাধে ভরা নর্দমা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি এটাও বলেন যে, অন্যদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষে এই সমাজে মিশে যাওয়া অনেক সহজ, কারণ তারা এদেশের মানুষের মতো একই ধর্মে বিশ্বাসী ও একই ভাষায় কথা বলে। এখানে উল্লেখ্য শন বেইলি নিজেও একজন কৃষ্ণাঙ্গ।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি যখন লন্ডনে আসি, তখন বহু সংস্কৃতির এই শহর আমাকে আশ্বস্ত করেছে। বলেছে, তুমি একেবারে পর নও, তুমি আমাদেরই একজন। বিবিসি’তে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে আরো জোরালো করেছিল। সেখানে ক্যান্টিনে বা ক্লাবে গেলে মনে হতো সেটা একটা ক্ষুদ্র জাতিসং ঘ। সেখানে নানা দেশের, নানা ধরণের মানুষের সঙ্গে দেখা হতো। তারা নিজেদের মধ্যে নানা ভাষায় কথা বলতো। আমরাও চায়ের কাপে তুফান তুলতাম, বাংলায়। সেই সময় একজন অসাধারন ব্যক্তিত্ব থাকতেন লন্ডনে, তোসাদ্দুক আহমেদ। সিলেটের মানুষ। কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন এক সময়। এখানে এসেও অনেক কিছু করেছেন। দুই বাংলা এক হবে বলে স্বপ্ন দেখতেন। বহু সংস্কৃতির ব্রিটেনের একজন প্রবক্তা ছিলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। পূর্ব লন্ডনে, যেখানে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে দোকান থেকে বাংলা গান ভেসে আসতো, সেখানে তাঁর অফিস ছিলো। সেই সময় আমি ও আমার সহকর্মী দীপায়ন চট্টোপাধ্যায় ‘ব্রিকলেন’ নামে একটি সিরিজ অনুষ্ঠান করছিলাম বিবিসি বাংলা বেতারে। প্রায়ই বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডন তথা ব্রিকলেন যেতে হতো। সেখানে তোসাদ্দুক ভাইয়ের একটা অফিস ছিলো। গেলে চানাচূর খাওয়াতেন, যাতে নানা রঙ ছিলো। অর্থাৎ লাল, সবুজ, হলুদ ইত্যাদি উপকরণ মেশানো থাকতো। তার নাম তিনি দিয়েছিলেন, মাল্টি-কালচারাল চানাচূর। তার মুখে এবং পরে তিনি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, এমন লোকজনের মুখে বাঙালি বিলেতে বসবাসের ইতিহাস জেনেছিলাম । সেটা ছিল সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনী।
আমার শিশুপুত্র স্কুল শুরু করেছিলো। সেখানেও এই বহু-সংস্কৃতি ছাপ ছিলো। ওদের ক্লাসঘরের দেয়ালে একটা মানচিত্র আঁকা ছিলো। ওদের ক্লাসে বেশ অনেকগুলো দেশের শিশুরা ছিলো। মানচিত্রে তাদের দেশগুলো চিহ্নিত করা ছিলো। বিভিন্ন ধর্মের পালা-পার্বন পালন করা হতো। একবার রামায়নের একটি অংশ অভিনীত হয়েছিলো, আমার পুত্র রূপক সেখানে জটায়ু সেজেছিলো। বাচ্চাদের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখেছিলাম, সেটা আজও মনে আছে। একবার ঈদে আমাকে স্কুল অনুরোধ করেছিলো, ঈদ সম্পর্কে কিছু বলতে। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, নেটিভিটি প্লে বা বড়দিন উদযাপনকে অবহেলা করা হতো। সেটা এদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব, যার ছোঁয়া কোন ধর্ম বা সংস্কৃতির মানুষ উপেক্ষা করতে পারতো না। সব সম্প্রদায়ের শিশুদের মধ্যে তার ছোঁয়া লাগতো। অনেকেই উপহার বিনিময় করতো। বাড়িতে ক্রিস্টমাস ট্রি এনে সাজাতো। মনে পড়ে একবার এক মুসলমানকে আর একজন বলেছিলো, তুমি তো মুসলমান, তাহলে বড়দিন উদযাপন করছো কেন? সে হেসে বলেছিলো, বড়দিন হলো হযরত ঈসার জন্মদিন। পালন করবো না কেন? সেই সময় ট্রাফালগার স্কোয়ারে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান হতো। এখন হয় কিনা জানি না। কিন্তু দিওয়ালি হয়। নাটিঙহ্যামে আফ্রো-ক্যারিবীয়ানদের কার্নিভাল হয়, যা নটিঙহ্যাম কার্নিভাল নামে বিখ্যাত। এসব কিছুতেই সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করে। এর কোন কিছুর জন্যই কিন্তু কোন ‘অপরাধমূলক’ কোন কিছু তৈরী হয়নি। বরং লন্ডন শহর সমৃদ্ধ হয়েছে, বহু বর্ণে উজ্জ্বল হয়েছে।
আর এই শহরটি যদি বহু বর্ণ ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ না হতো, তাহলে শন বেইলির মত মানুষরাও এতদূর কি উঠতে পারতো? এই শহরে, এখানকার বহু সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হয়েই অনেকে অনেক কিছু করতে পেরেছেন। সাদিক খান মেয়র হতে পেরেছেন। শন বেইলিও হয়ত পারবেন। আমাদের বাংলাদেশের তিনজন নারী ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হতে পেরেছেন। কিন্তু এখানে পৌঁছাতে সব সম্প্রদায়েরই সময় লেগেছে। এটাকে নষ্ট করার অর্থ হল পেছন দিকে হাঁটা।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা