যেখানেই যাবে বাঙ্গালী, হৃদয়ে থাকে পহেলা বৈশাখ

মনিজা রহমান: অহংকার করাটা কি ঠিক?  ঠিক না। তবে কিছু বিষয় নিয়ে অহংকার ঠিকই করা যায়। যেমন আমার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য – পহেলা বৈশাখ।দানিয়া আর পেড্রোর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সেদিন আমি তাদের খুব উৎসাহের সঙ্গে হাত নেড়ে বাঙ্গালীর সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উৎসব নববর্ষের বর্ণনা দিচ্ছিলাম। ‘তোমরা শাড়ী চেন তো ?  ইন্ডিয়ান মুভি  দেখনি ?  আমরা সবাই ওইদিন লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পড়ি। আর খাওয়ার মেন্যু সাজাই ইলিশ ভাজা আর পান্তা ভাত দিয়ে… এখানে এসে আটকে গেলাম। পান্তা ভাত কি ধরণের খাবার সেটা ঠিক বোঝাতে পারছিলাম না।

দানিয়া ত্রিনিদিয়ান আর পেড্রোর বাড়ি মেক্সিকোতে। বয়স আর কত হবে?  বিশ বা বাইশ বছর জ্যাকসন হাইটসে আমার বাসার সবচেয়ে কাছের গ্রোসারিতে কাজ করে ওরা। নিয়মিত আসা যাওয়ার কারণে টুকটাক গল্প হয়। অতিথি পরায়ণ জাতি হিসেবে বাঙ্গালীর সুনাম বহু হাজার বছরের। আমি সেই দ্রাবিড় কন্যা ব্যাতিক্রম হবো  কিভাবে? নববর্ষের উৎসবে তাই নিমন্ত্রণ জানিয়ে বসি তাদের। অজানা, অচেনা এক অহংকারে মনটা ভরে যায়।

বাংলাদেশে লঞ্চ বা ইস্টিমারে যারা চড়েন বা চড়েছেন, তারা ঘাটে নামার আগে একটা শ্লোগান নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন। টার্মিনালের গায়ে লেখা থাকে- এই এলাকার মাটি/ অমুক ভাইয়ের ঘাটি। নিউইয়র্কে আসার পরে বহুবার ঘুরে ফিরে আমার এই লাইনটা মনে পড়েছে। যত দিন গড়াচ্ছে, যতই সূর্যের চারপাশে ঘুরে আসছে পৃথিবী আর বাড়ছে পৃথিবীর বয়স… ততই যেন নিউইয়র্ক হয়ে উঠছে বাঙ্গালীর ঘাটি। দিন দিন বাড়তে থাকা সেই বাঙ্গালীর প্রথম ও প্রধান উৎসব তো পহেলা বৈশাখই।

বাঙ্গালীর পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উত্তাপ এখন আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আছড়ে পড়েছে নিউইয়র্কে। রাত বারোটা বাজতেই শুরু হয়ে যায় উৎসবের আমেজ। নেচেগেয়ে, পান্তা ইলিশ খেয়ে আয়োজন করা হয় নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। দিনের বেলা থাকে পিঠা উৎসব। তাতে এত হরেক রকম পিঠা শোভা পায় যে বাংলাদেশেও এত সমারোহের দেখা মিলবে কিনা সন্দেহ। বার্গার আর ডোনাট খাওয়া মুখে, নিজ দেশের পিঠা কি যে সুস্বাদু মনে হয় যে বলার নয়। নিউইয়র্কে প্রত্যেক বাঙ্গালীর ঘরে, অফিসে, দোকানে বিশেষ দিনটিকে মনে রেখে চলে পান্তা-ইলিশ পর্ব। একটা দিনকে ঘিরে আয়োজন থাকে প্রায় তিন মাস জুড়ে। কর্মদিবসে কাজের চাপে যারা পহেলা বৈশাখ উপভোগ করতে পারেন না, তারা অপেক্ষা করে থাকে ছুটির দুই দিনের জন্য। দেখা যায় পহেলা বৈশাখ চলে যাবার পরেও, পরবর্তী দুই মাস ধরে নানা ধরনের মেলা, সাস্কৃতিক আয়োজন চলতে থাকে।

