হুমায়ুন আজাদের পদ্য পড়ছি

রুদ্রাক্ষ রহমান: তার সব লেখা পড়তেই আনন্দ হয়, চিন্তা জাগে। যার কথা শুনতেই মনে হয় এ-তো নতুন কথা; আর যেখানেই বলা হোক, এদেশে এর আগে কেউ বলেননি এমন কথা। সেই মেদহীন টানটান মানুষটার নাম হুমায়ুন আজাদ। তার পদ্য পড়ছি।
আমার হাতে এখন- হুমায়ুন আজাদের ‘কাব্যসংগ্রহ’। এর উৎসর্গ পাতায় তিনি লিখেছেন
‘চন্দ্রাবতী
হয়তো আমি দ্রুত পৌঁছে যাবো, ফিরে
এসেছি চরম অন্ধকার থেকে; আদিম তিমিরে
লুপ্ত ছিলাম যেখানে শিশির নেই, মানুষের মুখ
অর্থহীন, শুধু অন্ধকার অতি,
যে-আঁধার থেকে উদ্ধার সন্তু চন্দ্রাবতী।’
হুমায়ুন আজাদকে তার সময়েই অনেকে অনেকভাবে আলাদা করার প্রয়াস করেছেন। কেউ বলেছেন ‘আজাদ প্রথা বিরোধী’, কেউ বলেছেন ‘দুর্বীনিত পান্ডিত’ আবার কেউ বলেছেন ‘অসীম সাহসী এক একলা মানুষ’। হুমায়ুন আজাদ নিজের কবিজীবন আর কবিতা সম্পর্কে নিজেই বয়ান করছেন এভাবে অজস্র অসংখ্য কবিতা লেখার মনোরম দেশে আমি কবিতা লিখেছি কমই। অনুরাগীদের দীর্ঘশ্বাসে আমি প্রায়ই কাতর হই যে দিনরাত কবিতা লেখা উচিত ছিলো আমার। অনেক ভুলই হয়তো সংশোধিত হ’তে পারে; তবে আমার এ-ভুল বা অপরাধ সংশোধন অসাধ্য। অবশ্য মধুর আলস্যে আমি জীবন উপভোগ করি নি; বন্ধুরা যখন ধ্বংসস্তূপের ওপর ব’সে উপভোগ করছেন তাঁদের অতীত কীর্তি, সিসিফাসের মতো আমি পাথর ঠেলে চলছি। কবিতার মতো প্রিয় কিছু নেই আমার বলেই বোধ করি,.. কবিতা কেনো লিখলাম? খ্যাতি, সমাজবদল, এবং এমন আরো বহু মহৎ উদ্দেশ্যে কবিতা আমি লিখি নি ব’লেই মনে হয়; লিখেছি সৌন্দর্যসৃষ্টির জন্যে, আমার ভেতরের চোখ যে শোভা দেখে, তা আঁকার জন্যে; আমার মন যেভাবে কেঁপে ওঠে, সে-কম্পন ধ’রে রাখার জন্যে।… নিজের কবিতা সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই না; শুধু বলি আমি কবিতা লিখেছিলাম, লিখছি, এবং লিখবো; এটা আমাকে সুখী করে এবং আমার বেঁচে থাকাকে সুখকর করেছে অন্য আর কিছু এতোটা করে নি।’
অলৌকিক ইস্টিমার, জলো চিতাবাঘ, সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে, কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু- এই কটি হুমায়ুন আজাদের কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া কিশোরদের জন্য লেখা কিছু কবিতা এবং কটি অনুবাদ কবিতা জায়গা করে নিয়েছে ‘কাব্যসংগ্রহ-এ। আর হুমায়ুন আজাদের কবিতার সৌন্দর্য, নান্দনিকতা নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা আমার নেই, হবে না কোনো কালেই এবং এখানে, এই পরিসরে সব কটি কবিতাওতো তুলে দেয়া সম্ভব নয়; তারপরও দু-একটা দিলে মন্দ কী!
শিশু ও যুবতী নামের কবিতাটি আছে বইয়ের ১৮৬ পৃষ্ঠায়
‘শিশু আর যুবতীর মধ্যে আশ্চর্য মিল রয়েছে।
শিশুদের গাল লাল, যুবতীদের গালও লাল
শিশুদের ঠোঁট থেকে সোনা ঝরে,
যুবতীদের ঠোঁট থেকেও গলগল ক’রে সোনা ঝরতে থাকে।
শিশুরা নিজেদের মূল্য বোঝে না,
যুবতীরাও মূল্য বোঝে না নিজেদের।
শিশুরা খুব সাবধানে ভুল জায়গায় পা ফেলে,
যুবতীরাও ভুল জায়গায় পা ফেলে নির্দ্বিধায়।
শিশু আর যুবতীর মধ্যে আশ্চর্য মিল রয়েছে।
শিশু আর যুবতী দেখলেই দু-হাতে বুকের গভীরে টেনে
চুমোতে চুমোতে চুমোতে চুমোতে আদরে আদরে
আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।’

হুমায়ুন আজাদ শুভেচ্ছা কবিতায় লিখছেন
‘ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা
ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা..’
জন কীট্স, ম্যাথিউ আরনল্ড, ডব্লিউ বি ইএট্স আর ই ই কামিংস থেকে অনুবাদ করা পাঁচটি কবিতা রয়েছে কাব্য সংগ্রহ-এ। আর অন্যগুলো পাশ ফিরিয়ে রেখে এখানে আমার খুব পড়তে ইচ্ছে করছে, ভাবতে ইচ্ছে করছে কামিংসের সেই কবিতাটি, বাংলায় যার নাম দিয়েছেন হুমায়ুন আজাদ ‘একটুখানি ছুঁই বললো সে’
‘একটুখানি ছুঁই বললো সে
(কেঁপে উঠবোই বললো সে
শুধু একবার বললো সে)
তবে তো মজার বললো সে
(একটু কাছে টানি বললো সে
ঠিক কতোখানি বললো সে
খুব বেশি হবে বললো সে)
কেনো নয় তবে বললো সে

(চলো আসি ঘুরে বললো সে
নয় বেশি দূরে বললো সে
কতোটা বেশি দূর বললো সে
যতোটা তুমি মোর বললো সে)

একটু ঘষি মুখ বললো সে
(কীভাবে পাবে সুখ বললো সে
এভাবে যদি চাও বললো সে
যদি চুমো খাও বললো সে

একটু দি ঠেলা বললো সে
এ যে প্রেম খেলা বললো সে)
যদি ইচ্ছে হয় বললো সে
(আমার লাগছে ভয় বললো সে

এইতো জীবন-মউ বললো সে
তোমার আমি বউ বললো সে
এখনি হু বললো সে)
উহ্ বললো সে

(লাগছে সুখ বেশ বললো সে
এখনি করো না শেষ বললো সে
না না রাত ভ’রে বললো সে)
আস্তে ধীরে ধীরে বললো সে

(হয়েছে? বললো সে
আআআআ বললো সে
তুমি স্বর্গীয় বললো সে
তুমি আমার, প্রিয়, বললো সে)।