আলোর অভিযাত্রী আইভি

রিয়াদুল হক

রিয়াদুল হক

পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যার গোলাপি আলো গায়ে মেখে পৌঁছে গেলাম ধানমন্ডির ইএম কে সেন্টারে ( এডওয়ার্ড কেনেডি সেন্টার) গাঁথা আয়োজিত উইমেন ইন সিনেমা অনুষ্ঠানটিতে যোগদান করতে। গাঁথা সত্যিকার অর্থে নারীর অধিকার ও সমাজের উন্নয়নে নারীর অগ্রগামী ভুমিকা নিয়ে কথা বলে। গাঁথার প্রতিষ্ঠাতা নিয়াজ জামান একজন অধ্যাপক।সেদিনকার অনুষ্ঠানটি ছিল সিনেমায় নারীর অবদান। তিনজন অতিথি যারা প্রত্যেকেই নারী। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ঢাকাই সিনেমার নায়িকা আর দুজন ছিলেন সিনেমা নির্মাতা।নির্মাতাদের একজন জান্নাতুল ফেরদৌস আইভি যার নিমন্ত্রনেই আমার যাওয়া।আইভি সম্বন্ধে নতুন করে বলার কিছু নেই। উনি একজন মানবাধিকার কর্মী।সব সময় সব পরিসরে নারী পুরুষের সর্বোপরিমান অধিকার নিয়ে কাজ করেন।তার শৈশব কাটে এলিজাবেথ মার্বেল প্রাইমারি স্কুলে।যেটা খ্রিষ্টান মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত। আলাপচারিতায় জানতে পারলাম যে সেই স্কুল থেকে পাওয়া মূল্যবোধ তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশ লিটারেচার নিয়ে গ্রাজুয়েশন করেছেন ২০০৫এ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে মাস্টার্স করেছেন ২০০৯ এ। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করেছেন shahosi golpo111২০১২ তে। সোশ্যাল কমপ্লাইয়েন্স নিয়ে বি আই এম (বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ) থেকে ডিপ্লোমা করেছেন।

তার কাজের অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক বিশাল।কাজের শুরু মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এডিডি নামক এক প্রতিষ্ঠানে যার হেডঅফিস লন্ডনে।হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল ওডিজাবেল রিহ্যাবিলিটেশন এন্ড রিসার্চ এ্যাসোসিয়েশন।রিফিউজি মুভমেন্ট নিয়েও কাজ করেছেন। মুলত নারীও শিশু অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেন।

অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ছিলেন তিনি।সেখানে প্রত্যেকেই সিনেমার প্রতি তাদের ভালোবাসা নিয়ে কথা বলেন।আইভির চাকুরী জীবনে বিভিন্ন এনজিও তে কাজ করেছেন।এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন।আইভি তার পরিচালনা নীরবে নিয়ে কথা বলছিলেন।সিনেমাটি দেশে এবং বিদেশে অনেক সুনাম কুড়িয়েছে। এদেশে

ইন্টারন্যাশনাল ফিল্মফেস্টিভ্যালে দেশীবিদেশী পরিচালকদের সুনাম কুড়িয়েছে ছবিটি।সত্য ঘটনা নির্ভর ছবিটিতে কিভাবে নারীরা স্ব-স্বপেশায় নিগৃহীত হয় তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।এছাড়াও ছবিটি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এসেম্বলি মিটিং, ইউনিভার্সিটি অব উইস্কন্সিন আমেরিকায় জেন্ডার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টে বিশ্ব নারীদিবস উপলক্ষে প্রদর্শিত হয়েছে।এছাড়াও কাইনাইস্কিনো ফিল্মফেস্টিভ্যাল হেলসিঙ্কি,ফিনল্যান্ডে প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে চ্যানেল আইতে প্রদর্শিত হয়েছে।আইভি সঙ্গে আলাপচারিতায় আরও জানতে পারলাম তার জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পার করে তিনি সিনেমাটি তৈরি করেছেন। ১৯৯৭ সালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আইভির শরীরের ৬৫ ভাগ পুড়ে যায়। জীবনের চলার পথ ধীরেধীরে কঠিন ও বন্ধুর হয়ে পড়ে।অতিচেনা মুখগুলো যেন হঠাৎ অচেনা হতে শুরু করে। যে জায়গাগুলো ছোটবেলায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে সে জায়গাগুলো অচেনা হয়ে যায়।পরম বন্ধুত্বের সিক্ত হাতগুলো একে একে ছুটে যায়। যাদের বিপদে একদা আইভি নিজেই ছুটে যেতো, সেই চেনা মুখগুলো যেন আইভির সেই বিধ্বস্ত রূপ মেনে নিতে পারছিলোনা। যে রঙিন শৈশবে মানুষ স্বপ্ন দেখে আকাশ ছোবার সেই সময় আইভি জীবনকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ করেছেন। শরীরে ২৫-৩০ বার অস্ত্রোপচার হয়েছে ধারাবাহিক ভাবে যা আইভিকে ক্রমে ক্রমে সাহসীও আরও শক্তিশালী করে তুলেছে নিজের লক্ষ্য পৌঁছানোর নিমিত্তে।

shahshi golpo333কি ভাবছেন গল্পের শেষ এখানেই।নাহ!! আইভি নতুন প্রেরনায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে।তার এই যুদ্ধে তার সঙ্গে ছিল তার বাবা –মা এবং ভাইবোন।আইভি করুণার পাত্র হয়ে থাকেনি।একে একে অনেকগুলো বছর পার হয়েছে। এযেন এক ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।আইভির শরীরে একের পর এক অস্ত্রোপচার হয়।সেই কঠিন মুহূর্তে আইভির চিকিৎসক আইভিকে প্রশ্ন করেছিল, তুমি বিউটি চাও না কি ফাংশানাবিলিটি? উত্তরে আইভি বলেছিল, ফাংশানাবিলিটি!! আইভি সত্যি এরপর ঘুরে দাড়ায়।নিজের সুস্থ রূপকে অসুস্থ দেখে অনেকেই মুখ থুবড়ে পরে জীবনের খেই হারিয়ে ফেলে কিন্তু আইভি যেন জীবনের নতুন উদ্যম খুঁজে পেল।মনের কোনে নিজের এই রূপকে অবলোকন করে সিদ্ধান্ত নিল সে শারীরিক ভাবে যারা অক্ষম তাদের পাশে দাঁড়াবে।সাহিত্যর সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটালেন নিজের জীবন গাঁথা এবং তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প দিয়ে।বইটির নাম ‘স্বপ্ন নির্মাণ প্রয়াস’।বইটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।দ্বিতীয় বই ‘‘ Princess of burnt Soul”।

এছাড়াও কালজয়ী লেখক আহমেদ ছফার স্মৃতিতে রচনা করেছেন আহমেদ ছফা অপরাহ্ণের সূর্য।এবং সর্বশেষ কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার নিয়ে নীরবে চলচ্চিত্র দিয়ে পরিচালকের খাতায় নাম লেখান। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট পেয়েছেন নারীর অধিকার নিয়ে বিশেষ অবদানের জন্যে।বর্তমানে ভয়েস এন্ড ভিউস নামে একটি ছোট এনজিও প্রতিষ্ঠা করেছেন।যেটা নারীদের অধিকার ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করে।নরসিংদীতে একটি স্কুল পরিচালনা করছেন যা গ্রামের শিশুদের ও বয়োজ্যেষ্ঠদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করে।