123

শুরুর দিকটা এত রমরমা ছিল না। নিউইয়র্কের নামকরা সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব নার্গিস আহমেদ তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলেন এভাবে- ‘দেখুন আমি নিউইয়র্কে আসি সেই ১৯৯১ সালে। তখন তো এখনকার মতো এত বাঙ্গালী ছিল না। পেশাজীবি কিছু মানুষ ছিল। পহেলা বৈশাখ নিয়ে আলাদা কোন আয়োজন করার কথাও কেউ ভাবতো না। ড্রামা সার্কেলের হয়ে আমিই প্রথম ১৯৯৫ সালে এখানে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। প্রথম আয়োজনটা ছিল আমার জ্যামাইকার বাসায়। যেহেতু বাসায় করা,তাই ৮০/৯০ জনের বেশী মানুষকে দাওয়াত দেয়া যায়নি। এজন্য দাওয়াত বঞ্চিতদের অনেকে রাগ করলো আমার ওপর। পরের বছর কস্তুরি কান্ট্রি ক্লাবে আয়োজন করলাম। তারপর ঢাকা ক্লাব, যার নাম এখন গুলশান টেরেস ক্লাব হয়েছে।’

তবে এবার ড্রামা সার্কেল পহেলা বৈশাখের আয়োজন করেছে এনটিভি ভবনে। ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকেই সেখানে ছিল খাবার দাবারের নানা আয়োজন। তারপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নার্গিস আহমেদের মতোই দীর্ঘদিন ধরে নিউইয়র্কে বাস করা বিখ্যাত নাট্যজন লুৎফুন্নাহার লতা জানালেন, ‘যত দিন যাচ্ছে এখানকার বাঙ্গালীদের মধ্যে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে উৎসাহ উদ্দীপনা প্রবলতর হচ্ছে।  আমার আর মার্ক ওয়েইনবার্গের (Marc Weinberg) যুগল জীবনে দ্বিতীয় পহেলা বৈশাখ। ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা আমার স্বামীকে নিজের দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করে দেবার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।’

বিকেলে এই দম্পতি সেজেগুজে বের হবেন পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন দেখতে। মার্ক পরবেন সাদা পাঞ্জাবী। আর লুৎফুন্নাহার লতা লাল পেড়ে সাদা শাড়ী। তিনি বলেন, ‘জানেন সাদা-লালের এই কম্বিনেশন আমার এত প্রিয় যে আমার বিয়েতেও লাল পেড়ে সাদা বেনারসী পরেছি।’

কেউ কেউ বলেন, দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যেমন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি এসব আয়োজনের মানও কমেছে। তবে এখানকার বৈশাখী মেলা শুধু নিউইয়র্কের স্থানীয় বাঙ্গালীদের আর্থিক ভাবে লাভবান করার পাশাপাশি  বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এসব মেলায় ভারতীয়-পাকিস্তানী স্টলের সমারোহ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এদিকে কাজের ব্যস্ততায় সবাই নির্দিষ্ট দিনে পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিতে পারবেন, তা কিন্তু নয়। কিন্তু তাদের অন্তরে ঠিকই থাকবে শিকড়ের টান। জ্যাকসন হাইটসে ১৮ বছর ধরে বাস করছেন দুই কন্যার জননী সেলিনা খান। তিনি বললেন, ‘কিছু করার নেই! ১৪ এপ্রিল থেকে সিটি টেস্ট শুরু হবে। ওই দিন কোনভাবেই পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব না। ১৭ এপ্রিল একটা ব্রেক আছে। তখন বাসায় সব আত্নীয়-বন্ধুদের নিয়ে অনুষ্ঠান করছি।’ এলমহার্স্টে বাসরত নাসরিন আক্তার জানালেন, ‘নিজেদের জন্য, ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু আয়োজন করতেই হয়। স্কুলে তো বাঙ্গালীর ঐতিহ্য সম্পর্কে ওদের জানানো হয় না। এসব জানানোর দায়িত্ব তো আমাদের। তাই না ?’

বাঙ্গালী যেখানে পহেলা বৈশাখ সেখানে.. ছিল, আছে, থাকবে। লুৎফুন্নাহার লতা খুব মনে দাগ কাটার মতো একটা কথা বললেন- ‘বাঙ্গালী যেখানেই যাবে। হৃদয়ে করে পহেলা বৈশাখকে নিয়ে যাবে।’ এভাবে সময় যত গড়াবে, বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসবে আরো বেশী আমোদিত হবে হাডসন নদীর এপারে অবস্থিত বিশ্বের রাজধানী হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্ক শহর।  (নিউইয়র্ক থেকে)