সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে…

Abul Hasan

কবি আবুল হাসান

আঠাশেই চলে গিয়েছিলেন হাসান, কবি আবুল হাসান। একচল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে তবু বাংলা কবিতার পাঠকদের কাছে আজও কী উজ্জ্বল তার স্মৃতি! গভীর তার কাব্য পাঠের অভিজ্ঞতা। আবুল হাসানকে মনে পড়লে তার তিনটি কাব্যগ্রন্থ আর স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে হয়। আজও তরুণ, তরুণীরা, সদ্য কবিতা লিখতে শুরু করা কবি তাঁর কাব্য পাঠ করেন। তাঁর সহগামী কবি-সাহিত্যিকেরা স্মৃতিচারণ করেন বিভিন্ন লেখায়।মাত্র আঠাশ বছর বয়সে আবুল হাসানের জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হয়েছিলো পিজি হাসপাতালে। বাইরে তখন নভেম্বর মাসের শীত। হয়তো ভোরবেলাতেই সেই শীতের রাতের আঁধারের মতো সামান্য কেঁপে উঠে আনমনে সবাইকে ছেড়ে, প্রিয় কবিতাকে পেছনে ফেলে হাসান চলে গেছেন অজানায়। কিন্তু বাংলা কাবিতায় তিনি হয়ে আছেন এক অনিবার্য নাম।

আজ লেখকদের লেখায়, স্মৃতিচারণে প্রাণের বাংলার পাঠকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাই এই কবির কাছে। এই শহরে ভীষণ বোহেমিয়ান এক জীবন যাপন করেছিলেন আবুল হাসান। তার এই উন্মূল যৌবন সঙ্গী ছিলেন আরেক অসাধারণ কবি নির্মলেন্দু গুণ। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আবুল হাসান সম্পর্কে লিখছেন-হাসান আর গুণ ভীষণ আর্থিক কষ্টের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতো। রাতে ওদের থাকার জায়গা ছিলো না। এক বন্ধুর কাছ থেকে আরেক বন্ধুর কাছে, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে, কখনো মসজিদে, লেখক সংঘের অফিসে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে বন্ধুদের রুমে মাটিতে শুয়ে ঘুমের পর্ব সারতো।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আরেক জায়গায় লিখছেন- আবুল হাসানের প্রকৃতি ছিল আশ্চর্য সরল আর মিষ্টি। ওর চোখদুটো ছিল স্নিগ্ধ মাধুর্যে ভরা। রাজনীতির হৈ-হাঙ্গামা থেকে দূরে একটা শান্ত প্রাকৃতিক জগতে ওর ছিল একাকী বিচরণ। ফিরে ফিরে মনে হয় কী সরলই না ছিল হাসান। কিন্তু মৃত্যু যে ওর এতো কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে আমরা কেউ-ই বুঝতে পারিনি। জন্মগতভাবে ওর হৃদপিন্ডের দুটো ভাল্ব নষ্ট ছিল।
প্রয়াত সাহিত্যিক আহমদ ছফা তার একটি লেখায় আবুল হাসানের লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছেন-হাসানের কবিতায় একটা ব্যাপার একেবারেই নতুন ছিল। একেবারেই জল-ঝর্ণার ধ্বনির মতো নতুন কিছু। এ এক অপূর্ব ধ্বনিময়তা, সংবেদনশীলতা। আমার মনে হয়েছে, বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এটা এক নতুন স্বাদ, যেন বিকশিত যৌবনের মতো কিছু একটা।
কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি লেখার শিরোণাম ‘ভালোবেসে যাকে ছুঁই সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে’। বলতে হয়না লেখাটি তার প্রিয়তম বন্ধু আবুল হাসানকে নিয়ে লেখা। এক জায়গায় গুণ লিখছেন-আমরা(আমি আর হাসান) সিদ্ধান্ত নিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝে-মাঝে পড়বো, ক্লাস করবো, ঘুরবো-বেড়াবো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করবার চেষ্টা করবো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারবো, কিন্তু ডিগ্রি লাভের চেষ্টা করবো না। পরীক্ষা দেবো না।
এই স্মৃতি গল্পের আরেক জায়গায় নির্মলেন্দু গুণ তাদের বোহেমিয়ান জীবনের কথা বলতে গিয়ে লিখছেন- নিয়নবাতিগুলো যখন জ্বলে উঠতো তখন আমরা যেতাম ঠাটারিবাজারে হাক্কার দোকানে। সেখানে জুয়ার আসর চলতো। ওখানেই পটের জুয়া খেলাটা আমাকে পায়। সামান্য যা পয়সা হাতে থাকে তা দিয়েই আমরা জুয়া খেলি। তারপর পেট পুরে চোলাই মদ পান করে কপর্দকশূণ্য হয়ে সাইকেল চালিয়ে ফিরে আসি পলিটেকনিক হোস্টেলে। হাসান চলে যায় গেন্ডারিয়ায়।
আবুল হাসানের আরেকজন বন্ধু কবি মহাদেব সাহা তার ‘কবি আবুল হাসান’ লেখার শেষে লিখেছেন- তবু মৃত্যুকে তিনি পরাস্ত করতে পারেননি, কোন মানুষের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। কেবল একজন কবিই তা জেনেও মৃত্যুকে এমন চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। হাসানের জীবন ও কবিতার মধ্যে প্রভেদ সামান্যই, শুধু এটুকু ভেবেই আজ বিষ্ময়বোধ করি।