কবিদের আশ্চর্য গল্প

রিয়াদুল হক

কবিরা কবিতা লেখেন কেন? কঠিন না বোকা প্রশ্ন? তার চাইতে আরও একটু বেশী বোকা প্রশ্ন তারা কেন লেখেন? আসলে সৃষ্টির তো কোন নির্দিস্ট নেই। সেই কবে মানুষ গান গাইতে শুরু করেছিল। তখনও সে লিখতে জানে না। তারপর লেখা শিখে গুনগুন করা গান লিখে ফেললো।তারপর বছরের পর বছর কাটলো। কাব্যচর্চা ভিন্ন এক মাত্রায় এসে দাঁড়ালো।
বাংলা ভাষাতেই আছেন অনেক বড় কবি। তাদের কবিতা আমাদের যুগের পর যুগ মুগ্ধ করে রেখেছে। সেই কবিদের লেখার বাইরে একান্ত জীবনেও আছে অনেক মজার ঘটনা। সেরকম কিছু ঘটনা এখানে  তুলে দেয়া হলো।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ যখন বার্ধক্যে উপনীত হলেন তখন শান্তিনিকেতনে তিনি প্রত্যহ যাওয়া আশা করতে পারতেন না। অধ্যাপক নেপাল রায় তার হয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেখা শোনা করতেন।অধ্যাপক নেপাল রায় একটু সময়ের ব্যবধানে মাঝে মাঝে এসে হিসাব বুঝিয়ে যেতেন। একবার নেপাল রায় এসে হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।তার একদিন পরেই রবীন্দ্রনাথ নেপাল রায়কে আবার তলব করলেন।ফোন করে বললেন,‘ইদানীং আপনার কাজে একদম মন বসছে না, আপনি আসুন আপনাকে ডাণ্ডা দিবো। tagore3_0
অধ্যাপক নেপাল রায় ভয় পেয়ে গেলেন এবং মনে মনে ভাবতে লাগলেন হয়তো হিসেবে কোন ভুল করে ফেলেছেন। অনতিবিলম্বে রবীন্দ্রনাথের সামনে হাজির হলেন।রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এসে হাতের লাঠিটা দিয়ে বললেন।এই নেন আপনার ছড়িটা ।আমার এখানে আপনি ভুল করে ফেলে গিয়েছিলেন।অধ্যাপক নেপাল রায় হাফ ছেড়ে বাঁচলেন সব কিছু শুনে।এই ঘটনায় এই প্রমানিত হয় কবিগুরু শুধু কবিতাতেই নয় প্রশাসনিক দিক থেকেও পটু ছিলেন।
কবি জীবনানন্দের কথা বলা যেতে পারে। আজীবন দৈন্য দুর্দশা কাটেনি এই সৃষ্টিশীল মানুষটির।জীবনানন্দ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি এ কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ. পাশ করেন। ওই বছরেই পত্রিকা বৈশাখ সংখ্যায় প্রথম কবিতা ছাপা হয়। কবিতাটির নাম ছিল “বর্ষ আবাহন”কবিতাটিতে কবির নাম ছাপা হয়নি, কেবল সম্মানসূচক শ্রী কথাটি লেখা ছিল।নিভৃতে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন প্রচুর যার একটিও প্রকাশের ব্যবস্থা নেননি।
জীবদ্দশায় কথাসাহিত্যিক হিসাবে জীবনানন্দের কোন পরিচিতি ছিল না। তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং ছোটগল্পের সংখ্যা শতাধিক।তিনি সম্পূর্ণ নিভৃতে উপন্যাস-ছোটগল্প লিখেছিলেন জীবনানন্দ এবং জীবদ্দশায় একটিও প্রকাশ করে যান নি। তাঁর মৃত্যুর পর উপন্যাস-গল্পের পান্ডুলিপির খাতাগুলো আবিষ্কার হয়। ১৪ অক্টোবর ১৯৫৪ তারিখে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রামের ধাক্কায় তিনি আহত হন। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর দলিত হয়ে গিয়েছিল। ভেঙ্গে গিয়েছিল কণ্ঠা, ঊরু এবং পাঁজরের হাড়।
