দ্বিধার দোলাচলে বেড়ে ওঠা

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা

শুরু হয়ে গেলো গান নিয়ে কঠিন সাধনা।আব্বা যা পারেন তাই আমাকে শিখিয়ে দেন,সেগুলোই আমাকে দিনের পর দিন গেয়ে যেতে হয়।আব্বার গ্রামের ভাতিজা জালালউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ওস্তাদ ফজলুল হক সাহেবের ছাত্র।তিনি ওস্তাদের কাছে যা শেখেন তা আমাকে আবার জালাল ভাই শিখিয়ে দেন।সেগুলো দিয়েও গলা সাধি।নিজেদের হারমোনিয়াম নাই।জেসমিন নানী তার হারমোনিয়াম দিয়ে রেখেছেন।তা দিয়েই কাজ চলে।জালাল ভাইয়ের বন্ধু তোফাজ্জল ভাই,মেসের ভাই যা পারেন শিখান।আর আমি টেপ রেকর্ডার, তা তুলে ফেলি মুহুর্তে।ওনারা আব্বাকে বলেন,খালু,এ মেয়ে তো বিস্ফোরক! আমি অর্থ বুঝিনা, তবে এটা kataghuri10Octবুঝি আম্মার চোখ বিস্ফারিত হচ্ছে আমাকে দেখে রোজ রোজ।গান ভীষন ভালো লাগতে থাকে।কি ভীষন তার পরিধি! কত রকম গান! এক নজরুল সংগীতেই সুরের কিনার,পাড়,কিছুই শেষ হয়না।তায় লালনগীতি!

সব কিছু গোগ্রাসে গিলতে থাকি।আব্বা শিখান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কিছু গান,আহা! গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু, ত্রীবেনি তীর্থপথে কে গাহিল গান, মধুবন মে রাধিকা নাচেরে,আজারে ম্যয়তো কবসে খাড়ি ইস পার।অর্থ বুঝিনা কিন্তু বুঝি এসব স্বর্গীয়। আব্বাকে জাদুকর মনে হয়।গান নিয়ে রাগ করে থাকলেও মা জননী কে মনে হয় স্বর্গীয় পরী।পা পর্যন্ত চুল,কানের ছোট ঝুমকা,আয়ত চোখে পুতুলের মত ঘন পল্লব।তার সুমিষ্ট হাসি,রাগতঃ কটাক্ষপাত, দেখে মনে হয় আব্বা গানের জাদুকর আর মা আমার সুরের আস্ত পদ্মপুকুর।

একটা পরস্পর বিরোধী ভাবনা আমার ভেতর গড়ে ওঠে।নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করি।গান কে সবচে ভালবাসি আবার তাকেই মনেপ্রাণে অপছন্দ করি।এই ভাবনাটা আমার জীবনের সবচে কঠিন অধ্যায়। আমি মুলতঃ ভীষন ধর্মানুগামী, ধর্মানুরাগী, পর্দানশীন মানুষ কিন্তু গান, ছবি আঁকা ভালবাসি। আমাদের সমাজ যা এক ভাবে দেখে না।আমি নিজেই নিজের সঙ্গে যুক্তি খন্ডাই।ধর্মভাবনা আমাকে খুব শক্তিশালী বাঁধনে কোন এক অদৃশ্য রক্ষণশীলতায় বেঁধে রাখে।এর গন্ডি থেকে আমি বের হতেই পারিনা।যত দিন যায়, গান এ আমার সময় যত বেশী খরচ হয়,ততই আমি কঠিন ধর্মকর্মে জড়িয়ে পড়ি নিজে নিজেই।শ্রষ্টাকে কে একবার সুরে খুঁজি, একবার বিজ্ঞান এ খুঁজি, একবার প্রকৃতি তে খুঁজি,একবার প্রাণের স্পন্দনে খুঁজি।আমার ভাবনার দ্বার প্রচন্ড রকম বিস্তৃত হয়ে যায়।সুযোগ মত আম্মা তাঁর বিশাল বইয়ের ভান্ডারে নিয়ে ফেলে দেন এই আমাকে।সেখানে তারাশংকর,বিভুতিভুষন,সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়,সমরেশ বসু,সমরেশ মজুমদার, প্রতিভা বসু,জীবনানন্দ দাস,রবিঠাকুর, নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দোপাধ্যায়,যাযাবর, এঁদের কাছে সঁপে দেন,বাবা ছোঁ মেরে নিয়ে যান লালনের কাছে চাঁদনী রাতের তাঁরা খচিত আকাশের নীচে।পৃথিবী আমার কাছে নিজেকে মেলে ধরতে ধরতে আবার রহস্যের আবরণে নিজেকে ঢেকে নেয়।আমি এইসব ভাবনার দোলাচলে বিজ্ঞান,সুর,প্রকৃতি, ইশ্বরভাবনা, সমাজ সংসার, সব কিছুর আপাতঃ জাঁতাকলের চিপায় পড়ে দুলতে থাকি আমার ছোট্ট ভাবনার চিলেকোঠা নিয়ে।এভাবেই দ্বিধার দোলাচল আর আশার ভাবনায় আমি, এই আমি, আপনাদের কনকচাঁপা বড় হতে থাকি।