বড় অভিমানী ছেলেটি…

জয়দীপ রায়

জয়দীপ রায়

আমার সবথেকে কাছের পাহাড় আরাবল্লী। শীতকালের ঘন আরাবল্লী। গরমকালের পোড়াজ্বলা আরাবল্লী। বর্ষার কার্পেট সবুজ আরাবল্লী।
আজকাল প্রায় প্রতি মাসেই আসতে হয় বলে কালিম্পং পাহাড় থেকেও কাছে চলে এসেছে আরাবল্লী পর্বতমালা। ছোটবেলার ভূগোলের ক্ষয়জাত পর্বত। ছোটনাগপুরের ছোট ছোট পাহাড়ের থেকেও কাছে। এমনকি বরন্তির লেকের উপরে একলা দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়টার থেকেও টেনেহিঁচডে দূরত্ব কমিয়ে ফেলেছে আরাবল্লী।
রাজনগর থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে কেলওয়াড়া হয়ে কুম্ভলগড়ের দিকে। পাহাড়ী রাস্তা। পথে গ্রামগুলো পড়ে অদ্ভুত নামের। আরণা, শাপোল, থোড়িয়া, ধৌলিখান। বিভিন্ন নামের দেশজ গ্রাম। এগুলো সবই আসলে বিভিন্ন মার্বেলের নাম। প্রতিটা গ্রামেই মার্বেলের মাইনস্। যে গ্রামে পাওয়া যায় সেই গ্রামের নামেই নাম।
রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে ক্রমে পাহাড়ের ক্ষত শুকিয়ে যায়। মাইনিং এরিয়া পেরিয়ে গেলেই শুরু হয়ে যায় চাষবাস। রাস্তা ঘুরতে ঘুরতে ওঠানামা করতে থাকে। কোনও বাঁকে কলাগাছে মোচা ঝুলে থাকে, কেউ খেতে জানে না। কোন বাঁকে প্রাচীন কুয়ো থেকে দুটো গরু ঘুরতে ঘুরতে কপিকল দিয়ে জল তুলে ক্ষেতে পাঠায়। আর জমিতে জন্ম নেয় স্বাদু ফসল।
প্রখর গরমের দুপুরে এই রাস্তা চোখ ধাঁধিঁয়ে দেয় বাইক আরোহীর। রাস্তাভর্তি পড়ে থাকা পাতলা ব্লেডের মত মাইকার পাত আয়নার মত করে সূর্য নামায় চোখে। বৃষ্টির সময় কোনও কোনও বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকে গ্রামের সবুজ মেয়ে, কোঁচড়ভর্তি আতা নিয়ে। দশটাকায় এই অ্যাত্তো সীতাফল। মিষ্টি, গন্ধয়ালা। আর শীতকালে, যখন ধুলোও ঠান্ডায় কাবু হয়ে যায়, তখন গাড়ির পিছন পিছন এখনও দৌড়ায় ছেলেবেলা।
এই রাস্তাতেই আসে জনমানবহীন সুন্দর সুন্দর বাড়ির গ্রাম। গ্রামে কোন মানুষ থাকে না। শুধু খালি বাড়িগুলো থাকে থরে থরে। এখানকার মানুষরা সবাই বম্বে থাকে। সোনার ব্যবসায়ী । বছরে একবার দু’বার সবাই একসাথে আসে। বিয়ে অথবা কোন পরবে। কোলাহchobiলমুখর সেই সময়ের জন্যে গজিয়ে উঠেছে ব্যাঙ্ক, এটিএম। যতবারই যাই এই রাস্তা দিয়ে, ভাবি এবারই হয়তো দেখবো গ্রামভর্তি মুম্বাইয়ানা। কিন্তু কোনও ছাদেই কোন কাপড় মেলা থাকে না। ভুতুড়ে গ্রাম পার হয়ে যাই দিনে দিনে।
একসময় রাস্তা গিয়ে ধাক্কা খায় ঘন নীল জলের কেলওয়াড়া লেকে। আরাবল্লীর অসংখ্য সুন্দর সুন্দর পাহাড়ঘেরা লেকের একটি। এবার বর্ষায় জলে ভিজে প্রায় রাস্তা ছুঁয়ে ফেলা লেক। এরা বলে তালাও। রাস্তা তালাওকে জায়গা দিয়ে পাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে চলে।
আর সব রাস্তার মত এই রাস্তা দিয়েও যেকোন দিকেই চলে যাওয়া যায়। যাওয়া যায় কুম্ভলগড় ফোর্টের রাজকীয়তায়, যেখানে সাইকেল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে সুদূর দিল্লি থেকে পৌঁছে যায় একদল ভিনদেশী প্রৌঢৄ প্রৌঢৄা। যাওয়া যায় বাদলমহলের উঁচু বনবাংলোয়, মেঘ যেখানে নেমে এসে ঘিরে ধরে প্রিয় ফরেস্টারকে। এখান থেকেই রাস্তা যায় জিপসি করে লেপার্ড, চিঙ্কারা, চৌশিঙা, নীলগাই দেখতে আরও গভীর জঙ্গল ঘনেরাওতে।
আর যাওয়া যায় পল্লবের কাছে। রণকপুরের পথে সায়রার কাছে জঙ্গল পাহাড় ঝর্ণা ঘেরা অরণ্যবাস রিসর্টে। পল্লব বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে চলে আসা, পনেরো বছর আর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা, সারা ভারত ধরে নানান কাজ করে বেড়ানো এক পরিচয়পত্রহীন ক্ষ্যাপা ষাঁড়। অরণ্যবাসের ম্যানেজার। নিজের হাতে ভালবাসায় সাজিয়ে তোলা নিঃশ্চুপ পাহাড়ি রিজর্টের এক বাঙালি সেনাপতি। যে আপনার জন্য ওই ভরা জঙ্গলে কিভাবে মহুয়া জোগাড় করবে, কেউ টের পাবে না। ফাইন ডাইনিংয়ের ব্যবস্থা করবে, দুপুরের পাতে আমার পাঠানো ক্যুরিয়ারের বীজে তৈরী পুঁইশাকও খাওয়াবে। তারপর কাউকে কিছু না বলে, নিজের সদ্য ধরা পড়া ক্যান্সারের কথা পৃথিবীর কাউকে না জানিয়ে টুক করে নিজের ঘরে গিয়ে গোপনে সুইসাইড করে ফেলবে।
এক পৃথিবী অভিমান নিয়ে যে এরকম নি:শব্দে চলে যায়, কোন রাস্তা দিয়েই শেষপর্যন্ত আর তার কাছে পৌঁছনো যায় না।