গুরুতরভাবে আহত জীবনানন্দের চিৎকার শুনে ছুটে এসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল এবং অন্যান্যরা তাঁকে উদ্ধার করে।তাঁকে ভর্তি করা হয় শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিকরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তবে জীবনানন্দের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন কবি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে অবশেষে ২২ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে  রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। কেউ কেউ ধারণা করেছেন হয়তো আত্মহত্যা স্পৃহা ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ।2010-10-22__art01
জীবনানন্দ-গবেষক ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ মনে করেন জাগতিক নিঃসহায়তা কবিকে মানসিকভাবে কাবু করেছিল এবং তাঁর জীবনস্পৃহা শূন্য করে দিয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা কবির মাথায় ঘুরে বেড়াতো সবসময়। তিনি প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন। গত এক শত বৎসরে ট্রাম দুর্ঘটনায় কলকাতায় মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র একটি। তিনি আর কেউ নন, কবি জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর মতে এ সময় দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন কবি। আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে গৃহে ফেরার সড়কে ওঠার জন্য ট্রাম লাইন পাড়ি দেয়া খুব গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়।
রবীন্দ্রনাথের পরে কবিদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন একদিকে নজরুল, অন্যদিকে ছিলেন পঞ্চপাণ্ডব নামে বিখ্যাত পাঁচ কবি। এই পঞ্চপাণ্ডবেরই একজন বুদ্ধদেব বসু।
নজরুল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘নজরুল ছিলেন একাই একশো। চওড়া মজবুত জোরালো তার শরীর, লাল-ছিটে লাগা বড় বড় মদির তার চোখ, মনোহর মুখশ্রী, লম্বা ঝাঁকড়া চুল তার প্রাণের ফূর্তির মতোই অবাধ্য, গায়ে হলদে কিংবা কমলা রঙের পাঞ্জাবী এবং তার উপর কমলা কিংবা হলদে রঙের চাদর, দুটোই খদ্দরের। কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি রঙীন জামা পরেন কেন? ‘‘সভায় অনেক লোকের মধ্যে যেন চট করে চোখে পড়ে তাই’’ বলে ভাঙা ভাঙা গলায় হো হো করে হেসে উঠেছেন তিনি। কথার চেয়ে বেশি তার হাসি, হাসির চেয়ে বেশি তার গান।
একটি হারমোনিয়াম এবং যথেষ্ট পরিমাণ চা এবং অনেকগুলো পান দিয়ে বসিয়ে দিতে পারলে সব ভুলে পাঁচ-ছয়-সাত ঘণ্টা একনাগাড়ে গান করতে থাকতেন। নজরুল যে ঘরে আড্ডা জমাতেন, সে ঘরে আর কেউ ঘড়ির দিকে তাকাতো না।
বাংলাদেশের অন্যতম কবি সদ্য প্রয়াত কবি রফিক আজাদ সম্পর্কে যদি বলি, কবির পাগলামির তালিকাও বেশ দীর্ঘ। কবি রফিক আজাদের বাবা ছিলেন তৎকালীন সমাজের একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব । গ্রামের বিচার সালিশে সবসময় তিনি অগ্রজ ভুমিকা পালন করেছেন। আড্ডা দিতে ভালবাসতেন তিনি। আড্ডার অভ্যাসটা হয়তো বাবার কাছ থেকেই পাওয়া রফিক আজাদের । অতিমাত্রায় আড্ডার জন্য কিশোর বয়সে একবার বাবার হাতে মার খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ি থেকে কবি রফিক আজাদ। ১৯৫৬ সাল। তিনি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। কাউকে কিছু না বলে ঘরে রাখা কিছু টাকা নিয়ে ট্রেনে চড়ে ভারতে পাড়ি দিলেন তিনি। উদ্দেশ্য, পি.