বৃষ্টিজলের ছোঁয়া

আন্জুমান রোজী

আন্জুমান রোজী

(কানাডা থেকে): আকাশে মেঘ জমেছে। মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নেমে এলো। ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে. হয়তো দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে, তাই এমন শীতল কোমল বাতাস। প্রচণ্ড গরমের পর মেঘলাভাব দেখে অপলা ঘর থেকে বের হয়ে এলো; বাড়ির লনে ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে মেখে এদিক থেকে ওদিক হাঁটতে শুরু করলো। হাতে মুঁঠোবন্দি ফোন। অস্থির চিত্ত। একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে, আবার দূরের দৃষ্টিতে কিছু দেখার ভঙ্গিমায় চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আসলে অপলা কিছুই দেখে না, মাথায় ঘুরছে শুধু পলকের কথা। অনেক কষ্টে পলকের নাম্বার জোগাড় করেছে। বিশ বছর হয়ে গেলো কোনো যোগাযোগ নেই। মাঝেমাঝে ভীষণ মনে পড়ে। ইচ্ছে হয়, একবার ছুটে গিয়ে যেন বলে,’ তুমি যে প্রশ্ন করতে চেয়েছিলে, তার উত্তর আমি জানি।’ পলকের সেই প্রশ্নের উত্তর অপলা কখনই দিতে পারেনি, কারণ ছিল কান্তা। কান্তা এবং অপলা দুজন পরম বন্ধু। সেই প্রাইমেরী স্কুল থেকে একই সঙ্গে একই পাড়ায় বড় হয়ে উঠে। তারপর চলে যায় দুজন দুই ইউনিভার্সিটিতে। তখনই কান্তার ইউনিভার্সিটিতে পলককে দেখতে পায়। প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে যায়। ভদ্র-মার্জিত সুঠাম দেহের অধিকারী পলক। কথাও বলে গুছিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে। সেভাবে কখনোই কাছে যাওয়া হয়নি। চোখাচোখি হতেই শুধু কুশল বিনিময় ছাড়া তেমন কথা হয়নি। তবে মনে মনে অপলা অপেক্ষায় ছিল হয়তো পলক একদিন কিছু বলবে। কারণ পলকের চোখেও কিছু না-বলা ভাষা ছিল। এভাবে বেশ অনেকদিন গড়িয়ে যাওয়ার পর অপলা ঠিক করলো কান্তাকে পলকের ব্যাপারে কিছু কথা বলবে। দু’বান্ধবী মিলে অপলাদের বাড়ির লনে হাঁটছে। তখনই কান্তা বললো, তোকে একটা কথা বলবো। ভীষণ খুশী মনেই কথাগুলো বললো কান্তা। অপলা উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে কান্তার দিকে, সেই সঙ্গে অধীর আগ্রহ নিয়ে কান পেতেও আছে। হঠাত করেই কান্তা বলে ফেললো, ‘পলকের সাথে আমার সম্পর্ক হয়ে গেছে।’ বজ্রাঘাতের মত কেঁপে উঠলো অপলা। ভিতরে ভিতরে থির থির করে কাঁপছে। কিন্তু মুখে হাসি এনে বললো,’ এতো খুশীর খবর। অভিনন্দন বন্ধু।’ আর কোনো কথা নেই। প্রসঙ্গ পালটে ফেলে দুজনেই। এর পর থেকে অপলা আর কান্তার ইউনিভার্সিটিতে যায়নি। সপ্তাহ শেষে বাসায় এলেই দেখা হত দু’বান্ধবীর। এভাবে গড়িয়ে গেলো বেশ কটি বছর। ইউনিভার্সিটির পাট চুকিয়ে যেতে না যেতেই অপলার বিয়ে হয়ে গেলো। কান্তারও বিয়ে হলো অন্যত্র। পলকের সঙ্গে কি কারণে ভুল বুঝাবুঝিতে ওদের সম্পর্কটা ভেঙ্গে যায়। অপলা কখনো তা জানতে চায়নি। থেকেছে কান্তার পাশে সারাক্ষণ, গল্পে আড্ডায় হেসে খেলে দুজনে বেশ সময় কাটিয়েছে, কিন্তু কান্তা কখনো পলকের সাথে তার সমস্যা নিয়ে কথা বলেনি। অপলার বিয়ে হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর হঠাত একদিন পলক অপলার পর্যটন অফিসে এলো। অনেকটা হন্তদন্ত হয়ে অফিসরুমে ঢুকে বলতে লাগলো,’ আমার কিছু প্রশ্নpb_b2r_nov1-1 ছিল তোমার কাছে।‘ অপলাও ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে কেঁপে উঠছে। ইচ্ছে করছে না পলকের কোনো কথা শুনতে। সদ্য বিবাহিত অপলা, আবার কোন জটিলতা শুরু হয় তার ভয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পলককে সেদিনের মত বিদায় করে, সেই সাথে অপলাও অফিস থেকে বের হয়ে যায়। পরেরদিনও অফিসে যায়নি, সিক লিভ নিলো দু’সপ্তাহর। দু’সপ্তাহ পরেও অপলা আর অফিসে আসেনি, রিজাইন লেটার পাঠিয়ে দিয়ে চাকুরী থেকে ইস্তফা নিলো শুধু পলকের ভয়ে। যদি আবার সে ফিরে আসে! বছর ঘুরতেই স্বামীর স্কলারশিপের সুবাদে অপলাও চলে গেলো বিলেতে। সেখানেই জীবন গড়তে শুরু করলো, আর ভুলে যেতে চাইলো পলককে। এভাবে কেটে গেলো বিশ বছর। বিশ বছর পর দেশে এসে পলককে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, জানতে ইচ্ছে করছে, পলক কেমন আছে! চৈত্রের এই তাপদাহে ব্যতিব্যস্ত যখন নগরজীবন তখন অপলার মনে বয়ে যাচ্ছে কাল বৈশাখীর ঝড়। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নাম্বারগুলো দেখে। নাম্বারগুলোর উপর আলতো করে আঙ্গুলের ছোঁয়া দেয়। আবার পায়চারি… এভাবে বেশ অনেকক্ষণ… হঠাত করে শুনতে পেলো মৃদু কন্ঠের ধ্বনি, ‘হ্যালো’, ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে কখন যে রিংগারে চাপ লেগে ফোন চলে গেছে পলকের কাছে বুঝতে পারেনি। কানের কাছে ফোন নিতেই অপলার কন্ঠ যেন সরে না, অপর প্রান্ত থেকে শুধু দুটি শব্দ কানে এলো, ‘অপলা তুমি!’ তখনই অঝর ধারায় বৃষ্টি। ভিজে যাওয়ার ভয়ে অপলা দৌড়ে চলে এলো বাড়ির বারান্দায়। ঝুমবৃষ্টিতে ডুবে গেলো স্মৃতি, ডুবে গেলো সব ভাবনা। শুধু চোখ বুজে বৃষ্টিজলের ছোঁয়া নিলো অপলা।