পুজোবাড়ি এবছর অনেকটাই খালি…

rini-2

রিনি বিশ্বাস

পুজোয় কলকাতা থাকা যেমন মাস্ট তেমনিই লক্ষ্মীপুজোয় দেশের বাড়ি যাওয়াও.. তোড়জোর শুরু করি আগেভাগেই! আমাকে এই শহর কলকাতায় দেখে কেউ ভাবতে পারবে যে দেশের বাড়ি পা দেওয়া ইস্তক আমি শাঁখা-সিঁদূর পরা-ঘোমটা টানা-ঘোষবাড়ির বউমা হয়ে যাই! যেসব বন্ধুরা আমার শর্ট ড্রেস বা হাফ প্যান্ট পরা ছবি মনে করে ভাবছ ‘ইহা নিতান্তই অসম্ভব’ তাদের জন্য ছবিও তুলে রেখেছি, প্রমাণ চাইলেই বের করে দেখিয়ে দেবো.. তো বিয়ের পর প্রথম যেবছর গেলাম কেশবপুর-(আমাদের দেশের বাড়ি, মানে শ্বশুরবাড়ি), সেবছর সেটা ছিল আমার কাছে বড়সড় চ্যালেঞ্জ! তিনদিন সর্বক্ষণ শাড়ি পরে থাকা?! সেও কি এই অধমের পক্ষে সম্ভব!! তার উপর দেবদ্বিজে ভক্তি যেহেতু জন্মাবধি জন্মায়নি তাই চিন্তা তা নিয়েও! ঠাকুর দেখে যে দুহাত জড়ো ক’রে সবাই দিব্যি নমো করে, আমার দ্বারা তো তাও হবেনা! প্রথম মুহূর্তেই বড়মা(আমার বড় জেঠিশাশুড়ি) আমাকে বকুনি দেবেনই! এর সঙ্গে আছে নিরামিষ খাওয়া! খাই কতটা তা নিয়ে প্রশ্ন করা চলবেনা, কিন্তু মাছ, ডিম বা মাংস ছাড়া খাদ্য মোটেই মুখে যে রোচেনা সে খবর চেনাজানা সক্কলের জানা! অতএব বুক ঢিপঢিপ!

কিন্তু কি অবাক কান্ড!! কোথাও কোন অসুবিধে হল না তো! শাড়ি পরে ঘুমোনোটা একটু মুশকিল মনে হলেও তা ম্যানেজ করতে বিশেষ বেগ পেতে হলনা.. বাড়িটা আমাদের দোতলা। কিন্তু স্নানঘর নীচে। উঠোনের একপাশে! ওটিকে বাগে আনতে একটু ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল, অস্বীকার করে লাভ নেই! বাড়ি ভর্তি ভাসুর-দেওর এবং তাদের ছানাপোনা! তাদের মাঝখান দিয়ে কলঘরে ঢুকে স্নান সেরে শাড়িটা কিভাবে পরে বেরোনো যেতে পারে এ নিয়ে চিন্তার অন্ত ছিলনা আমার! ফলস্বরূপ, ‘rini-3আরেকটু পরে স্নানে যাই সেজদি?’ .. যতটা সময় পাওয়া যায় আর কি! আর সবাই কিকরে ম্যানেজ করছে সেটা দেখলেও তো আন্দাজ করতে পারবো! হলও তাই। পেরে গেলাম সেটাও! সব্বার সঙ্গে টানা বারান্দায় আসন পেতে বসে দিব্যি ডাল আলুভাজা পোস্ত দিয়ে ভাতও খেতে পারলাম! নাপিতবৌয়ের কাছে আলতা পরে, লক্ষ্মীদালানে ফুলদির আল্পনা দেওয়া দেখে, পুজোর সময় বড়দি, সেজদির সঙ্গে সঙ্গে থেকে-শিখেও গেলাম অনেককিছু! গতবার তো ঠাকুর বরণ করতেও শিখে গেলাম.. অন্যদের সবই জানা ছিল, আমিই শিখলাম ‘পেথ্থম থেকে শেষ’.. মা লক্ষ্মীকে বরণ করে, দুধ আলতা মেশানো জলে পা ধুইয়ে দিয়ে, সিঁদূর পরিয়ে দিয়ে, মিষ্টি আর পান খাইয়ে – কানে কানে কি একটা বলতে হয়, তা দেখেছিলাম আগে, গতবার জানলাম বলতে হয় ‘আবার এসো, মা’.. কোন পাষন্ড এই কথা বলেও চোখের জল না ফেলে থাকতে পারে, বলো তো!! আমার তো এমনিতেই ছিঁচকাঁদুনে বদনাম! আমি যে কেঁদে আকুল হবো তাতে আর আশ্চর্য কি!

গাড়িটা যেই পাকা রাস্তা ছেড়ে ছোট্ট মেঠো পথ ধরে, তখনই ভেতরে ভেতরে শুরু হয় উত্তেজনা .. আর একটুখানি সময়; তারপরেই সেই স-ব মুখগুলোর সঙ্গে দেখা হবে, যাদের জন্য বছরভর অপেক্ষা করি.. গাড়ি থামলেই বাড়ির ভেতরে কিভাবে যেন খবর চলে যায় –
গাড়ি থামতে যা দেরি, পাবলো তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে অদৃশ্য! তার আর টিকির দেখাও মেলেনা বহুক্ষণ! চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে নিই প্রতিবার, গতবছরের থেকে এবারে কি বদলালো কিছু?! গতবার বদলটা চোখে লেগেছিল; মনেও…. বড়মা নেই! পুজোবাড়িতে বড়মার থাকা আর না থাকার মধ্যে অনেকটা ফারাক!

এবারও আমরা রওনা হয়েছি শহর ছাড়িয়ে ‘কেশবপুরে’র দিকে.. পুজোবাড়ি এবছর অনেকটাই খালি, স্বদেশদা অসুস্থ-বাড়ি নেই ; ন’দা-ন’দিও নেই.. মনখারাপ ওদের জন্য আবার এরমধ্যেই পৌঁছেও গেছে অনেকে..

শহর যাচ্ছে দূরে সরে আর পাবলোর চোখমুখও যাচ্ছে বদলে -অন্য আনন্দ এখন ওর সবটা জুড়ে; সারাবছর ধরে অপেক্ষার পর আরো একবার নতুন করে ‘সবুজ’ হতে সেও তৈরি..