সি সরকারের কাছে ম্যাজিক শেখা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টার অল্পবয়সী একটি ছেলেকে ট্রেনে একা দেখে বিভিন্ন প্রশ্ন শুরু করলেন। বিস্তারিত ঠিকানা জেনে নিয়ে লিখে ফেললেন একটি পোস্টকার্ডে। সেই হেডমাস্টার পলায়মান রফিক আজাদের মনে একটা আবেগ সঞ্চারিত করে দিলেন। বললেন, ‘যে বাবা তোমাকে মেরেছেন তিনি কি কখনো তোমার কপালে চুমু খাননি? তুমি যখন অসুস্থ এবং জ্বরে ভুগছ, তখন তোমার বাবা কি কপালে জলপট্টি দেননি, ডাক্তার ডাকেননি?… তোমার বাবা-মা কি এতক্ষণে তোমার জন্য উন্মাদের মতো ছোটাছুটি করছেন না?’ ইত্যাদি।michael_madhusudan_dutt
ততক্ষণে কুষ্টিয়া স্টেশনে চলে গেছে ট্রেন। হেডমাস্টার কিশোর রফিক আজাদকে স্থানীয় স্টেশন মাস্টারের জিম্মায় রেখে ট্রেন বদল করে দর্শনা হয়ে ভারতে চলে গেলেন। স্টেশন মাস্টারকে বলে গেলেন, দেড় ঘণ্টা পরে ময়মনসিংহগামী ফিরতি ট্রেনে যেন রফিক আজাদকে তুলে দেয়া হয়। এই ফাঁকে রফিক আজাদের ইচ্ছে হলো কুষ্টিয়া শহরটা একবার ঘুরে দেখার। স্টেশন মাস্টার একজন গার্ড দিয়ে দিলেন তার সঙ্গে। কুষ্টিয়া শহরে প্রথমবারের মতো দেখলেন টেগর লজ। গার্ড জানাল, এখানেই নাকি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও তার পুত্র দেবেন ঠাকুর ভুসিমালের ব্যবসা করতেন!
আরেক বিখ্যাত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অর্থিক অনটনের সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন। একদিন এক মাতাল বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে সাহায্য চাইতে এলে বিদ্যাসাগর বললেন-আমি কোন মাতালকে সাহায্য করি না।
কিন্তু আপনি যে মধুসুদনকে সাহায্য করেন তিনিও তো মদ খান-মাতালের উত্তর।
বিদ্যাসাগর উত্তর দেন -ঠিক আছে আমিও তোমাকে মধুসূদনের মত সাহায্য করতে রাজী আছি তবে তুমি তার আগে একটি “মেঘনাদ বধ” কাব্য লিখে আন দেখি?
মার্ক টোয়েন একবার তাঁর এক সাংবাদিকবন্ধুকে বললেন, “দশ বছর লেখালেখি করে বুঝতে পারলাম যে আমি সাহিত্যর কিছুই বুঝিনা”। এই বোধ মনে উদয় হওয়ার পরেও তুমি কেন লিখছো ? –এক বন্ধু জানতে চায়।মার্ক টোয়েন উত্তর দেন-কি করবো, ততদিনে আমি রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে গেছি যে।
খ্যাতনামা আইরিশ সাহিত্যিক, সমালোচক ও নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ-এর মুখের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দাড়ি। একবার একটি ইলেকট্রিক রেজর নির্মাতা কোম্পানির কর্তারা বাজারে আসা তাদের নতুন রেজরের প্রচারণায় শ-এর এই দাড়িকে নিশানা করলো। শ-কে কে তারা এই নতুন রেজর দিয়ে দাড়ি কামানোর অনুরোধ করলো। বিনিময়ে দেয়া হবে লোভনীয় অঙ্কের টাকা। বারনার্ড শ তাদের হতাশ করে বললেন, তার বাবা যে কারণে দাড়ি কামানো বাদ দিয়েছিলেন তিনিও ঠিক একই কারণে এ জঞ্জাল ধরে রেখেছেন। কোম্পানির কর্তারা কারণটি জানতে আগ্রহী হলে বার্নার্ড শ বললেন ‘আমার বয়স তখন পাঁচ বছর। একদিন বাবা দাড়ি কামাচ্ছেন। আমি তাকে বললাম বাবা তুমি দাড়ি কামাচ্ছ কেন! তিনি এক মিনিট আমার দিকে নীরবে তাকিয়ে থেকে বললেন আরে তাই তো, আমি এ ফালতু কাজ করছি কেন?’ এই বলে তিনি সেই যে জানালা দিয়ে রেজর ছুড়ে ফেললেন জীবনে আর কখনো তা ধরেননি।’