আমি একটুখানি দাঁড়াব…

আশ্বিন মাসের আকাশ উজ্জ্বল অথচ উদাসী। আশ্বিনের হাওয়ায় সবসময় কিছু একটা হারানোর বেদনা লেগে থাকে। বিকেলের আকাশে থাকে কেমন এক বাউল রঙের আলো। এই লেখাটা যখন লিখছি তখনও দেখতে পাচ্ছি জানালার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে আশ্বিনের বিকেলেবেলার ম্লান আলো ছোঁয়া সেই আকাশ। কোথায় যেন বিসর্জনের সুর বেজে ওঠে। সত্যিই তো বিসর্জন। ২৭ সেপ্টেম্বর চলে গেলেন সৈয়দ শামসুল হক।আমাদের সাহিত্যের হক ভাই। মনের মধ্যে সেই বিসর্জনের সুর বেজে চলেছে।

ক্যান্সার আক্রান্ত ফুসফুসের জটিল অবস্থার কথা জেনেও লেখা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। একজন লেখককের পক্ষেই এভাবে বলা সম্ভব। কারণ তিনি তো মৃত্যুর চেয়েও বড়। বসে বসে তাঁর কবিতার বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছি। হঠাৎ একটি কবিতার ওপর চোখ আটকে গেল। কী বলে গেছেন আমাদের তিনি! কবিতাটির নাম ‘আমি একটুখানি দাঁড়াবো’। পড়তে পড়তে বিষ্ময় জাগে। তিনি লিখছেন-

আমি একটুখানি দাঁড়াব এবং দাঁড়িয়ে চলে যাব;

শুধু একটু থেমেই আমি আবার এগিয়ে যাব।

না, আমি থেকে যেতে আসিনি।

একজন লেখকের সারা জীবনের কাহিনি তো এই কয়েকটা লাইনে লেখা হয়ে গেছে অনেক আগে। সৈয়দ হক তো অমরত্বের আকাঙ্খা নিয়ে আসেননি এখানে। এসেছিলেন নিজের সৃষ্টির সবটুকু সৌন্দর্য ঢেলে দিতে। তা তিনি ঢেলে দিয়ে গেছেন বাংলাদেশের সাহিত্যে। সফল ভাবেই দিয়ে গেছেন। কবিতা লেখা দিয়ে শুরু করেছিলেন যাত্রা। তারপর লিখলেন উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটক, গান। সেই সৃষ্টির সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়লো হাওয়ায়। এই দেশ, দেশের মৃত্তিকা সংলগ্ন মানুষ, আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ, মানুষের গভীর মানসিক উত্থান পতন সবকিছু যেন একসঙ্গে ধরা দিল তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির মাঝে। সৈয়দ হক সত্যিই থামেননি কোথাও। কবিতায় যেমন বলেছেন-

এ আমার গন্তব্য নয়;

আমি এই একটুখানি দাঁড়িয়েই

            এখান থেকে

                 চলে যাব।

একটুখানিই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ৮১ বছর মহাকালের বিচারে সামান্য সময়। কিন্তু এই সময়ে বাংলা সাহিত্যের তল খুঁড়ে জাগিয়ে তুলেছিলেন এক অচেনা দ্বীপ, নতুন ঘূর্ণী। নির্মাণ করেছেন নতুন ভাষা, দেখার দৃষ্টি। জীবনমন্থন করে এইসব অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতাকে তিনি উপস্থাপন করেছেন বাংলা সাহিত্যের পাঠকের সামনে। কিন্তু নিজের উপস্থিতির সময়কে সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছেন তিনি কবিতায়। কত সামান্য অবেদন এই সৃষ্টার-এ গন্তব্য আমার নয়। এই বাক্যগুলো একজন লেখক যখন উচ্চারণ করেন তখন তাঁর দৃষ্টির গভীরতাকে খুঁজে পান পাঠক। লেখককের গন্তব্য তো বর্তমান নয়, তার পথ চলে যায় ভবিষ্যতের দিকে। কারণ সেখানেই তো লেখককের জন্য অপেক্ষা করে থাকে অমরতা।

কবিতাটির আরেক জায়গায় এসে সৈয়দ হক লিখেছেন-khelaram-khele-ja-syed-shamsul-haq

একটি দু‘টি তিনটি প্রজন্মকে ধরে আমি  একাধিক যুদ্ধ-একটি শান্তিকে ,nuruldiner-sarajibon-syed-shamsul-haq

একাধিক মন্বন্তর-একটি ফসলকে,

একাধিক স্তব্ধতা্-একটি উচ্চারণকে,

একাধিক গণহত্যা-একটি নৌকাকে,

একাধিক পতাকা, একটি স্বাধীনতাকে

শরীরে আমার বীভৎস ক্ষতের মধ্যে লাল স্পন্দনের মতো

                         অনুভব করতে করতে

এই যে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছি…

আমার এই অগ্রসর

        সে তোমাদের ভেতর দিয়েই অগ্রসর।

আমি একটি

         দু‘টি

             তিনটি

                    প্রজন্ম ধরে

তোমাদের ভেতর দিয়েই তো সর্বকাল চলে গেছে আমার পথ

এবং সর্বকাল আমি দাঁড়িয়েছি আমি আবার নিয়েছি পথ।

সৈয়দ হক কোন সর্বকালের ইঙ্গিত দিয়েছেন এখানে? এই মানুষের মধ্যে দিয়ে কোন পথের কথা বললেন তিনি? এই পথ মৃত্তিকা ঘনিষ্ঠ মানুষের পথ। এই পথ সময়ের চিরকালের পথ।তিনি এই দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি তাঁর কমিটমেন্টকেই প্রকাশিত করলেন কবিতাটির চরণগুলোয়। এই প্রবাহমান মানুষের কথাই তো তিনি বলেছেন নিজের লেখায়। বলেছেন তাদের জীবন রেখার কথা। শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়ে উঠেছে তাঁর সাহিত্যের ধ্রুব।, সর্বকালের পথ।

ইরাজ আহমেদ