দুঃসাহসী অভিযাত্রী রফিক আজাদ

12525578_1112775112101301_4908396165360800760_oরাজু আলাউদ্দিন  : আমার লেখালেখির জীবনের শুরুর দিকে দুটো খুব স্মরণীয় স্মৃতি হচ্ছে দুটো বইকে ঘিরে, একটি আবদুল মান্নান সৈয়দের নির্বাচিত কবিতা অন্যটি রফিক আজাদের নির্বাচিত কবিতা। তাদের এই বই দুটো বেরিয়েছিল মুক্তধারা প্রকাশনী থেকে। এই বই দুটোর মুদ্রণমান অলংকরণ, প্রচ্ছদ, অঙ্গসজ্জা, কাগজ এবং ব্যাক কভারে দুজনের ছবির ব্যবহার–এক কথায় তখনকার বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে রীতিমত চমক ও সম্ভম তৈরি করেছিল। এ দুজনের বই দুটো একই সময়ে প্রকাশিত হলেও দুজনের কাব্যিক চারিত্র্য ছিল অনেকটাই আলাদা। পরে জেনেছি তাদের জীবন যাপনের ধরনও ছিল ভিন্ন। কবিতায় মান্নান ভাই ছিলেন মনোরাজ্যের অভিযাত্রী, অন্যদিকে রফিক ভাই ছিলেন বহির্বাস্তব জগতের অভিযাত্রী আর সে কারণেই তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়কে তার কবিতার বিষয়বস্তু করে নিয়েছেন। কথাগুলো খুব মোটাদাগে বলছি এই কারণে যাতে দুজনের পার্থক্যকে বিশদ বিশ্লেষণ

RafiqAzad_(1941_-_2016)

রফিক আজাদ (১৯৪১-২০১৬)

ছাড়াই সবাই চট করে বুঝে নিতে পারেন। কাব্যরুচির দিক থেকে আমার পক্ষপাত যদিও মান্নান ভাইয়ের দিকেই ঝুঁকে ছিল সবসময় তবে রফিক ভাইয়ের কিছু কিছু কবিতায় তার শৈল্পিক দক্ষতায় ভীষণ চমৎকৃত হয়েছিলাম। রফিক ভাইয়ের যে বিষয়টি আমাকে আরও বেশি আকৃষ্ট করেছিল সে হলো তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়। আরও একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল এটা  জেনে যে তিনি তথাকথিত কবিদের মতো পোষাক আশাক বা চলনের বিপরীতে মাস্তানদের মতো বাহারি পোষাকে এবং মোটর সাইকেলে চড়ে বেড়ান। তখনকার দিনের জন্য রফিক আজাদকে খানিকটা পপ কবিদের মতো হতো। এ ধরনের নানান ধারণা নিয়ে আমরা বড় হচ্ছি। সচক্ষে তখনও দেখা হয়নি  রফিক ভাইকে। এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি তিনি ‘ভাত দে হারামজাদা’ লিখে কবিদের মধ্যে এক নায়কোচিৎ খ্যাতি পেয়ে গেছেন।
মনে পড়ে রফিক ভাইয়ের ‘উদ্ধত হয়ো না কুর্নিশ কর’ কবিতাটি যখন প্রকাশিত হয়েছিল ইত্তেফাক কি সাপ্তাহিক রবিবার পত্রিকায়, তখন কবিতাটি পড়ে খুব ভালো লেগেছিল এই ভেবে যে রফিক আজাদ অন্য কবিদের তুলনায় ভীষণ রকম দুঃসাহসী। কবিতাটি যখন প্রকাশিত হয় তখন এ ধরনের কবিতা প্রকাশ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু তিনিই তো ষাটের দশকের  সেই কবি যিনি  মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, ‘ভাত দে হারামজাদা’র মতো  কবিতা লিখেছেন, তাহলে তিনি যে ঝুঁকি নেবেন তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে।
কিন্তু বাস্তবের রফিক ভাইকে যখন দেখি তখন  আমার ধারণার রাগী বেপরোয়া মানুষ নন, তিনি অত্যন্ত ভদ্র ও সদালাপী। খুব বেশি দেখা বা কথাবার্তা হয়েছে তা নয়। কয়েকবার সাকুরা নামক লেখকদের সুড়িখানার দেখা হয়েছে, সেখানেই শতকন্ঠের বিশৃঙ্খল কোলাহল চিড়ে যথা সম্ভব কন্ঠ চড়িয়ে কথাবার্তা হয়েছে। তার অনূদিত দুটো কবিতা আমার খুব ভালো লেগেছিল। বলেছিলাম তাকে সে কথা। একটি  টেড হিউসের, অন্যটি হোর্হে লুইস বোর্হেসের। রফিক ভাইয়ের অনুবাদ আমার খুব পছন্দের ছিল। খুব সম্ভবত বোর্হেসের ‘ছোড়া’ (Dagger) নামক কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। আমার ধারণা এই অনুবাদটিই আমাকে প্রথম বোর্হেস সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে। আজ আমার ভাবতে ভালো লাগছে এটা মনে করে যে তিনি আমার কেবল প্রিয় কবিই ছিলেন না, আরেক প্রিয় লেখকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি আমাকে বিশ্বসাহিত্যের মহাসড়কে তুলে দেয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার প্রয়াণ আমার জীবনে অন্য এক প্রবেশ রচনা করবে যা কারুকার্যময় সাহিত্যিক গুরুত্বে ভাস্মর হয়ে থাকবে আজীবন।

(কবি, প্রাবন্ধিক)