পাবলো পিকাসোর নারী

শিল্পী ও ভাস্কর পাবলো পিকাসোর নারীসঙ্গ নিয়ে ছড়িয়ে আছে বিচিত্র সব গল্প। ছবি আঁকায় কিউবিজমের জনক এই প্রখ্যাত শিল্পীর জীবনে নারীর ভূমিকা সবসময়ই বহুল আলোচিত। দুবার বিয়ে করেছিলেন পিকাসো। ছিল অসংখ্য নারী বন্ধু আর রক্ষিতা।
ফ্র্যাঙ্কুয়িস গিলট নামে এক নারী ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত প্যারিসে বসবাস করতেন এই শিল্পীর সঙ্গে। তিনি একবার মজা করে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, পিকাসোর বাড়ির বড় আলমারিটা খুললে কমসেকম তাঁর অর্ধ ডজন নারী সঙ্গীর দেহ পাওয়া যাবে। সবাই ঝুলে আছে সেখানে।’

picasso-1-800x488

পিকাসো ও স্যালভেটি ডেভিড

পিকাসোর রক্ষিতা মেরি থ্রেসি ওয়াল্টার এবং দ্বিতীয় স্ত্রী জ্যাকুলিন রুক আত্নহত্যা করেছিলেন। কিন্তু পিকাসোর আরেক সঙ্গিনী স্যালভেটি ডেভিড? তার কথা আলাদা। পিকাসোর ছবি আর ভাস্কর্যে এই নারী আজও অমর হয়ে আছেন চিত্রশিল্পের দুনিয়ায়।
স্যালভেটি ডেভিডের সঙ্গে এই অসাধারণ চিত্রকরের দেখা হয় ১৯৫৪ সালে। ১৯ বছর বয়সী পরমাসুন্দরী এই কিশোরীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন পিকাসো। তখন রু দ্যা ফর্নেসে নামে এক ছোট্ট শহরে ছিলো পিকাসোর স্টুডিও। সেলভেটি প্রায় প্রতিদিন পিকাসোর স্টুডিওর পাশের রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে যেতেন এক আসবাবপত্র নির্মাতার দোকানে। তার মাথার সোনালী চুলগুলো এক বিশেষ কৌশলে বাঁধা থাকতো। যার নাম ‘পনিটেল’। পিকাসোর প্রথম চোখে পড়েছিল সেই পনিটেল।এই মেয়েটির হাঁটাচলা, চুলবাঁধা সবকিছুই দূর থেকে দেখতেন পিকাসো। তবে অবশ্যই আড়াল থেকে। কিন্তু একদিন সে আড়াল আর রইলো না। শিল্পী নিজেই বের হয়ে এলেন অন্তরাল থেকে। তার স্টুডিওর উল্টোদিকের ক্যঁফেতে বেন্ধুদের নিয়ে কফি খেতে খেতে স্যালভেটি্কে বিকেলে দেখলেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে একজন তাকে একটি ছবি দেখানোর চেষ্টা করছে। ছবিটি ছিল এক নারীর পোট্রেট।
স্যালভেটি কৌতুহলী হয়ে বন্ধুদের নিয়েই চলে যান স্টুডিওর দরজায়। সেখানে তাকে সম্ভাষণ জানালেন পৃথিবীখ্যাত এই চিত্রকর। তারপরের কাহিনি ছবি আাঁকার। পিকাসো স্যালভেটিকে রাজি করালেন তাঁর মডেল হবার জন্য। তখন ছিল এপ্রিল মাস। জুন মাসের মধ্যে পিকাসো এঁকে ফেললেন স্যালভেটির ৬০টি পোট্রেট। ছবিগুলো আাঁকা হয়েছিল বিভিন্ন মাধ্যমে। তারমধ্যে কয়েকটি ভাস্কর্যও ছিলো। পেইন্টিংসের সংখ্যা ছিলো ২৮। ছবি আাঁকার জগতে একজন মডেলকে কেন্দ্র করে একটানা এতোগুলো কাজ করার নজির এর আগে আর ছিলো না।
আাঁকা শেষ হতেই পিকাসো প্যারিসেই তাঁর ছবিগুলোর প্রদর্শনী করলেন। বেশীরভাগ ছবি তিনি এঁকেছিলেন সাদা, কালো আর ধূসর রঙে। নতুন কৌশলে আঁকা এসব ছবি মুহূর্তেই দর্শক আর সমালোচকদের ঘুম কেড়ে নিলো। লাইফ ম্যাগাজিন এই ছবিগুলোর নামকরণ করলো ‘পরিটেল পিরিয়ড’ বলে।
ছবির সঙ্গে সঙ্গে পিকাসোর জীবনে যেন ফিরে এলো নতুন প্রাণের স্পন্দন। এর কিছুদিন আগে তার বন্ধু গিলোটি তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই সময়ে পিকাসো মানসিকভাবে বেশ ভেঙ্গে পড়েছিলেন। স্যালভেটি আর তাকে নির্ভর করে আঁকা ছবি পিকাসোকে যেন নতুন জীবন দান করলো।
স্যালভেটির সঙ্গে শিল্পীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সে সময়ে সমালোচনার ঝড়ও উঠেছিল। কিন্তু চিত্রশিল্প বিশেষজ্ঞরা বিষয়টাকে ভিন্ন আলো ফেলে বিশ্লেষণ করলেন। তারা বললেন, এমনও তো হতে পারে, এই মেয়েটিকে পিকাসো কখনোই জয় করতে চাননি শারীরীকভাবে। তিনি ক্যানভাসে রঙ আর তুলির খেলায় তাকে জয় করেছিলেন।
স্যালভেটি ডেভিস আজও বেঁচে আছেন। বসবাস করেন লন্ডন শহরে। তিনি পরবর্তী জীবনে ছবি আঁকতে শুরু করেছিলেন। গণমাধ্যমের কাছে স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, পিকাসো আমাকে ‘মোনালিসা’-এর মতোই অমর করে রেখে গিয়েছেন এই পৃথিবীতে।
ফারহানা রহমান