শিশুর হিক্কা হলে কি করবেন…

kollol-jpg

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

হিক্কা বা হেঁচকির প্রকোপ কোনো বড় ধরনের স্বাস্থ্যবিপর্যয় না হলেও এটা বেশ বিরক্তিকর হতে পারে। একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে এবং যেকোনো কারণে ডায়াফ্রাম নামে মাংসপেশির সঙ্কোচন হলে ও ভোকাল কর্ড বা স্বরতন্ত্রী হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে হিক শব্দ তৈরি হয়। ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদা হলো সেই পাতলা মাংসপেশি যা উদর থেকে বক্ষগহ্বর পৃথক করে রাখে। বদহজম, খুব দ্রুত খাবার খাওয়া বা পান করা, খালি পেটে হাসা ও অবসাদ এ রকম কিছু বিষয় হিক্কা ঘটাতে পারে।
হিক্কার অনেক কারণ থাকলেও এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুব কম। এ কারণে হিক্কা উপসমে বৈজ্ঞানিক সমাজ সুনিশ্চিত চিকিৎসা দিতে পারেনি। একেকজন একেক পদ্ধতির কথা বলে থাকেন। তবে এর অনেক পদ্ধতিই কোনো কোনো সময় ভালো কাজ করে। এখানে বেশ কিছু পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হলো যেগুলো অনুসরণ করে আপনি আপনার শিশুর হিক্কা বন্ধ করতে পারেন :
খুব ছোট শিশুদের জন্য
শিশুর পিঠে চাপড় দিন।যদি আপনার শিশুর হিক্কা ওঠে, ওকে আপনার কাঁধের ওপর খাড়া করে নিয়ে তার পিঠে আস্তে আস্তে চাপড় দিন। কিছু শিশু বোতলে দুধ খাওয়ার সময় প্রচুর বাতাস গিলে ফেলে। আর এত বাতাস গিলে ফেলার কারণে তার পাকস্থলী ফুলে ওঠে যে কারণে হিক্কা ওঠে। এ ক্ষেত্রে শিশুর পিঠে ধীরে ধীরে চাপড় দিলে বাতাস ওপরে উঠে আসে ও হিক্কা বন্ধ হয়ে যায়। baby_2
দুধের বোতলের বোঁটা পরীক্ষা করুন
যদি দুধের বোতলের বোঁটা বা মুখের ছিদ্রটা ভুল মাপের হয় তা হলে শিশু প্রচুর বাতাস গিলে ফেলতে পারে এবং এর ফলে হিক্কা ওঠে। কী করার আছে আপনার? আসলে বোতলের বোঁটার ছিদ্রটা এমন হতে হবে যাতে আপনি বোতল উপুড় করে ধরলে ফোঁটা ফোঁটা দুধ পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে পড়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি দেখেন যে বোতল উপুড় করে ধরলে মুক্তভাবে দুধ পড়ছে কিংবা আদৌ দুধের ফোঁটা পড়ছে না তাহলে বুঝবেন, বোঁটার ছিদ্রের মাপে ভুল রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আপনি বিভিন্ন ধরনের বোতল ও বোঁটা দেখে বেছে নেবেন কোনটি আপনার শিশুর জন্য ভালো কাজ করবে।

শিশুকে খাইয়ে যান

শিশুর হিক্কা থাকলে, কিন্তু এ দিকে শিশুর খাবার সময় হয়ে গেলে শিশুকে দেরি করে খাওয়াবেন না। আপনার শিশুর খাবারে হিক্কা কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না বরং খেলে হিক্কা চলে যেতে পারে।

শিশুকে অতিরিক্ত খাওয়াবেন ন।
শিশুর জন্মের প্রথম কয়েক মাসে যদি আপনার শিশুর খাবার গ্রহণের পরপরই হিক্কা ওঠে তাহলে বুঝতে হবে অতিরিক্ত খাবার হলো হিক্কার কারণ। শিশুকে একবারে বেশি পরিমাণ খাবার না খাইয়ে অল্প অল্প করে ঘন ঘন খাওয়ান। যদি আপনার সন্দেহ হয় যে, আপনি শিশুকে অতিরিক্ত খাইয়ে ফেলছেন, তাহলে শিশুকে নিজের তৈরি সময়সূচি অনুযায়ী না খাইয়ে তার চাহিদা অনুযায়ী খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। শিশু আর খেতে না চাইলে তাকে কখনোই জোর করে বেশি খাওয়াবেন না।
বড় শিশুদের জন্য
একনাগাড়ে পানি খাওয়ান ।যদি আপনার শিশু দুটো বা তিনটে হিক্কা বাদ দিয়ে গিয়ে অনেক্ষণ ধরে পানি পান করতে পারে, তাহলে হিক্কার চক্রটা ভেঙে যাবে এবং হিক্কা বন্ধ হবে। এভাবে হিক্কা বন্ধ করার জন্য আপনার শিশুকে বাতাসের জন্য না থেমে এক নিঃশ্বাসে ১০ চুমুক পানি পান করান।
চামচে করে কিছুটা চিনি দিন
যদি আপনার শিশুর বয়স দুই বছরের বেশি হয়, তাহলে তাকে চা চামচে করে কিছু চিনি বা মধু খেতে দিলে উপকার পেতে পারেন। এ ব্যবস্থা সব সময় কাজে না-ও আসতে পারে, কিন্তু শিশু নিঃসন্দেহে এটা উপভোগ করে।
নিঃশ্বাস ধরে রাখার প্রতিযোগিতা করুন
কত বেশি সময় আপনার শিশু শ্বাস বন্ধ করে রাখতে পারে তার একটা প্রতিযোগিতা আহ্বান করুন। এই নিঃশ্বাস বন্ধ রাখার ব্যায়ামটাকে আপনি একটা খেলা হিসেবে উপস্থাপন করবেন। যদি আপনার শিশু অনেক্ষণ দম বন্ধ করে রাখতে পারে, তাহলে তার ফুসফুসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং এতে শিশু হিক্কা থেকে রেহাই পাবে।
child-clothes-1কিছু শিশুর হিক্কায় করার কিছু নেই
এখানে একটা ধাঁধা দেয়া হলো কেউ একজন একটা জনাকীর্ণ ট্রেনে আধঘণ্টা ধরে হিক্কা তুলছে এবং এ ব্যাপারটা মাত্র একজন মহিলাই জানেন, কিন্তু তিনি নিজে হিক্কা তুলছেন না। তাহলে কে হিক্কা তুলছে? এর উত্তর হলো ওই মহিলার গর্ভস্থ সন্তান। এটা কি অসম্ভব ব্যাপার? মোটেই না।
গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ভাগে অনেক শিশুর দিনে কয়েকবার হিক্কা ওঠে, আর এটা তার মা অনুভব করতে পারেন। গর্ভস্থ শিশুর হিক্কা তার মা ২০ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে অনুভব করেন।
আর এ ধরনটা শিশুর জন্মের পর কিছু দিন চলতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের হিক্কা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও বিপদমুক্ত।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
হিক্কা সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু কিছু দুর্ভাগা লোক হিক্কায় কয়েক ঘণ্টা, কয়েক সপ্তাহ এবং খুব কমপক্ষে কয়েক বছর ভুগে থাকেন। যদি আপনার শিশুর হিক্কা এক দিন বা তার বেশি স্থায়ী থাকে, তাহলে আপনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কোনো কোনো সময় কোনো রোগের উপসর্গ হিসেবেও হিক্কা দেখা দিতে পারে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল  চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।