আমার ট্রাইপ্যানোফোবিয়া সলমন

প্রিয়ম সেনগুপ্ত

প্রিয়ম সেনগুপ্ত

ছোটবেলা থেকে আমার ট্রাইপ্যানোফোবিয়া ছিল। মানে ইঞ্জেকশন বা ব্লাড টেস্টে ভয়। আরও গোদা বাংলায় নিডলে ভয়। জন্ডিস হল যেবার, ভয়ে ঠকঠকিয়ে কাঁদতাম, বাবারে, আবার তো কদিন পরে বিলিরুবিন টেস্টের জন্য ব্লাড নিতে আসবে। পেঁপে সিদ্ধ খাওয়া কিংবা বিরিয়ানি থেকে বঞ্চিত হওয়ার চেয়েও বড় ভীতি ছিল ওই সকালে ব্লাড টেস্ট করতে আসার আতঙ্ক।
সেই আমি, একদিন দুম করে ব্লাড দিতে রাজি হয়ে গেছিলাম। কেন বা কী হিড়িকে পড়ে সেটা স্পষ্ট মনে নেই। তবে দিয়েছিলাম। অ্যাপোলো হসপিটালে গিয়ে। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম, এই বুঝি নিডল ফুটল। রক্ত নিচ্ছিলেন যে দক্ষিণ ভারতীয় নার্সটি তিনি এমন সময় মাথায় টোকা মারলেন। হাসি মুখে দেখালেন, ‘নিডল তো ঢুকিয়ে দিয়েছি। এখনও ওরকম করছেন কেন?’ সত্যিই তো। দেখলাম যতটা ভাবি অতোটা তো লাগেনি। ভয় সেদিনের পর থেকে অনেকটা কেটে গেছিল। তবে পুরোটা না। বাকিটুকু কাটালেন সলমন খান। আজ্ঞে হ্যাঁ। সলমন খানই। নিন এবার একদফা হেসে নিন। তারপরে বাকিটা বলছি।
হয়েছে? এবার তাহলে শুনুন।গালাগাল করুন, প্যাক দিন, ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকান কিংবা আমার মানসিক অপরিণত গঠন নিয়ে খিল্লি করুন, তবু দিনের শেষে সত্যিটা হল আমি সলমন খানের ভক্ত। যাকে বলে অন্ধ ফ্যান। যতবার টাটা মেডিক্যালে আমি ব্লাড দিতে গেছি কোনও না কোনও বার সলমন সংক্রান্ত কোনও ঘটনা আমার সাথে ঘটেছে। কোনওবার যিনি নিডল ফোটাতে এসেছেন, তাঁর ফোনের রিংটোন তেরে নাম, কোনওবার সামনের দেওয়ালে টাঙানো টিভিতে চলেছে সলমনের গান। যে শাটলে করে এয়ারপোর্ট থেকে হসপিটাল অবধি এসেছি, সেখানে সলমনের গান চলে-salmanছে ব্যাক টু ব্যাক—এটা তো দু’বার ঘটেছে। আমি ছোটবেলায় পরীক্ষা থাকলে সলমনের ছবিতে প্রণাম করে যেতাম। বিয়ে করতে যাওয়ার সময় মা-বাবার পরে মনে মনে সলমনের মুখ স্মরণ করেছি। স্টেজ শো-তে উঠে গিটার প্লাগ ইন করার সময় যে দু’জনের নাম নিই সলমন তাঁদের মধ্যে একজন। তাই রক্ত দেওয়ার সময় যে সামান্য ভয় এখনও থাকে, সেটা ওই সলমন সংক্রান্ত ঘটনা ঘটার পরে যে পালাতে পথ পায় না, সেটা গেস করার জন্য কোনও পুরস্কার নেই। আমি ধর্ম বা সো কলড ভগবানে বিশ্বাস করি না। অলৌকিক কিছুতেও করি না। তবু জানি না কেন এটা হয়। এবং আমার সঙ্গেই হয়। কাকতালীয় ঘটনা কি এতবার ঘটতে পারে?
অনেকেই জানেন আমার বাবার ক্যানসার হয়েছিল। এখন বাবা প্রায় সুস্থ। এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। বাবার অসুখের সময় দেখেছি রক্তের প্রয়োজন কতটা কীভাবে হয়। রোহিতের সময়, আরও কয়েকজনের দরকারে যখন পেরেছি নিজে রক্ত দিয়েছি। সেই সুবাদে অনেকেই রক্তের দরকার হলে আমাকে বলেন। যতটা পারি হেল্প করি। আমার বিশ্বাস আরও অনেকে এমন আছেন, যাঁরা স্রেফ ভয়ের চোটে রক্ত দিতে চান না। তাঁদের বলছি, ভয়টা ভাঙিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখুন। দেখবেন, আপনার ভয় ভাঙাতে কোনও না কোনও সলমন খান (আপনার ক্ষেত্রে হয়তো অন্য কেউ) ঠিক এগিয়ে আসবে। বিষয়টা এতটা কষ্টকরও কিছু নয়। আজ সকালে রক্ত দিয়ে বেরনোর পর থেকে কম করে চারটে ফোন পেয়েছি রক্ত লাগবে, কোনওভাবে জোগার করে দিতে পারব কি না। ফোনাফুনির মাধ্যমে যেটুকু সম্ভব করেছি। সেটা সাফিশিয়েন্ট নয়।
যে উদ্দেশে এতগুলো কথা বলা, সেটা হল আমি একটা ডেটাবেস তৈরি করতে চাই। নাম ফোন নম্বর এবং ব্লাডগ্রুপ সহ। ইচ্ছুক ডোনাররা আমাকে এগুলো জানালে আমি যখন যাঁর রক্তদরকার, সেই অনুযায়ী ডোনার সাপ্লাই করতে চাই। এই মুহূর্তে একজন প্রস্টেট ক্যানসার পেশেন্টের জন্য আরও পাঁচজন ডোনার লাগবে। একটি লিউকেমিয়া আক্রান্ত ২৪ বছরের মেয়ের জন্য অনেকটা রক্ত লাগবে। একজন ডেঙ্গু পেশেন্টের জন্য কালকের মধ্যে রক্ত লাগবে। চুঁচুড়ার একজন পেশেন্টের জন্য রক্ত লাগবে। ডেটাবেস বানাতে আমি শুরু করে দিয়েছি। যাঁরা পারবেন, এগিয়ে আসুন। হোয়্যাটসঅ্যাপ করুন আমার ৯০৫১৯৭৭১৬৭ নম্বরে। আর এই পোস্টে কমেন্ট করুন।
পুনশ্চ: যে ছেলে একসময় ফুটবল খেলতে গিয়ে পেরেকে পা কেটে গেলে লুকিয়ে বাড়ি ঢুকত টিটেনাস নেওয়ার ভয়ে, তার সারা শরীরে এখন চারচারটে ট্যাটু। বোঝাতে আরও প্রমাণ লাগবে, যে ট্রাইপ্যানোফোবিয়া একটা ঠুনকো ভয় মাত্র?
আমি বিরিয়ানি নিয়ে লিখলে ৫০০ লাইক শেয়ার, ফুচকা নিয়ে লিখলে ৫০০ লাইক শেয়ার, সাপ ব্যাং টিকটিকি নিয়ে লিখলে ৫০০ লাইক শেয়ার,—- এগুলো অপ্রয়োজনীয়।
ব্লাড ডেটাবেস তৈরি করতে চাইছি, এটার শেয়ার শতগুণে বেশি প্রয়োজনীয়